পূর্ব মেদিনীপুরের ‘গয়না বড়ি’ এবার পুরুলিয়ায়—গ্রামীণ নারীদের হাতে নতুন কুটির শিল্পের জোয়ার

পূর্ব মেদিনীপুরের ঐতিহ্যবাহী গয়না বড়ি এবার জনপ্রিয়তা পাচ্ছে পুরুলিয়ায়। সাঁওতালডির মহিলাদের উদ্যোগে এই কুটির শিল্প ছড়িয়ে পড়ছে গ্রামবাংলায়, বাড়ছে স্বনির্ভরতার সম্ভাবনা।

গ্রামীণ বাংলার শতাব্দীপ্রাচীন খাদ্যঐতিহ্য ‘গয়না বড়ি’ এবার পা রেখেছে পুরুলিয়ায়। পূর্ব মেদিনীপুরের ঘরোয়া রান্নাঘর থেকে শুরু হওয়া এই কুটির শিল্প এখন সাঁওতালডির উঠোনেও সমান জনপ্রিয়। নারীদের হাতের সূক্ষ্ম কারুকাজে তৈরি এই বড়ি দুই জেলার সাংস্কৃতিক বন্ধনের প্রতীক হয়ে উঠছে।

পূর্ব মেদিনীপুর থেকে পুরুলিয়া—ঐতিহ্যের যাত্রা

পূর্ব মেদিনীপুর জেলার তমলুক অঞ্চলে বহুদিন ধরেই গয়না বড়ি তৈরির রেওয়াজ রয়েছে। সম্প্রতি তমলুকের বাসিন্দা সুলেখা মাজী আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে এসে পুরুলিয়ার সাঁওতালডিতে এই বড়ি তৈরি করেন। তাঁর নিপুণ হাতের কাজ দেখে স্থানীয় মহিলারা মুগ্ধ হন। ধীরে ধীরে কৌতূহল থেকে আগ্রহ, আর আগ্রহ থেকেই শেখার ইচ্ছা—এভাবেই শুরু হয় গয়না বড়ির নতুন অধ্যায়।

সাঁওতালডির মহিলাদের উৎসাহ

সাঁওতালডির বাসিন্দা সরযু মল্লিক জানান, আগে এই বড়ির কথা শোনেননি। দিদির কাছ থেকে শেখার পর এখন গ্রামে বহু মহিলা আগ্রহ নিয়ে এই বড়ি তৈরি করছেন। তাঁদের মতে, এটি শুধু একটি খাদ্য নয়, বরং সৃজনশীলতার প্রকাশ। গ্রামের মহিলারা অবসর সময়ে একত্রিত হয়ে গয়না বড়ি তৈরি করছেন, যা সামাজিক বন্ধনও আরও মজবুত করছে।

কীভাবে তৈরি হয় গয়না বড়ি?

গয়না বড়ি মূলত বিউলির ডাল দিয়ে তৈরি হয়। প্রথমে ডাল ভিজিয়ে পেস্ট তৈরি করা হয়, তাতে সামান্য নুন মেশানো হয়। বড়ি দেওয়ার আগে থালায় পোস্ত দানা ছড়িয়ে নেওয়া হয়। এরপর হাতের নিখুঁত নকশায় শাঁখা, কলকা, ফুলসহ বিভিন্ন অলংকারের আদলে বড়ি তৈরি করা হয়। এই সূক্ষ্ম ও নান্দনিক নকশার কারণেই এর নাম ‘গয়না বড়ি’।

সংরক্ষণ ও পরিবেশনের রীতি

তৈরি হওয়ার পর বড়িগুলি রোদে শুকিয়ে সংরক্ষণ করা হয়। প্রয়োজনমতো ডুবো তেলে ভেজে গরম ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করা হয়। অনেক সময় ডাল বা বিশেষ তরকারির সঙ্গেও এটি পরিবেশিত হয়। বাইরে থেকে দেখতে যতটা দৃষ্টিনন্দন, খেতেও ততটাই মুচমুচে ও সুস্বাদু।

কুটির শিল্পে সম্ভাবনার দিগন্ত

স্থানীয়দের মতে, সঠিক প্রশিক্ষণ ও বাজারসংযোগ পেলে গয়না বড়ি পুরুলিয়ায় একটি লাভজনক কুটির শিল্পে পরিণত হতে পারে। নারীদের আর্থিক স্বনির্ভরতার পথও প্রশস্ত হতে পারে এই উদ্যোগের মাধ্যমে। ইতিমধ্যেই বহু মহিলা এই শিল্প শেখার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।

পূর্ব মেদিনীপুরের ঐতিহ্যবাহী গয়না বড়ি এখন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে পুরুলিয়া জেলায়। তমলুকের এক গৃহবধূর হাত ধরে সাঁওতালডিতে শুরু হয়েছে এই শিল্পের চর্চা। নকশাদার এই বড়ি শুধু স্বাদেই নয়, শৈল্পিক সৌন্দর্যেও নজর কেড়েছে স্থানীয় মহিলাদের।

Leave a comment