ভারতীয় সংগীত শিল্পে বহু প্রতিভাবান শিল্পী এসেছেন ও গেছেন, তবে কিছু কণ্ঠ প্রজন্মের পর প্রজন্ম মানুষের মনে স্থায়ীভাবে জায়গা করে নেয়। সেই ধরনের একটি কণ্ঠ হলো শ্রেয়া ঘোষালের। তাঁর সুরেলা ও আবেগঘন গায়নের জন্য তিনি দীর্ঘদিন ধরে ভারতীয় সংগীত শিল্পের অন্যতম জনপ্রিয় ও সম্মানিত গায়িকা হিসেবে পরিচিত। হাজারো গানের মাধ্যমে তিনি শুধু বলিউডেই নয়, বিভিন্ন ভারতীয় ভাষার সংগীত জগতেও নিজস্ব পরিচিতি গড়ে তুলেছেন।
শ্রেয়া ঘোষাল আজ তাঁর জন্মদিন পালন করছেন। তাঁর জন্ম ১২ মার্চ ১৯৮৪ সালে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে। তবে তাঁর শৈশব কেটেছে রাজস্থানে। ছোটবেলা থেকেই সংগীতের প্রতি গভীর আগ্রহী শ্রেয়া খুব অল্প বয়সেই নিজের প্রতিভার মাধ্যমে মানুষের নজর কেড়েছিলেন।
শৈশব থেকেই সংগীতের সঙ্গে যুক্ত
শ্রেয়া ঘোষালের সংগীতজীবনের প্রথম শিক্ষক ছিলেন তাঁর মা। তিনিই ছোটবেলায় শ্রেয়াকে সংগীতের প্রাথমিক শিক্ষা দেন। জানা যায়, মাত্র চার বছর বয়স থেকেই শ্রেয়া তাঁর মায়ের সঙ্গে নিয়মিত রিয়াজ শুরু করেন। ছয় বছর বয়সে তিনি প্রথমবার মঞ্চে গান পরিবেশন করেন এবং তাঁর পরিবেশনা উপস্থিতদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তাঁর কণ্ঠের স্বর ও আত্মবিশ্বাস খুব অল্প বয়সেই ভবিষ্যতে সংগীতজগতে তাঁর সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়।
শৈশব থেকেই বিভিন্ন ছোট অনুষ্ঠানে গান গাইলেও জাতীয় স্তরে পরিচিতি পান একটি জনপ্রিয় সংগীত রিয়েলিটি শোর মাধ্যমে। তিনি টেলিভিশনের সংগীতভিত্তিক রিয়েলিটি শো “সা রে গা মা পা”-তে অংশগ্রহণ করেন এবং তাঁর পরিবেশনার মাধ্যমে দর্শক ও বিচারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এই অনুষ্ঠানটি তাঁর কর্মজীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং তাঁকে সারা দেশে পরিচিত করে তোলে। একই সঙ্গে বলিউডের চলচ্চিত্র নির্মাতাদের দৃষ্টিও তাঁর দিকে আকৃষ্ট হয়।

সঞ্জয় লীলা ভনসালির চলচ্চিত্রে প্রথম বড় সুযোগ
শ্রেয়া ঘোষালের কর্মজীবনে গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে যখন তিনি চলচ্চিত্র পরিচালক সঞ্জয় লীলা ভনসালির চলচ্চিত্র “দেবদাস”-এ গান গাওয়ার সুযোগ পান। এই সুযোগটি তিনি রিয়েলিটি শোর মাধ্যমেই পান বলে জানা যায়।
তৎকালীন সময়ে সঞ্জয় লীলা ভনসালির মা নিয়মিত “সা রে গা মা পা” অনুষ্ঠানটি দেখতেন। সেখানে শ্রেয়ার কণ্ঠ শুনে তিনি মুগ্ধ হন এবং পরবর্তীতে তাঁর ছেলেকে চলচ্চিত্রে শ্রেয়াকে গান গাওয়ার সুযোগ দেওয়ার পরামর্শ দেন। সেই পরামর্শ অনুযায়ী ভনসালি চলচ্চিত্র “দেবদাস”-এ শ্রেয়া ঘোষালকে গান গাওয়ার সুযোগ দেন। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১৬ বছর।
‘দেবদাস’ চলচ্চিত্রের গান ও স্বীকৃতি
চলচ্চিত্র “দেবদাস”-এ শ্রেয়া ঘোষাল পাঁচটি গান গেয়েছিলেন। এই গানগুলোর মাধ্যমে তিনি সারা দেশে পরিচিতি লাভ করেন। এই চলচ্চিত্রে তাঁর গানের জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন, যা শিল্পীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হয়। কম বয়সে এই পুরস্কার অর্জন একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য হিসেবে দেখা হয়।
কর্মজীবনের সময়ে শ্রেয়া ঘোষাল তিন হাজারেরও বেশি গান গেয়েছেন। তিনি হিন্দির পাশাপাশি বাংলা, তামিল, তেলুগু, কন্নড়, মালয়ালম এবং মারাঠি সহ একাধিক ভারতীয় ভাষায় গান রেকর্ড করেছেন। বিভিন্ন ধরনের গান—রোমান্টিক, শাস্ত্রীয়, সুফি বা আবেগঘন—গাওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর বহুমুখী দক্ষতা উল্লেখ করা হয়।
দীর্ঘ সংগীতজীবনে ধারাবাহিক উপস্থিতি
দুই দশকের বেশি দীর্ঘ কর্মজীবন সত্ত্বেও শ্রেয়া ঘোষালের জনপ্রিয়তা বজায় রয়েছে। নতুন প্রজন্মের সংগীতপ্রেমীদের মধ্যেও তাঁর গানের শ্রোতা রয়েছে। একটি সংগীত রিয়েলিটি শো থেকে শুরু হওয়া তাঁর যাত্রা পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক মঞ্চ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। তাঁর প্রতিভা, পরিশ্রম এবং সংগীতচর্চা তাঁকে ভারতীয় সংগীত জগতে একটি স্বীকৃত অবস্থানে পৌঁছে দিয়েছে।








