‘মন কি বাত’-এর ১৩৫তম পর্বে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দেশের মানুষের উদ্দেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে জাতীয় নিরাপত্তা, আত্মনির্ভরতা, সামাজিক সুরক্ষা, বৈজ্ঞানিক মনোভাব, খেলাধুলা, প্রযুক্তি, ভারতীয় সংস্কৃতি এবং পরিবেশ সংরক্ষণসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। তিনি নৌবাহিনীর নতুন যুদ্ধজাহাজ, সি-২৯৫ বিমান, ডিআরডিও-র ক্ষেপণাস্ত্র, আন্তর্জাতিক যোগ দিবস, বীমা প্রকল্প, কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সচেতনতা, মেঘালয়ের জীবন্ত শিকড়ের সেতু এবং মাটির গণেশ প্রতিমার প্রসঙ্গ তুলে নাগরিক দায়িত্বের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জুন মাসে প্রতিরক্ষা ও বিমান চলাচল খাতে ভারতের একাধিক সাফল্য দেশের আত্মবিশ্বাসকে আরও শক্তিশালী করেছে। তিনি কলকাতায় অনুষ্ঠিত ভারতীয় নৌবাহিনীর অনুষ্ঠানের উল্লেখ করে জানান, আইএনএস দুনাগিরি, আইএনএস সংশোধক এবং আইএনএস অগ্রয় ভারতীয় নৌবাহিনীর বহরে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই যুদ্ধজাহাজগুলির নকশা ও নির্মাণ ভারতে হয়েছে, যা দেশের সামুদ্রিক সক্ষমতা এবং স্বদেশি প্রতিরক্ষা শক্তির প্রতিফলন।
প্রধানমন্ত্রী সি-২৯৫ বিমানের প্রথম উড়ানকেও একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এই বিমান ভারতে তৈরি হচ্ছে এবং এ ধরনের ৪০টি বিমান দেশে নির্মাণ করা হচ্ছে। তাঁর মতে, এই উদ্যোগ বিমান চলাচল খাত, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং কর্মসংস্থানের সুযোগের সঙ্গে যুক্ত।
তিনি ডিআরডিও-র স্বদেশি দীর্ঘ-পাল্লার ভূমি-আক্রমণ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের সফল পরীক্ষার কথাও উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, ভারত এখন সমুদ্র থেকে আকাশ পর্যন্ত নিরাপত্তা সংক্রান্ত প্রয়োজন পূরণে আরও আত্মনির্ভর হয়ে উঠছে।
প্রধানমন্ত্রী প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে এই সাফল্যগুলিকে কেবল সামরিক শক্তির উদাহরণ হিসেবে নয়, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, স্থানীয় শিল্প, কর্মসংস্থান এবং আত্মনির্ভর ভারতের বৃহত্তর লক্ষ্যের অংশ হিসেবে তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক যোগ দিবস উপলক্ষে বলেন, এ বছর বিশ্বের বহু দেশে যোগ সম্পর্কিত কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং ভারতে কোটি কোটি মানুষ যোগ কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন। তিনি আহমেদাবাদে অনুষ্ঠিত বিশ্ব যোগাসন চ্যাম্পিয়নশিপের উল্লেখ করে পদকজয়ী ভারতীয় খেলোয়াড়দের অভিনন্দন জানান। তাঁর মতে, যোগ ভারতের পরিচয়, স্বাস্থ্য এবং জীবনযাত্রার সঙ্গে যুক্ত।
তিনি এরপর নাগরিকদের ভূমিকার প্রসঙ্গ তুলে পশ্চিম এশিয়ার উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে তাঁর পূর্ববর্তী আহ্বানের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সংকটের সময় নাগরিকদের শৃঙ্খলা ও আচরণও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি কিছু সময়ের জন্য সোনা কেনা থেকে বিরত থাকা, বিদেশ সফর স্থগিত রাখা, একসঙ্গে যাতায়াত করা এবং কৃষকদের প্রাকৃতিক সার ব্যবহারের আহ্বান জানানোর বিষয়টি উল্লেখ করেন।
তিনি জানান, অনেক পরিবার বিয়েতে নতুন সোনা কেনার পরিবর্তে পুরনো সোনা ব্যবহার করেছে। কেউ কেউ বিদেশ সফর স্থগিত রেখেছেন। অনেক মানুষ পৃথক যানবাহনের পরিবর্তে একসঙ্গে যাতায়াত শুরু করেছেন, যার ফলে জ্বালানি সাশ্রয় হয়েছে। বহু নাগরিক বাস ও মেট্রোর মতো গণপরিবহন ব্যবহার বাড়িয়েছেন। কৃষকদের মধ্যেও প্রাকৃতিক সার ও রাসায়নিকমুক্ত কৃষি নিয়ে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, জাতীয় স্বার্থ কেবল সরকারি নীতির মাধ্যমে নয়, সাধারণ নাগরিকদের ছোট ছোট সিদ্ধান্তের মাধ্যমেও শক্তিশালী হয়। সোনা কম কেনা, জ্বালানি সাশ্রয়, বিদেশ সফর স্থগিত রাখা, স্থানীয় পণ্যের ব্যবহার এবং প্রাকৃতিক কৃষি গ্রহণকে তিনি দায়িত্বশীল নাগরিক আচরণের সঙ্গে যুক্ত করেন।
