বর্ষাকাল ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে জলবাহিত ও সংক্রামক রোগের ঝুঁকিও বাড়তে শুরু করেছে। তার মধ্যেই নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে শিগেলা সংক্রমণ। সম্প্রতি কেরলে এই সংক্রমণে শিশুমৃত্যুর খবর সামনে আসতেই আতঙ্ক ছড়িয়েছে অভিভাবকদের মধ্যে। চিকিৎসকদের মতে, অত্যন্ত সংক্রামক এই ব্যাকটেরিয়া অল্প অসতর্কতাতেই এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তির শরীরে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই লক্ষণ, ঝুঁকি এবং প্রতিরোধের উপায় সম্পর্কে সচেতন থাকা অত্যন্ত জরুরি।
কী এই শিগেলা সংক্রমণ?
শিগেলা একটি ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ, যা অন্ত্রকে আক্রান্ত করে এবং ‘শিগেলোসিস’ নামে পরিচিত। এই ব্যাকটেরিয়া শরীরে প্রবেশ করলে পরিপাকতন্ত্রে প্রদাহ সৃষ্টি হয় এবং তীব্র ডায়রিয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়।দূষিত খাবার বা জল গ্রহণ, অপরিষ্কার হাত এবং আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসার মাধ্যমে এই সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে জনবহুল এলাকা, স্কুল, হোস্টেল বা শিশুদের ডে-কেয়ার সেন্টারে সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি থাকে।
কোন বয়সের শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে?
সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুরাই শিগেলা সংক্রমণের সবচেয়ে বড় শিকার হতে পারে।এই বয়সে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা পুরোপুরি গড়ে ওঠে না। ফলে সংক্রমণের বিরুদ্ধে শরীর কার্যকরভাবে লড়াই করতে পারে না। পাশাপাশি ডায়রিয়া ও বমির কারণে দ্রুত শরীরে জলশূন্যতা দেখা দেয়, যা অনেক ক্ষেত্রে প্রাণঘাতীও হতে পারে।
শিগেলা সংক্রমণের প্রধান লক্ষণ কী কী?
শিগেলা আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে সাধারণত কয়েকটি স্পষ্ট উপসর্গ দেখা যায়—
ঘন ঘন ডায়রিয়া
তীব্র পেটব্যথা ও পেট মোচড়ানো
জ্বর
বমি বমি ভাব
বমি
রক্তযুক্ত মল
দুর্বলতা ও অবসাদ
শরীরে জলশূন্যতা
লক্ষণগুলি হালকা থেকে গুরুতর— দুই ধরনেরই হতে পারে। শিশু এবং বয়স্কদের ক্ষেত্রে উপসর্গ দ্রুত জটিল আকার নিতে পারে।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাওয়া জরুরি?
চিকিৎসকদের মতে, কিছু লক্ষণকে কখনও অবহেলা করা উচিত নয়।
যদি দেখা যায়—
উচ্চ জ্বর কমছে না
মলে রক্ত দেখা যাচ্ছে
প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাচ্ছে
মুখ শুকিয়ে যাচ্ছে
অতিরিক্ত তৃষ্ণা পাচ্ছে
মাথা ঘোরা বা বিভ্রান্তি দেখা দিচ্ছে
বারবার বমি হচ্ছে
তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। কারণ এগুলি গুরুতর জলশূন্যতার ইঙ্গিত হতে পারে।
কীভাবে ছড়ায় এই বিপজ্জনক ব্যাকটেরিয়া?
শিগেলা মূলত ‘ফিকাল-ওরাল’ বা মল-মুখ পদ্ধতিতে ছড়ায়। অর্থাৎ আক্রান্ত ব্যক্তির মলের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জীবাণু খাবার, জল বা হাতের মাধ্যমে অন্যের শরীরে প্রবেশ করলেই সংক্রমণ ঘটতে পারে।
সংক্রমণের সাধারণ উৎসগুলির মধ্যে রয়েছে—
দূষিত পানীয় জল
অপরিষ্কার খাবার
হাত না ধুয়ে খাবার খাওয়া
শৌচাগার ব্যবহারের পর হাত পরিষ্কার না করা
আক্রান্ত ব্যক্তির সরাসরি সংস্পর্শে আসা
অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ
প্রতিরোধের উপায় কী?
শিগেলা প্রতিরোধে ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতাই সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ—
সাবান ও জল দিয়ে নিয়মিত হাত ধুতে হবে।
শৌচাগার ব্যবহারের পর অবশ্যই হাত পরিষ্কার করতে হবে।
খাবার খাওয়ার আগে হাত ধোয়া বাধ্যতামূলক।
ফল ও শাকসবজি ভালোভাবে ধুয়ে খেতে হবে।
শুধুমাত্র বিশুদ্ধ ও নিরাপদ জল পান করতে হবে।
খাবার স্বাস্থ্যসম্মতভাবে সংরক্ষণ করতে হবে।
শিশুদের ছোটবেলা থেকেই হাত ধোয়ার অভ্যাস শেখাতে হবে।
জলশূন্যতা কেন সবচেয়ে বড় বিপদ?
শিগেলা সংক্রমণে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর জটিলতার নাম ডিহাইড্রেশন বা জলশূন্যতা। ডায়রিয়া ও বমির কারণে শরীর থেকে দ্রুত জল ও প্রয়োজনীয় লবণ বেরিয়ে যায়।ফলে রক্তচাপ কমে যেতে পারে, দুর্বলতা বাড়তে পারে এবং গুরুতর ক্ষেত্রে কিডনি বা অন্যান্য অঙ্গের কার্যকারিতাও ব্যাহত হতে পারে। তাই রোগীর পর্যাপ্ত জল, ওআরএস এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কেরলে শিগেলা সংক্রমণ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এই ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ মূলত দূষিত খাবার, জল এবং অপরিষ্কার হাতের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। ডায়রিয়া, জ্বর, পেটে ব্যথা এবং রক্তযুক্ত মল এই রোগের প্রধান লক্ষণ। সময়মতো চিকিৎসা না হলে মারাত্মক জলশূন্যতা ও অন্যান্য জটিলতা দেখা দিতে পারে।













