বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নারীদের শরীরে নানা ধরনের হরমোনগত পরিবর্তন দেখা যায়। এর মধ্যে অন্যতম হল মেনোপজ। অনেকেই মনে করেন, ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে যাওয়ার অর্থ কেবল প্রজননক্ষমতার অবসান। কিন্তু বাস্তবে এই সময়ে শরীরের বিপাকক্রিয়া থেকে শুরু করে হৃদ্যন্ত্রের স্বাস্থ্যের উপরও প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে ইস্ট্রোজেনের মাত্রা কমে যাওয়ার সঙ্গে কোলেস্টেরল ও রক্তচাপের পরিবর্তনের সম্পর্ক রয়েছে। তাহলে মেনোপজের পর কোন অভ্যাসে বাড়তে পারে হার্ট অ্যাটাকের আশঙ্কা? কীভাবে আগেভাগে সতর্ক হবেন?
মেনোপজের পর কেন বাড়তে পারে কোলেস্টেরল?
মেনোপজের সময় ইস্ট্রোজেন হরমোনের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এই হরমোন নারীদের প্রজননস্বাস্থ্যের পাশাপাশি শরীরের বিভিন্ন বিপাকীয় প্রক্রিয়াতেও ভূমিকা রাখে। মেনোপজের আশপাশের সময়ে অনেকের রক্তে এলডিএল বা ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে এইচডিএল, ট্রাইগ্লিসারাইড এবং অন্যান্য হৃদ্রোগের ঝুঁকিসূচক উপাদানেও পরিবর্তন দেখা যেতে পারে।তবে ঋতুস্রাব বন্ধ হলেই প্রত্যেক নারীর কোলেস্টেরল বেড়ে যাবে, এমন নয়। বয়স, বংশগত কারণ, খাদ্যাভ্যাস, শরীরচর্চা এবং অন্যান্য শারীরিক অবস্থাও এর উপর প্রভাব ফেলে।
ইস্ট্রোজেন কমলে রক্তচাপের উপর কী প্রভাব পড়ে?
ইস্ট্রোজেন রক্তনালির স্বাভাবিক কার্যকারিতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। মেনোপজের পর হরমোনের মাত্রা কমে যাওয়ার সঙ্গে রক্তনালির নমনীয়তা এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আসতে পারে। এই সময়ে অনেক নারীর উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকিও বাড়ে।দীর্ঘদিন রক্তচাপ বেশি থাকলে হৃদ্যন্ত্রকে অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হয়। পাশাপাশি ধমনির ক্ষতির আশঙ্কাও বাড়তে পারে। তাই মাথা ঘোরা বা অন্য কোনও উপসর্গ না থাকলেও নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ।
পেটের চারপাশে চর্বি জমা কি বিপদের সংকেত?
মেনোপজের সময় অনেক নারীর শরীরে চর্বি জমার ধরনে পরিবর্তন আসে। বিশেষ করে কোমর ও পেটের চারপাশে ভিসারাল ফ্যাট বা অভ্যন্তরীণ চর্বি বাড়তে পারে। এই ধরনের চর্বি শরীরের বিপাকক্রিয়াকে প্রভাবিত করে এবং ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স, রক্তে শর্করার সমস্যা ও অস্বাভাবিক কোলেস্টেরলের ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত।তাই শুধু ওজন মাপলেই হবে না, কোমরের মাপ এবং রক্তে শর্করার মাত্রার দিকেও নজর রাখা দরকার। তবে পেটের মেদ বাড়লেই যে হৃদ্রোগ হবে, তা নয়। অন্যান্য ঝুঁকির সঙ্গে মিলিয়ে চিকিৎসক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করেন।
কোন একটি ভুলে বাড়তে পারে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি?
মেনোপজের পর সবচেয়ে বড় ভুলগুলির মধ্যে একটি হল নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এড়িয়ে যাওয়া এবং কোলেস্টেরল বা রক্তচাপের পরিবর্তনকে গুরুত্ব না দেওয়া।উচ্চ কোলেস্টেরল বা উচ্চ রক্তচাপ অনেক সময় কোনও স্পষ্ট উপসর্গ ছাড়াই থাকতে পারে। ফলে শরীর ভালো লাগছে বলে পরীক্ষা না করালে সমস্যা অজান্তেই বাড়তে পারে। ধমনিতে চর্বিজাতীয় পদার্থ জমে প্লাক তৈরি হলে সময়ের সঙ্গে হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে।তাই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী লিপিড প্রোফাইল, রক্তচাপ এবং রক্তে শর্করা পরীক্ষা করানো উচিত। কত ঘন ঘন পরীক্ষা প্রয়োজন, তা নির্ভর করবে বয়স, পারিবারিক ইতিহাস এবং ব্যক্তিগত ঝুঁকির উপর।
মেনোপজের পর হৃদ্যন্ত্র সুস্থ রাখবেন কীভাবে?