সামাজিক সুরক্ষার প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী মহারাষ্ট্রের নান্দেড় জেলার বহাদুরপুরা গ্রামের উদাহরণ তুলে ধরেন। তিনি পেঠকর পরিবারের উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে বলেন, পরিবারের একটি বিবাহ উপলক্ষে গ্রামের মানুষের জন্য দুর্ঘটনা বীমার ব্যবস্থা করা হয়েছিল, যেখানে প্রত্যেককে এক লক্ষ টাকা পর্যন্ত বীমা কভার দেওয়া হয়।
এই উদাহরণের মাধ্যমে তিনি প্রধানমন্ত্রী সুরক্ষা বীমা যোজনার কথা উল্লেখ করে বলেন, অল্প বার্ষিক প্রিমিয়ামে দুর্ঘটনা বীমার সুবিধা পাওয়া যায়। তাঁর মতে, এ ধরনের প্রকল্প সাধারণ পরিবারের জন্য কঠিন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক হতে পারে। তিনি এই প্রকল্পগুলির তথ্য পরিবার, গ্রাম এবং আশপাশের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রী জীবন জ্যোতি বীমা যোজনার কথাও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এই প্রকল্পের মাধ্যমে মৃত্যুর ক্ষেত্রে পরিবার আর্থিক সহায়তা পেতে পারে। তাঁর মতে, অল্প অর্থ ব্যয়ে পরিবারগুলির জন্য সুরক্ষার ব্যবস্থা করা সম্ভব এবং দুর্ঘটনা বা অন্য কোনও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে এই সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, কুসংস্কার সমাজের জন্য ক্ষতিকর, কারণ এটি মানুষের মধ্যে ভয় সৃষ্টি করে এবং সত্য, যুক্তি ও প্রমাণ গ্রহণে বাধা দেয়। তিনি সমাজের উন্নয়নের জন্য বৈজ্ঞানিক মনোভাবকে প্রয়োজনীয় বলে উল্লেখ করেন।
এই প্রসঙ্গে তিনি অসমের হারগিলা পাখির উদাহরণ দেন। তিনি বলেন, এই পাখি পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখতে সহায়তা করলেও দীর্ঘদিন ধরে কিছু এলাকায় একে অশুভ বলে মনে করা হতো। ফলে মানুষ এর বাসা থাকা গাছ কেটে ফেলত, যার প্রভাব পাখি এবং পরিবেশ—উভয়ের ওপর পড়ে।
তিনি জীববিজ্ঞানী পূর্ণিমা দেবী বর্মনের উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন, তিনি গ্রামীণ নারীদের এই পাখির গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন করেন। ধীরে ধীরে বহু নারী এই উদ্যোগে যুক্ত হন এবং এটি ‘হারগিলা আর্মি’ নামে পরিচিতি পায়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সঠিক তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছালে পুরনো ভুল ধারণা পরিবর্তন করা সম্ভব। এই উদাহরণের মাধ্যমে তিনি উল্লেখ করেন যে কুসংস্কার প্রকৃতি ও সমাজের ক্ষতি করতে পারে, বৈজ্ঞানিক তথ্য মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে পারে এবং নারী ও স্থানীয় সম্প্রদায় সংরক্ষণমূলক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী নাগাল্যান্ডের ক্রীড়া উদ্যোগের প্রসঙ্গে ‘নাগাল্যান্ড বেবি লিগ’-এর কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এই উদ্যোগের মাধ্যমে শিশুদের ফুটবল দক্ষতা বিকাশের সুযোগ তৈরি হচ্ছে এবং তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস, শৃঙ্খলা, গতি ও দলগত মনোভাব গড়ে উঠছে।
তিনি নাগাল্যান্ড মহিলা ফুটসাল লিগের কথাও উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ফুটসাল ফুটবলের একটি দ্রুতগতির ও ছোট পরিসরের সংস্করণ, যেখানে কম খেলোয়াড় নিয়ে ছোট মাঠে খেলা হয় এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা প্রয়োজন। তিনি এটিকে কন্যাদের দক্ষতা প্রদর্শনের একটি উপযুক্ত মঞ্চ হিসেবে উল্লেখ করেন।
