হঠাৎ মাথার একদিকে দপদপ করে ব্যথা, সঙ্গে আলো বা শব্দ সহ্য না হওয়া—মাইগ্রেনের এই যন্ত্রণা অনেকের দৈনন্দিন জীবনকে ব্যাহত করে। আবার কারও ক্ষেত্রে মাথাব্যথা ছাড়াই চোখে আলোর ঝলকানি, দৃষ্টিবিভ্রম বা ঝিনঝিনে ভাব দেখা দিতে পারে। মাইগ্রেনের কারণ ও ট্রিগার ব্যক্তি বিশেষে আলাদা হলেও কিছু খাবার এবং জীবনযাপনের অভ্যাস সমস্যা বাড়াতে পারে বলে জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

কোন কোন খাবার মাইগ্রেনের ট্রিগার হতে পারে?
সব মাইগ্রেন রোগীর জন্য একই খাবার সমস্যা তৈরি করে না। তবে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী কিছু মানুষের ক্ষেত্রে কয়েকটি খাবার বা পানীয় ট্রিগার হিসেবে কাজ করতে পারে।
এর মধ্যে রয়েছে—
চকোলেট
কিছু ধরনের বাদাম
অতিরিক্ত MSG বা আজিনামোটো দেওয়া খাবার
অত্যন্ত ঠান্ডা খাবার বা পানীয়
কোল্ড ড্রিঙ্কস
চিজ
কিছু পনিরজাত খাবার
আইসক্রিম
তবে কোনও একটি খাবার খেলেই প্রত্যেকের মাইগ্রেন হবে—এমন নয়। তাই নিজের ক্ষেত্রে কোন খাবারের পর সমস্যা বাড়ছে, সেটি লক্ষ্য করা জরুরি।
শুধু খাবার নয়, খাওয়ার সময়ও গুরুত্বপূর্ণ
অনেকক্ষণ না খেয়ে থাকা বা দুই বেলার খাবারের মধ্যে অত্যধিক সময়ের ব্যবধান থাকলেও কারও কারও মাইগ্রেনের সমস্যা বেড়ে যেতে পারে। তাই দীর্ঘ সময় খালি পেটে না থেকে নির্দিষ্ট সময়ে খাবার খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা গুরুত্বপূর্ণ।অর্থাৎ, মাইগ্রেন নিয়ন্ত্রণে শুধু ‘কী খাচ্ছেন’ নয়, ‘কখন খাচ্ছেন’ সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

মাইগ্রেনের সাধারণ উপসর্গ কী?
মাইগ্রেনের সময় সবার একই ধরনের উপসর্গ হয় না। সাধারণভাবে দেখা যেতে পারে—
মাঝারি থেকে তীব্র দপদপে মাথাব্যথা
বমি বমি ভাব বা বমি
আলো সহ্য না হওয়া
শব্দে অস্বস্তি
গন্ধে সংবেদনশীলতা
মাথা ঘোরা
অতিরিক্ত ক্লান্তি
ঘাড় শক্ত লাগা
খিটখিটে মেজাজ
চোখে আলোর ঝলকানি বা আঁকাবাঁকা রেখা দেখা
মুখ বা হাতে ঝিনঝিনে ভাব কিংবা অবশ লাগা
মেনোপজের পর কি মাইগ্রেন কমে?
মহিলাদের মধ্যে মাইগ্রেন তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। হরমোনের ওঠানামার সঙ্গেও অনেকের মাইগ্রেনের সম্পর্ক থাকতে পারে। বিশেষজ্ঞের বক্তব্য অনুযায়ী, মেনোপজের পর বা প্রায় ৫০ বছর বয়স পেরোনোর পর অনেক মহিলার ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে মাইগ্রেনের প্রবণতা কমতে পারে।তবে এটি সবার ক্ষেত্রে একইভাবে ঘটবে না। মেনোপজের পরও কারও মাইগ্রেন চলতে পারে বা নতুন ধরনের মাথাব্যথা শুরু হতে পারে। তাই বয়স বাড়ার পর মাথাব্যথার ধরন বদলালে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
জল কম খেলেও বাড়তে পারে সমস্যা
ডিহাইড্রেশন বা শরীরে জল কমে যাওয়া মাইগ্রেনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রিগার হতে পারে। আবার মাইগ্রেনের সময় বমি হলে শরীর থেকে আরও জল বেরিয়ে গিয়ে ডিহাইড্রেশন তৈরি হতে পারে।তাই পর্যাপ্ত জল পান করা এবং শরীরে জলশূন্যতা তৈরি না হতে দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
মাইগ্রেনে চা-কফি কি উপকার করে?
ক্যাফেইন কিছু মানুষের ক্ষেত্রে মাইগ্রেনের ব্যথা সাময়িকভাবে কমাতে সাহায্য করতে পারে। তাই ব্যথা শুরু হলে অল্প পরিমাণ চা বা কফি কারও ক্ষেত্রে উপকারী হতে পারে।তবে এর অর্থ বেশি করে চা-কফি পান করা নয়। অতিরিক্ত ক্যাফেইন আবার মাথাব্যথার সমস্যা বাড়াতে পারে বা নিয়মিত ক্যাফেইনের উপর নির্ভরতা তৈরি করতে পারে। তাই নিজের শরীরের প্রতিক্রিয়া বুঝে সীমিত পরিমাণে নেওয়াই ভালো।

