শহর হোক বা গ্রাম—সাপের কামড় মানেই আতঙ্ক। প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ মানুষ সাপের বিষে প্রাণ হারান। কিন্তু এবার সেই ভয়কে অনেকটাই কমাতে পারে বিজ্ঞানীদের নতুন গবেষণা। শতাব্দী প্রাচীন অ্যান্টিভেনম প্রযুক্তিকে আধুনিক বিজ্ঞান দিয়ে নতুন রূপ দেওয়ার ফলে সাপের কামড়ে মৃত্যুর ঝুঁকি নাটকীয়ভাবে কমতে পারে বলেই আশাবাদী বিশেষজ্ঞরা।
কেন এত ভয়াবহ সাপের কামড়?
ব্ল্যাক মাম্বা, কোবরা বা ক্রেইটের মতো বিষধর সাপের নাম শুনলেই শিউরে ওঠে মানুষ। অনেক ক্ষেত্রে কামড়ের কয়েক মিনিটের মধ্যেই মৃত্যু হয়। আতঙ্কে ভুল চিকিৎসা বা সময়মতো হাসপাতালে না পৌঁছনোর কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
বিশ্বজুড়ে সাপের কামড়ের ভয়াবহ চিত্র
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ৫০ লক্ষ মানুষ সাপের কামড়ে আক্রান্ত হন। এর মধ্যে প্রায় ১ লক্ষ ২৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হয় এবং লক্ষ লক্ষ মানুষ স্থায়ীভাবে অক্ষম হয়ে পড়েন। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন গ্রামাঞ্চলের কৃষক, শ্রমিক ও শিশুরা।
বর্তমান অ্যান্টিভেনম কেন ঝুঁকিপূর্ণ?
বর্তমানে ব্যবহৃত অ্যান্টিভেনম প্রযুক্তির বয়স প্রায় ১০০ বছর। এই পদ্ধতিতে ঘোড়া বা অন্য প্রাণীর শরীরে সাপের বিষ ঢুকিয়ে অ্যান্টিবডি তৈরি করা হয়, যা পরে মানুষের শরীরে প্রয়োগ করা হয়।কিন্তু এই প্রাণীজ প্রোটিন থেকেই অনেক সময় মারাত্মক অ্যালার্জি, সিরাম অসুখ বা প্রাণঘাতী অ্যানাফিল্যাক্সিস দেখা দেয়। তাই অ্যান্টিভেনম দেওয়া যায় মূলত বড় হাসপাতালেই।
বিজ্ঞানীরা নতুন কী আবিষ্কার করলেন?
গবেষণার দিশা বদলে এখন বিজ্ঞানীরা ল্যাবে তৈরি মানুষের মতো অ্যান্টিবডি (Human-like antibodies) নিয়ে কাজ করছেন। এগুলি সরাসরি সাপের বিষের নির্দিষ্ট টক্সিনকে টার্গেট করে এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি অনেক কম।
মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডিতে আশার আলো
আমেরিকার স্ক্রিপস রিসার্চ ইনস্টিটিউট-সহ একাধিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এমন মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি তৈরি করেছে, যা মাম্বা, কোবরা ও ক্রেইটের মতো সাপের বিষ নিষ্ক্রিয় করতে সক্ষম।
মানবদেহ থেকেই মিলল অ্যান্টিভেনমের সূত্র
সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হল—বিজ্ঞানীরা এমন এক ব্যক্তির অ্যান্টিবডি ব্যবহার করেছেন, যিনি বছরের পর বছর সাপের বিষের সংস্পর্শে ছিলেন। তাঁর শরীরের তৈরি অ্যান্টিবডি একাধিক প্রজাতির সাপের বিষের বিরুদ্ধেই কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।
পরীক্ষায় মিলেছে দারুণ ফল
এই মানব অ্যান্টিবডিগুলিকে সিন্থেটিক ওষুধের সঙ্গে মিলিয়ে একটি বিশেষ ‘ককটেল’ তৈরি করা হয়েছে। ইঁদুরের উপর পরীক্ষায় দেখা গিয়েছে, এটি একাধিক মারাত্মক সাপের বিষের বিরুদ্ধে প্রায় সম্পূর্ণ সুরক্ষা দিতে সক্ষম।
সাপের কামড়ে মৃত্যুর হার কমাতে যুগান্তকারী সাফল্যের দাবি বিজ্ঞানীদের। প্রায় ১০০ বছর ধরে ব্যবহৃত অ্যান্টিভেনম তৈরির পদ্ধতিতে বদল এনে এমন এক নতুন কৌশল সামনে এসেছে, যা আরও নিরাপদ, দ্রুত কার্যকর এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন হতে পারে। গবেষকদের দাবি, এই আবিষ্কার সাপের কামড়কে মারাত্মক বিপদ থেকে ‘চিকিৎসাযোগ্য জরুরি রোগে’ রূপান্তর করতে পারে।













