মুর্শিদাবাদ মানেই নবাবি ইতিহাস, জমিদারি ঐতিহ্য আর শতাব্দীপ্রাচীন স্থাপত্য। কিন্তু এই জেলার কান্দি শহরে এমন এক জায়গা আছে, যেখানে ইতিহাস শুধু দেখা যায় না—প্রতিদিন ব্যবহারও করা হয়। রাজবাড়ির অন্দরমহলের ভিতরেই চলছে একটি সক্রিয় পোস্ট অফিস, যা একদিকে যেমন আধুনিক ডাক পরিষেবা দিচ্ছে, তেমনই বহন করে চলেছে কয়েক শতকের স্মৃতি।
রাজবাড়ির ভিতরে ডাকঘর, ভারতের বিরল ঐতিহ্য
মুর্শিদাবাদ জেলার কান্দি শহরে অবস্থিত জেমো রাজবাটি সাব-পোস্ট অফিস (Jemo Rajbati SO) দেশের হাতে গোনা কয়েকটি পোস্ট অফিসের মধ্যে অন্যতম, যা রাজবাড়ির অভ্যন্তরে অবস্থিত। এই ডাকঘর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ভারতের স্বাধীনতার প্রায় ৩৪ বছর আগে—যা আজও অবিচ্ছিন্নভাবে পরিষেবা দিয়ে চলেছে।
জেমো রাজবাটি পোস্ট অফিস: পরিচয় ও পরিষেবা
জেমো রাজবাড়ির ভিতরে অবস্থিত এই সাব-পোস্ট অফিসটির পিনকোড 742140। এটি একটি ডেলিভারি পোস্ট অফিস, যেখানে স্থানীয় বাসিন্দারা চিঠিপত্র, পার্সেল, সঞ্চয় প্রকল্প-সহ একাধিক ডাক পরিষেবা পান। আশ্চর্যের বিষয়, ঐতিহ্যবাহী কাঠামোর মধ্যেই আধুনিক কম্পিউটারাইজড পরিষেবাও চালু রয়েছে।
ইতিহাসের পাতায় ফিরে দেখা
১৯৮১ সালের ১ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে এই পোস্ট অফিস। সেই সময় এলাকায় রাজপরিবারের সক্রিয় উপস্থিতি ছিল। তৎকালীন সুপারিন্টেন্ডেন্ট অফ পোস্ট অফিস শ্রী আর. এন. বাগ-এর উদ্যোগেই শুরু হয়েছিল এই ব্যতিক্রমী ডাকঘরের পথচলা। সময় বদলালেও তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব একটুও ম্লান হয়নি।
জেমো রাজবংশের ইতিহাস
জেমো রাজবংশের সূচনা হয়েছিল জমিদারি প্রথার হাত ধরে। কালীশঙ্করের পুত্র পরমানন্দ ছিলেন এই অঞ্চলের প্রভাবশালী জমিদার। রাজবাড়ির কর্মাধ্যক্ষ গঙ্গাধর ত্রিবেদীর দত্তক পুত্র বলভদ্র ত্রিবেদীর হাত ধরেই জেমো নতুনবাটি জমিদার বংশের সূচনা। এই বংশের অন্যতম উজ্জ্বল নাম রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, যিনি জেমো ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয়।
কান্দি শহরের ঐতিহাসিক গুরুত্ব
ইংরেজ আমলে ১৮৫৬ সালে গঠিত হয় কান্দি মহকুমা। ১৮৫৯ সালে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় কান্দি স্কুল। একই বছরে গড়ে ওঠে কান্দি পৌরসভা এবং পরে ১৮৮৬ সালে কান্দি হাসপাতাল। মুঘল আমলে এই অঞ্চলের নাম ছিল ‘ফতেসিংহ পরগনা’—যা কান্দির প্রাচীন পরিচয় বহন করে।
মুর্শিদাবাদের কান্দি শহরে এমন এক ডাকঘর রয়েছে, যা আজও রাজবাড়ির অন্দরমহলের ভিতর থেকেই পরিষেবা দেয়। স্বাধীনতার বহু আগের এই ডাকঘর শুধু যোগাযোগের কেন্দ্র নয়, বরং ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক জীবন্ত নিদর্শন।













