হরমুজ প্রণালীর কাছে দুটি তেলবাহী ট্যাঙ্কারে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় এক ভারতীয় ক্রু সদস্য নিহত এবং আরও আটজন আহত হয়েছেন। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র টানা তৃতীয় রাত ইরানের একাধিক সামরিক স্থাপনায় বিমান হামলা চালানোর কথা নিশ্চিত করেছে, যার ফলে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ওমানের সামুদ্রিক এলাকার কাছে হরমুজ প্রণালীতে ‘মোমবাসা’ এবং ‘আল বাহিয়া’ নামে দুটি তেলবাহী ট্যাঙ্কারে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়। হামলায় এক ভারতীয় ক্রু সদস্য নিহত হন এবং আরও আটজন আহত হন। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, হামলার পর দুটি জাহাজকে নিরাপদ এলাকায় সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থাগুলি ঘটনাটির তদন্ত করছে এবং এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) নিশ্চিত করেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র টানা তৃতীয় রাত ইরানের একাধিক সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালিয়েছে। CENTCOM-এর মতে, এই অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করা এবং হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ ও বেসামরিক নৌপরিবহনের জন্য বিদ্যমান হুমকি কমানো। সংস্থাটি জানায়, বুশেহর, চাবাহার, জাস্ক, কোনারক, আবু মুসা এবং বন্দর আব্বাসে অবস্থিত সামরিক স্থাপনায় নির্ভুল অস্ত্র দিয়ে হামলা চালানো হয়। অভিযানটি প্রায় পাঁচ ঘণ্টা স্থায়ী হয়।
যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা করেছে যে, তাদের নৌবাহিনী ইরানি বন্দরগুলোতে আসা-যাওয়া করা সামুদ্রিক চলাচলের ওপর পুনরায় নজরদারি ও অবরোধ কার্যক্রম শুরু করবে। মার্কিন কর্মকর্তারা বলেছেন, নির্ধারিত নিয়ম মেনে চলা জাহাজগুলোকে আঞ্চলিক সমুদ্রপথ ব্যবহার করতে দেওয়া হবে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, এই পদক্ষেপের উদ্দেশ্য অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম পরিবহন প্রতিরোধ করা।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে এবং এর বিনিময়ে এই পথ দিয়ে চলাচলকারী প্রতিটি কার্গোর ওপর ২০ শতাংশ ফি আরোপ করা হবে। তিনি আরও বলেন, ইরানি জাহাজ এবং তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গ্রাহকদের ওপর নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হয়েছে। তবে প্রস্তাবটির বাস্তব ও আইনি দিক নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা চলছে।

CENTCOM জানিয়েছে, বন্দর আব্বাসে অবস্থিত ইরানের নৌঘাঁটি এবং সাবমেরিন রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্রও হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ভবিষ্যতে জাহাজে হামলার সম্ভাবনা কমাতে ইরানের সামুদ্রিক সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করাই এই অভিযানের উদ্দেশ্য।
ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের উপদেষ্টা মোহাম্মদ মোখবর বলেছেন, হরমুজ প্রণালীতে ইরান তার প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখবে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের চাপ বা সামরিক পদক্ষেপের মুখে ইরান পিছু হটবে না। ইরান পুনর্ব্যক্ত করেছে যে, নিজেদের সামুদ্রিক স্বার্থ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত তারা নিজেরাই নেবে।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) দাবি করেছে, তারা বাহরাইনের আল-জুফাইর সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। সংগঠনটির দাবি অনুযায়ী, হামলায় অস্ত্রভাণ্ডার, যোগাযোগ কেন্দ্র এবং মার্কিন সেনাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি ভবনকে লক্ষ্য করা হয়। ইরান এই অভিযানের নাম দিয়েছে ‘নাসর-২’ এবং এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের জবাব হিসেবে উল্লেখ করেছে।
নিউজম্যাক্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, সাম্প্রতিক মার্কিন হামলায় ইরানের সামরিক সক্ষমতার বড় ক্ষতি হয়েছে। একই সময়ে আঞ্চলিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, রাশিয়ার বিশেষ কমান্ড বিমান Tu-214PU তেহরানে পৌঁছেছে। জরুরি পরিস্থিতি ও বড় সামরিক অভিযানের সময় এই বিমান কমান্ড সেন্টার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তবে এ বিষয়ে রাশিয়ার পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ দেওয়া হয়নি।
শিপ ট্র্যাকিং সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী তেল ও গ্যাসবাহী ট্যাঙ্কারের সংখ্যা গত প্রায় দুই মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হলে বৈশ্বিক তেল সরবরাহে প্রভাব পড়তে পারে এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনার মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ৩ শতাংশের বেশি বেড়েছে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রতি ব্যারেল প্রায় ৭৮ ডলারে পৌঁছেছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালীতে নৌপরিবহন দীর্ঘ সময় ব্যাহত হলে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে এবং এর প্রভাব বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতে পড়তে পারে।
হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ। বৈশ্বিক তেল রপ্তানির বড় অংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে অঞ্চলে চলমান সামরিক উত্তেজনার প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও এশিয়া, ইউরোপ এবং অন্যান্য দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, নৌপরিবহন শিল্প ও বৈশ্বিক বাণিজ্যে পড়তে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী দিনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনার গতিপ্রকৃতি আন্তর্জাতিক বাজার এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে।










