পারসেপোলিসখ্যাত লেখক ও চলচ্চিত্র পরিচালক মারজানে সাত্রাপির মৃত্যু

ইরানি-ফরাসি লেখক, গ্রাফিক নভেলিস্ট, চলচ্চিত্র পরিচালক এবং মানবাধিকার কর্মী মারজানে সাত্রাপি ৫৬ বছর বয়সে প্যারিসে মারা গেছেন। পারসেপোলিসের স্রষ্টা হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত সাত্রাপির মৃত্যুতে বিশ্বনেতা ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের প্রতিনিধিরা শোক প্রকাশ করেছেন।

মারজানে সাত্রাপি ৫৬ বছর বয়সে মারা গেছেন। তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি ফ্রান্সের রাষ্ট্রপতির দপ্তর এবং একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম নিশ্চিত করেছে।

মারজানে সাত্রাপির মৃত্যুতে ফ্রান্সের রাষ্ট্রপতি Emmanuel Macron এবং তাঁর স্ত্রী Brigitte Macron গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। এক বিবৃতিতে তাঁরা সাত্রাপিকে “স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের কণ্ঠস্বর” হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, তাঁর সৃষ্টিকর্ম ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে সর্বজনীন মানবিক কাহিনিতে রূপান্তরিত করেছে।

বিবৃতিতে বলা হয়, সাত্রাপির কাজ কেবল ইরানের গল্প ছিল না; এতে স্বাধীনতা, পরিচয়, সংগ্রাম এবং মানবিক মর্যাদার মতো সর্বজনীন বিষয়ও উঠে এসেছে। তাঁর রচনাগুলো বিশ্বজুড়ে লক্ষাধিক পাঠক ও দর্শককে অনুপ্রাণিত করতে থাকবে।

মারজানে সাত্রাপির মৃত্যু ৪ জুন ২০২৬ সালে প্যারিসে হয়। তাঁর পরিবার ও ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের মতে, তিনি কিছু সময় ধরে ব্যক্তিগত শোক ও মানসিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি ছিলেন। তাঁর স্বামী, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও অভিনেতা Matthias Ripa-রও প্রায় এক বছর আগে মৃত্যু হয়েছিল।

মারজানে সাত্রাপি বিশ্বব্যাপী পরিচিতি লাভ করেন তাঁর বিখ্যাত গ্রাফিক আত্মজীবনী Persepolis-এর মাধ্যমে। ২০০০-এর দশকের শুরুতে প্রকাশিত এই গ্রন্থ দ্রুত আন্তর্জাতিক বেস্টসেলার হয়ে ওঠে।

বইটিতে তিনি ইরানে তাঁর শৈশব, ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লব, সামাজিক পরিবর্তন এবং ব্যক্তিগত সংগ্রামের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তাঁর লেখনশৈলী জটিল রাজনৈতিক ঘটনাগুলোকে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে উপস্থাপন করে, যার ফলে বইটি বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয় এবং বিশ্বজুড়ে পাঠকদের কাছে পৌঁছে যায়।

পরবর্তীতে এই কাহিনির ভিত্তিতে নির্মিত অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র Persepolis আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করে এবং একাধিক মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়।

মারজানে সাত্রাপি শুধু একজন লেখকই ছিলেন না, তিনি একজন প্রভাবশালী চলচ্চিত্র পরিচালক ও সামাজিক কর্মীও ছিলেন। নারীর অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নে তিনি প্রকাশ্যে নিজের অবস্থান তুলে ধরতেন।

তাঁর আলোচিত চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে Chicken with Plums, Radioactive, The Voices, The Gang of the Jotas এবং Dear Paris। এসব চলচ্চিত্রে তিনি পরিচয়, স্মৃতি, বিজ্ঞান, সমাজ এবং মানবিক সম্পর্কের মতো বিষয় সৃজনশীলভাবে উপস্থাপন করেছেন।

মারজানে সাত্রাপির জন্ম ২২ নভেম্বর ১৯৬৯ সালে ইরানের Rasht শহরে। কৈশোরে উচ্চশিক্ষার জন্য তাঁকে অস্ট্রিয়ায় পাঠানো হয়, যেখানে তিনি Vienna-তে পড়াশোনা করেন। পরে তিনি ফ্রান্সে চলে যান এবং সেখানেই তাঁর শিক্ষা সম্পন্ন করেন।

ইউরোপে বসবাস করলেও তাঁর সৃষ্টিকর্মে ইরানি সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং সামাজিক অভিজ্ঞতার গভীর প্রভাব বজায় ছিল। এ কারণে তাঁকে প্রায়ই পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে সাংস্কৃতিক সংলাপ প্রতিষ্ঠাকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর হিসেবে দেখা হতো।

 

Leave a comment