নবাবের চাপে বাঙালি রাঁধুনির হাতেই জন্ম মোগলাই পরোটার! জানেন কীভাবে তৈরি হয়েছিল কলকাতার এই প্রিয় খাবার?

কলকাতার জনপ্রিয় মোগলাই পরোটার জন্মকাহিনি জানেন? প্রচলিত গল্প অনুযায়ী, সম্রাট জাহাঙ্গীরের জন্য নতুন পদ তৈরি করতে গিয়ে বর্ধমানের এক রাঁধুনি তৈরি করেছিলেন ডিম-রুটি। জানুন সেই চমকপ্রদ কাহিনি।

কলকাতার অলিগলি থেকে নামী খাবারের দোকান—মোগলাই পরোটার জনপ্রিয়তা আজও অটুট। গরম তেলে ভাজা ময়দার পরোটা, তার ভিতরে ডিম, পেঁয়াজ ও মশলার পুর—এই স্বাদে বাঙালির মন মজে আছে বহুদিন ধরে। কিন্তু জানেন কি, প্রচলিত একটি গল্প অনুযায়ী এই খাবারের জন্মের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এক বাঙালি রাঁধুনির নাম? কথিত আছে, এক নবাবের কঠিন নির্দেশের চাপে মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে নতুন পদ তৈরি করতে গিয়ে তিনি এমন একটি খাবার বানিয়েছিলেন, যা পরে কলকাতার অন্যতম জনপ্রিয় স্ট্রিট ফুডে পরিণত হয়।

মোগলাই পরোটার জন্মকাহিনি ঠিক কী?

মোগলাই পরোটার উৎপত্তি নিয়ে নানা মত ও লোককথা রয়েছে। তার মধ্যে একটি বহুল প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, এই গল্পের শুরু মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের দরবারে। রাজকীয় খাবারের বিপুল আয়োজন থাকলেও প্রতিদিনের একই ধরনের পরোটা ও মাংসের পদ খেতে খেতে নাকি একসময় একঘেয়েমি তৈরি হয়েছিল।তখনই দরবারের রাঁধুনিকে দেওয়া হয় নতুন ও অভিনব কোনও পদ তৈরি করার নির্দেশ।

১০ দিনের সময়সীমা, দুশ্চিন্তায় রাঁধুনি

কথিত আছে, বর্ধমানের বাসিন্দা রাঁধুনি আদিল হাফিজ উসমানকে সম্রাটের জন্য একেবারে নতুন ধরনের খাবার তৈরি করতে বলা হয়েছিল। শর্ত ছিল, সাধারণ পরোটার মতো হলে চলবে না। এমন কিছু পরিবেশন করতে হবে, যা আগে কখনও সম্রাটের পাতে ওঠেনি।সময়ের সীমাও ছিল মাত্র ১০ দিন। বাদশাহর নির্দেশ পেয়ে রাঁধুনি নতুন পদ তৈরির চিন্তায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন। কিন্তু দিনের পর দিন কেটে গেলেও তাঁর মাথায় আসছিল না কোনও নতুন ভাবনা। দেখতে দেখতে আট দিন পেরিয়ে গেল। হাতে তখন মাত্র দু’দিন।

নবম দিনে এল নতুন ভাবনা

চাপ যত বাড়ছিল, ততই নতুন কিছু তৈরির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন রাঁধুনি। অবশেষে নবম দিনে তাঁর মাথায় আসে এক অভিনব পরিকল্পনা। পরোটাকে একেবারে নতুন রূপ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।সেই ভাবনা অনুযায়ী তৈরি হয় একটি বিশেষ ডিম-রুটি। কথিত আছে, এই পদটির নাম রাখা হয়েছিল ‘জাবির ফালা’, যার অর্থ ডিম রুটি। নতুন খাবারটি নিয়ে রাঁধুনি হাজির হন সম্রাটের দরবারে।

সম্রাটের পছন্দ হল সেই নতুন পদ

গল্প অনুযায়ী, ‘জাবির ফালা’ চেখে সম্রাট জাহাঙ্গীর অত্যন্ত খুশি হন। নতুন এই খাবার তাঁর পছন্দ হয়ে যায়। খুশি হয়ে রাঁধুনিকে বিপুল পুরস্কার দেওয়ার কথাও প্রচলিত রয়েছে।লোককথা অনুযায়ী, তাঁকে ১ হাজার ১টি স্বর্ণমুদ্রা উপহার দেওয়া হয়েছিল। পাশাপাশি বাংলায় একটি জমিদারিও উপহার হিসেবে দেওয়ার কথা বলা হয়।

‘জাবির ফালা’ থেকেই কি মোগলাই পরোটা?

প্রচলিত এই কাহিনি অনুযায়ী, সম্রাটের জন্য তৈরি সেই ডিম-রুটিই পরবর্তীকালে নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে মোগলাই পরোটার রূপ নেয়। সময়ের সঙ্গে কলকাতার খাবারের সংস্কৃতিতে এটি নিজের জায়গা করে নেয়।বর্তমানে মোগলাই পরোটার সঙ্গে ডিমের পাশাপাশি পেঁয়াজ, কাঁচালঙ্কা, মশলা এবং অনেক ক্ষেত্রে কিমা বা মাংসের পুরও ব্যবহার করা হয়। কলকাতার বিভিন্ন জনপ্রিয় খাবারের দোকানে এই পদ আজও অত্যন্ত জনপ্রিয়।

কলকাতার মোগলাই মানেই নস্টালজিয়া

কলকাতার মোগলাই পরোটার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শহরের নিজস্ব খাদ্যঐতিহ্য। স্প্ল্যানেডের অনাদি কেবিন থেকে গড়িয়াহাটের দাস কেবিন—বিভিন্ন পুরনো খাবারের দোকানে মোগলাই পরোটা খেতে আজও ভিড় করেন খাদ্যরসিকরা।স্বাস্থ্য সচেতনতার যুগেও এই তেলেভাজা খাবারের জনপ্রিয়তা কমেনি। কারণ মোগলাই পরোটা শুধুমাত্র একটি পদ নয়, বহু বাঙালির কাছে এটি শহরের পুরনো দিনের স্বাদ, আড্ডা এবং নস্টালজিয়ার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক বিশেষ অনুভূতি।

কলকাতার মোগলাই পরোটা বাঙালির কাছে শুধু একটি খাবার নয়, বরং শহরের খাদ্যসংস্কৃতি ও নস্টালজিয়ার অন্যতম অংশ। তবে নামের সঙ্গে ‘মোগলাই’ থাকলেও প্রচলিত একটি কাহিনি অনুযায়ী, এই জনপ্রিয় খাবারের জন্মের নেপথ্যে ছিলেন বাংলার বর্ধমানের এক রাঁধুনি। কথিত আছে, মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের জন্য নতুন পদ তৈরি করতে গিয়ে তিনি তৈরি করেছিলেন বিশেষ এক ডিম-রুটি, যা পরবর্তীকালে মোগলাই পরোটা নামে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

Leave a comment