![]()
ভারতীয় জ্ঞানচর্চা ও প্রযুক্তি প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে শাস্ত্রার্থ প্রথার পুনঃপ্রবর্তনের কথা বলেন। তাঁর মতে, শাস্ত্রার্থ কেবল বিতর্ক নয়; এটি যুক্তি, ধৈর্য, প্রমাণভিত্তিক উপস্থাপনা এবং অপর পক্ষের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শোনার একটি ঐতিহ্য।
তিনি দিল্লির কেন্দ্রীয় সংস্কৃত বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ডেটা সায়েন্সে বি.টেক কর্মসূচি চালু করছে। তিনি বলেন, এই উদ্যোগ ভারতীয় ভাষা ও আধুনিক প্রযুক্তির মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন তৈরি করবে এবং ভারতীয় ভাষার জন্য নতুন প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম তৈরি ও প্রাচীন গ্রন্থের ডিজিটাল সংরক্ষণে সহায়ক হতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী ডোমিনিকান রিপাবলিকের ‘ব্রহ্মকমল ডোমিনিকানা’ দলের কথাও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, সেখানে স্প্যানিশভাষী মানুষ বৈদিক সাহিত্য অধ্যয়ন করছেন এবং বৈদিক মন্ত্রের উচ্চারণ শিখছেন। তিনি এটিকে ভারতীয় সংস্কৃতির বৈশ্বিক প্রসারের একটি উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
প্রধানমন্ত্রী মেঘালয়ের জীবন্ত শিকড়ের সেতুর প্রসঙ্গে বলেন, এগুলি প্রকৃতি ও মানবসৃষ্ট সৃজনশীলতার একটি উদাহরণ। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই সেতুগুলি লোহা বা সিমেন্ট দিয়ে নয়, রাবার গাছের শিকড় দীর্ঘ সময় ধরে নির্দিষ্ট দিকে বৃদ্ধি করিয়ে তৈরি করা হয় এবং এগুলি নির্মাণে কয়েক দশক সময় লাগে।
তিনি জানান, ভারত মেঘালয়ের এই শিকড়ের সেতুগুলিকে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য নেটওয়ার্কে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য আবেদন করেছে। তিনি স্থানীয় সম্প্রদায়ের ভূমিকাও উল্লেখ করে বলেন, তারা সেতুগুলির রক্ষণাবেক্ষণের পাশাপাশি আশপাশে উদ্ভিদের নার্সারিও গড়ে তুলছে। তাঁর মতে, ঐতিহ্য সংরক্ষণে স্থানীয় সমাজের অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ।
মধ্যপ্রদেশের রাজগড় জেলার ব্যাওরার নারীদের উদ্যোগের কথাও প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, তাঁরা প্লাস্টিক বর্জ্য ও খালি বোতল সংগ্রহ করে ইকো-ব্রিক তৈরি করছেন এবং সেগুলির মাধ্যমে জনপরিসর উন্নয়নের কাজ করছেন। তিনি এটিকে বর্জ্যকে সমাধানে রূপান্তরের একটি উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
গণেশ উৎসব উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান, যাতে গণেশ প্রতিমা দেশীয় মাটি দিয়ে এবং স্থানীয় কুমোর ও শিল্পীদের হাতে তৈরি হয়। তিনি প্লাস্টার অফ প্যারিসের প্রতিমা না কেনার পরামর্শ দেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মাটির প্রতিমা পূজার পর স্বাভাবিকভাবে জলে মিশে যায় এবং নদী, পুকুর ও পরিবেশ সংরক্ষণে সহায়তা করে।
শেষে প্রধানমন্ত্রী বৃষ্টির জল সংরক্ষণের ওপর জোর দিয়ে বলেন, বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা সংরক্ষণ করা জরুরি এবং ‘ক্যাচ দ্য রেইন’ অভিযানের গতি বজায় রাখা উচিত। তিনি মানুষের কাছে নিজেদের এলাকায় পরিচালিত ইতিবাচক উদ্যোগগুলির তথ্য ভাগ করে নেওয়ারও আহ্বান জানান।
পুরো পর্বে প্রধানমন্ত্রী নিরাপত্তা, আত্মনির্ভরতা, সামাজিক সুরক্ষা, বৈজ্ঞানিক মনোভাব, খেলাধুলা, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি এবং পরিবেশ সংরক্ষণকে একসঙ্গে তুলে ধরে বলেন, দেশের অগ্রগতি কেবল বড় সরকারি প্রকল্পের ওপর নির্ভর করে না; নাগরিকদের দায়িত্বশীল অভ্যাসও এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।