মেনোপজ জীবনের স্বাভাবিক পর্যায় হলেও এই সময়ে হৃদ্যন্ত্রের সুস্থতা বজায় রাখতে কিছু অভ্যাস উপকারী হতে পারে।
- নিয়মিত হাঁটুন: নিজের শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী হাঁটা বা অন্য কোনও মাঝারি মাত্রার শরীরচর্চা করুন। ধীরে ধীরে সময় ও পরিশ্রমের মাত্রা বাড়ানো যেতে পারে।
- খাদ্যাভ্যাসে নজর দিন: শাকসবজি, ফল, ডাল, গোটা শস্য, বাদাম এবং উপযুক্ত পরিমাণে প্রোটিন রাখুন। অতিরিক্ত লবণ, চিনি ও স্যাচুরেটেড ফ্যাটযুক্ত খাবার কমান।
- ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন: সুষম খাবার ও নিয়মিত শরীরচর্চার মাধ্যমে স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখার চেষ্টা করুন।
- পর্যাপ্ত ঘুমান: নিয়মিত ঘুমের সময় বজায় রাখুন। দীর্ঘদিন ঘুমের সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন।
- ধূমপান এড়িয়ে চলুন: ধূমপান হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। ধূমপান ছাড়তে প্রয়োজনে পেশাদার সহায়তা নিন।
- নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান: রক্তচাপ, কোলেস্টেরল ও রক্তে শর্করার মাত্রা সম্পর্কে সচেতন থাকুন।
মেনোপজ মানেই কি হৃদ্রোগ?
একেবারেই নয়। মেনোপজের পর হৃদ্রোগের ঝুঁকির কিছু উপাদান বাড়তে পারে, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে প্রত্যেক নারীর হার্ট অ্যাটাক হবে। ঝুঁকি কতটা, তা নির্ভর করে সামগ্রিক স্বাস্থ্যের উপর।হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি বা এইচআরটি নেওয়ার কথা ভাবলে নিজে থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। উপসর্গ, বয়স, মেনোপজের সময়কাল এবং ব্যক্তিগত রোগের ইতিহাস বিবেচনা করে চিকিৎসক এর সুবিধা ও ঝুঁকি ব্যাখ্যা করতে পারেন। শুধুমাত্র হৃদ্রোগ প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে নিজে থেকে হরমোনের ওষুধ শুরু করা ঠিক নয়।জরুরি সতর্কতা: বুকে চাপ বা ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, ঠান্ডা ঘাম, হঠাৎ দুর্বলতা কিংবা হাত, পিঠ, ঘাড় বা চোয়ালে ব্যথার মতো উপসর্গ দেখা দিলে তা অবহেলা করবেন না। হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ নারীদের ক্ষেত্রে সব সময় একই রকম নাও হতে পারে। এমন উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নিন।
মেনোপজ বা ঋতুস্রাব স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়া নারীদের জীবনের একটি স্বাভাবিক পর্যায়। সাধারণত ৪৫ থেকে ৫৫ বছর বয়সের মধ্যে এই পরিবর্তন ঘটে। তবে মেনোপজের সময় ইস্ট্রোজেন হরমোনের মাত্রা কমে যাওয়ায় কোলেস্টেরল, রক্তচাপ এবং শরীরে চর্বি জমার ধরনে পরিবর্তন আসতে পারে। ফলে বাড়তে পারে হৃদ্রোগের ঝুঁকি। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা না করানো এবং জীবনযাত্রার অনিয়ম এই ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই মেনোপজের পর হৃদ্যন্ত্রের সুস্থতা বজায় রাখতে খাদ্যাভ্যাস, শরীরচর্চা ও স্বাস্থ্য পরীক্ষার দিকে বিশেষ নজর দেওয়া জরুরি।













