পুরী জগন্নাথ মন্দিরে যেতে চাইছেন? তাহলে আজকের দিনের জন্য বিশেষ বিষয়টি জেনে রাখা জরুরি। ৩০ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত প্রায় চার ঘণ্টা সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য মন্দিরের দরজা বন্ধ থাকবে। কোনও বিশেষ নিরাপত্তাজনিত কারণ নয়, বরং মন্দিরের বহু প্রাচীন ও গোপনীয় ‘বনকালাগি’ নীতি পালনের কারণেই এই সময়ে ভক্তদের প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে না।
কী এই ‘বনকালাগি’ রীতি?
পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের বিভিন্ন দৈনন্দিন আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে বনকালাগি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রীতি। এটি ‘শ্রীমুখ শৃঙ্গার’ নামেও পরিচিত। এই আচার চলাকালীন জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রা এবং সুদর্শনের বিগ্রহকে বিশেষ প্রাকৃতিক উপাদান থেকে তৈরি রঙ দিয়ে সাজানো হয়।এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত গোপনীয়ভাবে সম্পন্ন করা হয়। তাই রীতি চলাকালীন সাধারণ দর্শনার্থীদের মন্দিরে প্রবেশের অনুমতি থাকে না।
স্নানযাত্রার সঙ্গে কী সম্পর্ক?
জগন্নাথদেবের স্নানযাত্রার সঙ্গে বনকালাগি রীতির একটি ধর্মীয় যোগ রয়েছে বলে মন্দিরের প্রচলিত বিশ্বাস। স্নানযাত্রার সময় দেবতাদের বিপুল পরিমাণ জল দিয়ে স্নান করানো হয়। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, এই স্নানের পর জগন্নাথদেব ‘অসুস্থ’ হন এবং কিছু সময়ের জন্য দর্শন থেকেও দূরে থাকেন।স্নানের প্রভাব বিগ্রহের রঙের উপরও পড়ে বলে বিশ্বাস করা হয়। সেই কারণেই পরবর্তী সময়ে বিশেষ আচার মেনে দেবতাদের মুখমণ্ডল নতুন করে রঙ ও অলঙ্করণে সাজিয়ে তোলা হয়।
কোন কোন প্রাকৃতিক রং ব্যবহার করা হয়?
বনকালাগি রীতিতে ব্যবহৃত রঙের সঙ্গে বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপাদানের সম্পর্ক রয়েছে। প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী—
সাদা: শাঁখ থেকে তৈরি উপাদান ব্যবহার করে প্রস্তুত করা হয়।
হলুদ: হরিতাল থেকে তৈরি রং ব্যবহৃত হয়।
লাল: হিঙ্গুল থেকে লাল রং প্রস্তুত করা হয়।
কালো: বিশেষ কালো উপাদান ব্যবহার করা হয়।
এই রঙগুলির প্রতিটিরই আলাদা প্রতীকী তাৎপর্য রয়েছে। সাদা পবিত্রতা, হলুদ সমৃদ্ধি ও জ্ঞান, লাল জীবনীশক্তি এবং কালো অনন্তকাল ও পরম সত্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
কেন সাধারণ ভক্তদের প্রবেশ বন্ধ থাকে?
বনকালাগি কোনও সাধারণ সাজসজ্জার অনুষ্ঠান নয়। মন্দিরের প্রচলিত রীতি অনুযায়ী এটি অত্যন্ত গোপনীয়ভাবে সম্পন্ন হয়। নির্দিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত সেবায়েতরাই এই বিশেষ শৃঙ্গারের কাজে অংশ নেন।এই কারণে রীতি চলাকালীন গর্ভগৃহে সাধারণ দর্শনার্থীদের প্রবেশ বন্ধ রাখা হয়। পুরো শৃঙ্গার সম্পন্ন করতে প্রায় ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা সময় লাগতে পারে।
কারা করেন এই বিশেষ শৃঙ্গার?
বিগ্রহের মুখমণ্ডলের শৃঙ্গারের দায়িত্বে থাকেন বিশেষ সেবায়েতরা। তাঁদের ‘দত্ত মহাপাত্র’ বলা হয়। প্রচলিত মন্দির-রীতি অনুযায়ী, বনকালাগি পালনের সময় তাঁরাই গর্ভগৃহে প্রবেশ করে দেবতাদের শৃঙ্গার সম্পন্ন করেন।শৃঙ্গার শেষ হওয়ার পর নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে পরবর্তী আচার পালিত হয়। এরপর মন্দির শুদ্ধিকরণের প্রক্রিয়াও সম্পন্ন করা হয়।
আবার কখন দর্শন পাবেন ভক্তরা?
বনকালাগি রীতি ও পরবর্তী আচার শেষ হওয়ার পর মন্দিরে ফের দর্শনের সুযোগ তৈরি হয়। দেবতাদের নতুন সাজে, অর্থাৎ নবধৌতি বা নবযৌবন রূপে দর্শনের সঙ্গে এই পর্বের সমাপ্তি ঘটে বলে প্রচলিত বিশ্বাস।
৩০ সেপ্টেম্বর, বুধবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে সাধারণ ভক্তদের প্রবেশ বন্ধ থাকবে। ‘বনকালাগি’ বা ‘শ্রীমুখ শৃঙ্গার’ নামে বিশেষ একটি গোপনীয় আচার পালনের জন্য এই সময় দর্শন বন্ধ রাখা হবে। এই রীতিতে জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রা ও সুদর্শনের বিগ্রহের মুখমণ্ডলে বিশেষ প্রাকৃতিক রঙে শৃঙ্গার করা হয়।













