কৌশিকী অমাবস্যা এলেই ভক্তদের ভিড়ে জমজমাট হয়ে ওঠে তারাপীঠ। মন্দিরকে কেন্দ্র করে কয়েক দিন ধরে চলে বিশেষ আয়োজন। সেই উৎসবের আবহেই এ বছর মদ বিক্রি বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। টানা তিন দিন বৈধ মদের দোকান বন্ধ রাখার প্রস্তাব নিয়ে একদিকে অনড় স্থানীয় বিধায়ক, অন্যদিকে সিদ্ধান্তের বিরোধিতায় সরব ব্যবসায়ী সংগঠন।
কৌশিকী অমাবস্যায় বদলে যায় তারাপীঠের ছবি
কৌশিকী অমাবস্যা তারাপীঠের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় অনুষ্ঠান। এই সময় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিপুল সংখ্যক ভক্ত ও পর্যটক তারাপীঠে আসেন। মন্দির চত্বর থেকে শুরু করে আশপাশের বাজার ও রাস্তাঘাট—সব জায়গাতেই তৈরি হয় উৎসবের আবহ।এবার সেই গুরুত্বপূর্ণ সময়েই মদ বিক্রি বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়ে শুরু হয়েছে আলোচনা। জানা গিয়েছে, ১০ সেপ্টেম্বর কৌশিকী অমাবস্যাকে কেন্দ্র করে টানা তিন দিন মদের দোকান বন্ধ রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
কেন মদের দোকান বন্ধের সিদ্ধান্ত?
তারাপীঠের ধর্মীয় পরিবেশ যাতে কোনওভাবে বিঘ্নিত না হয়, সেই কারণেই মদ বিক্রি বন্ধ রাখার পক্ষে মত স্থানীয় বিজেপি বিধায়ক ধ্রুব সাহার।তাঁর বক্তব্য, তারাপীঠ একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও পর্যটনকেন্দ্র। এখানে উৎসবের সময় কোনও ধরনের অশান্তি বা অশোভন পরিস্থিতি তাঁরা বরদাস্ত করতে চান না। তাই মদ বিক্রি বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত কার্যকর করার বিষয়ে তিনি অনড়।শুধু দোকান বন্ধ নয়, বেআইনি ভাবে মদ বিক্রি হচ্ছে কি না, সেদিকেও নজর রাখার কথা জানিয়েছেন তিনি।
ব্যবসায়ীদের আপত্তি কোথায়?
মদের দোকান বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ ব্যবসায়ী সংগঠন। তাঁদের বক্তব্য, কৌশিকী অমাবস্যার সময় তারাপীঠে কয়েক লক্ষ মানুষের সমাগম হয়। পর্যটকের সংখ্যা বাড়ায় এই সময় মদের বৈধ ব্যবসাও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পায়।রাজ্য ফরেন লিকার শপ, সিএস শপ ও হোটেল মালিক সমিতির রাজ্য সভাপতি গৌতম মুখোপাধ্যায়ের দাবি, উৎসবের প্রায় ১০-১৫ দিন আগে থেকেই ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত মদ মজুত করেন। ফলে তিন দিন দোকান বন্ধ থাকলে ব্যবসায়ীদের বড় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হতে পারে।
কোটি টাকার ব্যবসা বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা
ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তারাপীঠের মতো ছোট এলাকায় মোট ২৯টি মদের দোকান রয়েছে। কৌশিকী অমাবস্যার সময় সেখানে বিপুল পরিমাণ বিক্রি হয়।ব্যবসায়ীদের দাবি, গত বছর মাত্র দু’দিনে প্রায় ৪ কোটি টাকার মদ বিক্রি হয়েছিল। তার আগের বছর, অর্থাৎ ২০২৪ সালে তিন দিনে বিক্রির পরিমাণ ৫ কোটি টাকারও বেশি ছিল বলে আবগারি দফতর সূত্রে দাবি করা হয়েছে।তাই এ বছর টানা তিন দিন দোকান বন্ধ রাখলে ব্যবসার উপর বড় ধাক্কা আসতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।
বেআইনি মদ বিক্রি বাড়ার আশঙ্কা ব্যবসায়ীদের
শুধু আর্থিক ক্ষতি নয়, বৈধ দোকান বন্ধ রাখার ফলে বেআইনি মদের কারবার বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ীরা।তাঁদের যুক্তি, বৈধ দোকান বন্ধ থাকলেও মদের চাহিদা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাবে না। সেই সুযোগে অসাধু ব্যবসায়ীরা প্রশাসনের নজর এড়িয়ে বেআইনি ভাবে মদ বিক্রি করতে পারেন। এমনকি চড়া দামে মদ বিক্রির প্রবণতাও বাড়তে পারে বলে তাঁদের আশঙ্কা।
সিদ্ধান্তে অনড় বিধায়ক ধ্রুব সাহা
ব্যবসায়ী সংগঠনের আপত্তি সত্ত্বেও নিজের অবস্থান থেকে সরে আসেননি রামপুরহাটের বিজেপি বিধায়ক ধ্রুব সাহা।তাঁর বক্তব্য, তারাপীঠের ধর্মীয় পরিবেশ এবং উৎসবের মর্যাদা বজায় রাখাই এই সিদ্ধান্তের মূল উদ্দেশ্য। সরকারের রাজস্ব কমলেও যদি ধর্মীয় পরিবেশ শান্ত রাখা যায়, তাহলে সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হবে বলে তিনি স্পষ্ট করেছেন।পাশাপাশি, বৈধ দোকান বন্ধের সুযোগ নিয়ে কেউ যাতে গোপনে মদ বিক্রি করতে না পারে, প্রশাসনের মাধ্যমে সেই বিষয়েও নজরদারি চালানো হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
রাজস্ব বনাম ধর্মীয় পরিবেশ—কোন দিকে জোর?
এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে কার্যত দুটি প্রশ্ন সামনে এসেছে। একদিকে রয়েছে ধর্মীয় পরিবেশ শান্ত ও নিয়ন্ত্রিত রাখার যুক্তি, অন্যদিকে বৈধ ব্যবসা এবং সরকারের আবগারি রাজস্বের বিষয়টি।কৌশিকী অমাবস্যার মতো বড় ধর্মীয় উৎসবে বিপুল জনসমাগমের সময় প্রশাসন কীভাবে পরিস্থিতি সামলায় এবং বেআইনি মদের কারবার ঠেকাতে কী ব্যবস্থা নেয়, সেটিই এখন দেখার।
১০ সেপ্টেম্বর কৌশিকী অমাবস্যা উপলক্ষে বীরভূমের তারাপীঠে টানা তিন দিন মদের দোকান বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত ঘিরে শুরু হয়েছে বিতর্ক। ধর্মীয় পরিবেশ শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল রাখার যুক্তিতে এই পদক্ষেপের পক্ষে স্থানীয় বিজেপি বিধায়ক ধ্রুব সাহা। অন্যদিকে, মদ ব্যবসায়ীদের সংগঠন এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছে। তাঁদের দাবি, উৎসবের সময় দোকান বন্ধ হলে ব্যবসার পাশাপাশি সরকারের আবগারি রাজস্বেও বড় প্রভাব পড়তে পারে।





