ভারতে ডিজিটাল ব্যাংকিং জালিয়াতি প্রতিরোধে নতুন খসড়া বিধি প্রস্তাব করেছে রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া (RBI)। প্রস্তাবিত নিয়ম অনুযায়ী ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হলে ডিজিটাল লেনদেন জালিয়াতির ক্ষেত্রে গ্রাহকের ক্ষতির সর্বোচ্চ ৮৫% পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হবে।
ডিজিটাল ব্যাংকিং ব্যবস্থার বিস্তারের ফলে ইউনিফাইড পেমেন্টস ইন্টারফেস (UPI), ইন্টারনেট ব্যাংকিং, মোবাইল অ্যাপ এবং কার্ডের মাধ্যমে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই লেনদেন সম্পন্ন হচ্ছে। তবে একই সঙ্গে ডিজিটাল জালিয়াতির ঘটনাও দ্রুত বাড়ছে। ফিশিং লিঙ্ক, ভুয়া অ্যাপ বা ওটিপি চুরির মাধ্যমে প্রতারকরা গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট থেকে অর্থ তুলে নেওয়ার ঘটনা ঘটছে, এবং অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকদের অর্থ ফেরত পেতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। এই প্রেক্ষাপটে গ্রাহক সুরক্ষা জোরদার করতে RBI নতুন খসড়া বিধি প্রস্তাব করেছে।
নিয়ম কার্যকর হওয়ার সময়সূচি ও প্রযোজ্যতা
প্রস্তাবিত নিয়ম ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হতে পারে। এর লক্ষ্য ডিজিটাল জালিয়াতির ক্ষেত্রে ব্যাংকের দায়িত্ব নির্ধারণ করা এবং গ্রাহক সুরক্ষা বাড়ানো। এই বিধি শুধুমাত্র বাণিজ্যিক ব্যাংকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। ক্ষুদ্র অর্থায়ন ব্যাংক বা পেমেন্ট ব্যাংক বর্তমানে এই বিধির আওতার বাইরে থাকবে। পূর্ববর্তী বিধিতে গ্রাহকের উপর দায়িত্ব বেশি ছিল, তবে নতুন প্রস্তাবে জালিয়াতির ক্ষেত্রে ব্যাংক ও RBI উভয়ের দায়িত্ব বাড়ানো হয়েছে।
ডিজিটাল জালিয়াতির অভিযোগ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া
নতুন বিধি অনুযায়ী ডিজিটাল জালিয়াতির অভিযোগ পাওয়ার পর ব্যাংককে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। পূর্ববর্তী নিয়মে অভিযোগ নিষ্পত্তিতে দীর্ঘ সময় লাগত, তবে নতুন প্রস্তাবে প্রক্রিয়াটি দ্রুততর করার কথা বলা হয়েছে। এই বিধি UPI পেমেন্ট, ইন্টারনেট ব্যাংকিং, মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে ট্রান্সফার, ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড লেনদেন এবং এটিএম লেনদেনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।
৫০,০০০ টাকার নিচের জালিয়াতির ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ কাঠামো
৫০,০০০ টাকার কম ক্ষতির ডিজিটাল জালিয়াতির ক্ষেত্রে ৮৫% পর্যন্ত ক্ষতিপূরণের একটি স্কিম প্রস্তাব করা হয়েছে। এই ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণের সর্বোচ্চ সীমা ২৫,০০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী RBI ক্ষতির সর্বোচ্চ ৬৫% পর্যন্ত বহন করবে এবং গ্রাহকের ব্যাংক ও বেনিফিশিয়ারি ব্যাংক যৌথভাবে বাকি ২০% বহন করবে। উদাহরণস্বরূপ, যদি কোনো গ্রাহকের ২০,০০০ টাকার জালিয়াতি ঘটে, তবে তিনি প্রায় ১৭,০০০ টাকা ফেরত পেতে পারেন।
অভিযোগ দায়েরের সময়সীমা ও পদ্ধতি
ক্ষতিপূরণ পাওয়ার জন্য গ্রাহককে জালিয়াতির ঘটনার পাঁচ দিনের মধ্যে অভিযোগ দায়ের করতে হবে। অভিযোগ ন্যাশনাল সাইবার ক্রাইম রিপোর্টিং পোর্টাল অথবা হেল্পলাইন নম্বর ১৯৩০-এ নিবন্ধন করা যেতে পারে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে অবহিত করাও বাধ্যতামূলক। যদি অভিযোগ দায়ের বিলম্বিত হয় বা গ্রাহকের ত্রুটি প্রমাণিত হয়, তাহলে ক্ষতিপূরণ পাওয়া কঠিন হতে পারে। এই বিধি ১ জুলাই ২০২৬ থেকে সংঘটিত লেনদেনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।
ডিজিটাল জালিয়াতি প্রতিরোধে নিয়ন্ত্রক উদ্যোগ
ডিজিটাল লেনদেন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাইবার জালিয়াতদের কৌশলও পরিবর্তিত হচ্ছে। পূর্ববর্তী বিধিতে গ্রাহকের দায়িত্ব বেশি ছিল এবং অনেক ক্ষেত্রে তারা জালিয়াতির ক্ষতি বহন করতে বাধ্য হতেন। নতুন প্রস্তাবিত বিধির আওতায় ব্যাংকগুলোকে উন্নত জালিয়াতি শনাক্তকরণ ব্যবস্থা স্থাপন করতে হবে, যাতে সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত করে আগাম সতর্কতা দেওয়া যায় এবং সম্ভাব্য ক্ষতি প্রতিরোধ করা যায়। RBI-এর তথ্য অনুযায়ী প্রায় ৬৫% জালিয়াতি ছোট অঙ্কের লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত, এবং সেই কারণে এই ধরনের ঘটনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ডিজিটাল লেনদেনে সতর্কতার প্রয়োজনীয়তা
প্রস্তাবিত নিয়ম গ্রাহকদের ডিজিটাল জালিয়াতি থেকে আর্থিক ক্ষতি কমাতে সহায়তা করার লক্ষ্য নিয়ে তৈরি করা হয়েছে। ক্ষতিপূরণ পেতে গ্রাহকদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অভিযোগ দায়ের করতে হবে এবং ব্যাংকের সঙ্গে সহযোগিতা করতে হবে। ডিজিটাল লেনদেনের সময় নিরাপত্তা বিধি মেনে চলাও গুরুত্বপূর্ণ, যেমন ওটিপি অন্য কারও সঙ্গে ভাগ না করা, সন্দেহজনক লিঙ্ক বা অ্যাপ ব্যবহার এড়িয়ে চলা এবং ব্যাংকের অফিসিয়াল অ্যাপ বা ওয়েবসাইট ব্যবহার করা।