ঘরোয়া ভাবে মাইগ্রেন সামলাতে কী করবেন?
মাইগ্রেন নিয়ন্ত্রণে জীবনযাপনের নিয়ম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী—
পর্যাপ্ত ঘুম: প্রতিদিন ঘুমের সময় যতটা সম্ভব নিয়মিত রাখুন।
সময় মেনে খাবার: দীর্ঘক্ষণ খালি পেটে থাকবেন না।
পর্যাপ্ত জল: ডিহাইড্রেশন এড়িয়ে চলুন।
স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণ: অতিরিক্ত মানসিক চাপ অনেকের ক্ষেত্রে মাইগ্রেনের বড় ট্রিগার হতে পারে।
নিজের ট্রিগার চিহ্নিত করুন: কোন খাবার, পানীয়, ঘুমের ঘাটতি বা পরিস্থিতির পর ব্যথা শুরু হচ্ছে, তা লিখে রাখলে নিজের ট্রিগার বোঝা সহজ হয়।
বারবার ব্যথা হলে সাবধান
সপ্তাহে একবারের বেশি মাইগ্রেন হলে বা বারবার ব্যথার জন্য ওষুধ খেতে হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। ঘন ঘন পেনকিলার খাওয়ার অভ্যাস উল্টে মাথাব্যথার সমস্যা বাড়িয়ে দিতে পারে।তাই নিজের মতো করে নিয়মিত ব্যথার ওষুধ খাওয়ার পরিবর্তে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।
মাথাব্যথা ছাড়াও কি মাইগ্রেন হতে পারে?
হ্যাঁ, কিছু ক্ষেত্রে মাথাব্যথা ছাড়াও মাইগ্রেনের মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। একে অনেক সময় silent migraine বা acephalgic migraine বলা হয়।এ ক্ষেত্রে মাথাব্যথা না থাকলেও চোখে আলোর ঝলকানি, দৃষ্টিবিভ্রম, মুখ বা হাতে ঝিনঝিনে ভাব, মাথা ঘোরা, আলো-শব্দে সংবেদনশীলতা, বমি বমি ভাব বা মনোযোগে সমস্যা হতে পারে।তবে এমন উপসর্গ নতুন করে দেখা দিলে শুধুমাত্র মাইগ্রেন ধরে নেওয়া উচিত নয়। বিশেষ করে হঠাৎ দৃষ্টির সমস্যা, কথা বলতে অসুবিধা, শরীরের একদিকে অবশভাব বা তীব্র মাথাব্যথা হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

মাইগ্রেন শুধু সাধারণ মাথাব্যথা নয়। তীব্র মাথাব্যথার সঙ্গে বমি বমি ভাব, আলো-শব্দে অস্বস্তি, চোখে ঝলকানি বা মাথা ঘোরার মতো উপসর্গও দেখা দিতে পারে। কিছু খাবার, অনিয়মিত খাওয়া, কম ঘুম, স্ট্রেস ও জলশূন্যতা অনেকের ক্ষেত্রে মাইগ্রেনের ট্রিগার হতে পারে। তবে সবার ট্রিগার এক নয়। কলকাতার স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী জেনে নিন কীভাবে নিজের ট্রিগার চিহ্নিত করবেন এবং ব্যথা নিয়ন্ত্রণে কী কী অভ্যাস কাজে লাগতে পারে।








