রাতে এক গ্লাস জলে মেথি ভিজিয়ে রেখে সকালে খালি পেটে সেই জল পান করার অভ্যাস রয়েছে অনেকের। কারও বিশ্বাস, এতে ওজন কমে, কারও মতে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে থাকে, আবার কেউ কেউ হজমের সমস্যা কমাতেও মেথির উপর ভরসা করেন। মেথিতে কিছু উপকারী পুষ্টি উপাদান থাকলেও নিয়মিত মেথি ভেজানো জল পান করলেই যে সব সমস্যার সমাধান হবে, এমনটা নয়। বিশেষ করে কয়েকটি শারীরিক সমস্যা থাকলে বা নির্দিষ্ট ওষুধ খেলে মেথি খাওয়ার আগে সতর্ক হওয়া জরুরি।
গর্ভবতী মহিলাদের মেথি খাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা জরুরি
গর্ভাবস্থায় রান্নায় স্বাভাবিক পরিমাণে মেথি ব্যবহার এবং বেশি পরিমাণে মেথি বা মেথির সাপ্লিমেন্ট খাওয়া এক বিষয় নয়। বেশি মাত্রায় মেথি গ্রহণের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তাই গর্ভবতী মহিলাদের মেথি ভেজানো জল বা ওষুধের মতো করে মেথি খাওয়ার অভ্যাস শুরু করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
অস্ত্রোপচার হওয়ার কথা থাকলে চিকিৎসককে জানান
মেথি রক্তে শর্করার মাত্রায় প্রভাব ফেলতে পারে। রক্ত জমাট বাঁধার প্রক্রিয়াতেও এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তাই যাঁদের অস্ত্রোপচার হওয়ার কথা, তাঁরা নিয়মিত বেশি পরিমাণে মেথি খেলে চিকিৎসককে বিষয়টি জানান। অস্ত্রোপচারের আগে কখন মেথি বা কোনও সাপ্লিমেন্ট বন্ধ করতে হবে, তা চিকিৎসকই নির্ধারণ করবেন।
রক্ত পাতলা করার ওষুধ খেলে সাবধান
ওয়ারফারিনের মতো রক্ত জমাট বাঁধা প্রতিরোধের ওষুধ যাঁরা খান, তাঁদের বেশি পরিমাণে মেথি খাওয়া বা মেথির সাপ্লিমেন্ট নেওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। কিছু ভেষজ উপাদান ও ওষুধ একসঙ্গে ব্যবহার করলে রক্তপাতের ঝুঁকি বা ওষুধের কার্যকারিতায় পরিবর্তন হতে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধের মাত্রা পরিবর্তন করবেন না।
ডায়াবিটিসের রোগীদের হতে পারে রক্তে শর্করা কমে যাওয়ার আশঙ্কা
রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে মেথির সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে কিছু গবেষণা হয়েছে। কিন্তু মেথি ডায়াবিটিসের চিকিৎসার বিকল্প নয়। যাঁরা ইনসুলিন বা গ্লিমেপিরাইডের মতো রক্তে শর্করা কমানোর ওষুধ ব্যবহার করেন, তাঁরা বেশি পরিমাণে মেথি খেলে সুগার অতিরিক্ত কমে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
তাই ডায়াবিটিস থাকলে প্রতিদিন মেথি ভেজানো জল খাওয়ার আগে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন। চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধ নিজে থেকে বন্ধ করবেন না।
গ্যাস, পেট ফাঁপা বা IBS থাকলে পরিমাণের দিকে নজর দিন
মেথিতে ফাইবার রয়েছে। তবে বেশি পরিমাণে খেলে কারও কারও পেট ফাঁপা, গ্যাস, পেটে অস্বস্তি বা ডায়রিয়া হতে পারে। যাঁরা ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম (IBS) বা দীর্ঘদিনের হজমের সমস্যায় ভুগছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে উপসর্গ বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
মেথি খাওয়ার পর বারবার অস্বস্তি হলে পরিমাণ কমানো বা খাওয়া বন্ধ করার বিষয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
থাইরয়েডের ওষুধ খেলে মেথির সাপ্লিমেন্ট নেওয়ার আগে পরামর্শ নিন
থাইরয়েডের সমস্যা থাকলে এবং নিয়মিত ওষুধ খেলে বেশি পরিমাণে মেথি বা মেথির সাপ্লিমেন্ট নেওয়ার আগে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা ভাল। ওষুধের সঙ্গে মেথির সম্ভাব্য পারস্পরিক প্রভাব এবং কখন কীভাবে খাওয়া উচিত, তা নির্দিষ্ট ওষুধ ও শারীরিক অবস্থার উপর নির্ভর করতে পারে। তাই নিজে থেকে ওষুধ ও মেথি খাওয়ার সময়ের ব্যবধান নির্ধারণ করবেন না।
মেথিতে অ্যালার্জি থাকলে এড়িয়ে চলুন
কিছু মানুষের মেথি থেকে অ্যালার্জি হতে পারে। মেথি খাওয়ার পর ত্বকে র্যাশ, চুলকানি বা শরীরের কোনও অংশ ফুলে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে সতর্ক হন। শ্বাসকষ্ট, গলা বা জিভ ফুলে যাওয়া কিংবা তীব্র অ্যালার্জির লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নিন।
স্তন্যপান করালে বেশি মাত্রায় মেথি খাওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন
স্তন্যপান করানোর সময়ে কেউ কেউ দুধের পরিমাণ বাড়ানোর আশায় মেথি খান। কিন্তু এর কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা সবার ক্ষেত্রে একরকম নয়। বেশি পরিমাণে মেথি খেলে মা ও শিশুর ক্ষেত্রে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে। তাই এই সময়ে মেথির সাপ্লিমেন্ট বা নিয়মিত বেশি মাত্রায় মেথি খাওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
মেথি খাওয়ার আগে কী কী মাথায় রাখবেন?
- রান্নায় স্বাভাবিক পরিমাণে মেথি ব্যবহার করা এবং প্রতিদিন বেশি মাত্রায় মেথি খাওয়া এক নয়।
- মেথি ভেজানো জল ওজন কমানো বা ডায়াবিটিস নিয়ন্ত্রণের নিশ্চিত উপায় নয়।
- দীর্ঘদিনের অসুখ থাকলে বা নিয়মিত ওষুধ খেলে মেথির সাপ্লিমেন্ট নেওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
- মেথি খাওয়ার পর অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখা দিলে তা উপেক্ষা করবেন না।
মেথি শুধু রান্নার মশলা নয়, এতে রয়েছে ফাইবার, আয়রন ও ম্যাগনেশিয়ামের মতো পুষ্টি উপাদান। রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে মেথির কিছু সম্ভাব্য উপকারিতা নিয়ে গবেষণা হলেও এটি ডায়াবিটিসের ওষুধ বা ওজন কমানোর নিশ্চিত উপায় নয়। বরং অতিরিক্ত মেথি খেলে হজমের সমস্যা হতে পারে এবং কিছু ওষুধের সঙ্গে প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কাও থাকে। গর্ভবতী মহিলা, ডায়াবিটিসের ওষুধ ব্যবহারকারী এবং রক্ত পাতলা করার ওষুধ খাওয়া ব্যক্তিদের তাই বিশেষ সতর্ক থাকা প্রয়োজন।













