উপাচার্যের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার মামলা: “চিরকাল তাড়িয়ে বেড়াবে”—বেঞ্চের নজিরবিহীন রায় সুপ্রিম কোর্টে

উপাচার্যের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার মামলা: “চিরকাল তাড়িয়ে বেড়াবে”—বেঞ্চের নজিরবিহীন রায় সুপ্রিম কোর্টে

নয়াদিল্লি, ১৪ সেপ্টেম্বর: বাংলার সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত নামজাদা আইন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার মামলায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে এলেন দেশের শীর্ষ আদালত। মামলাটি খারিজ হলেও বিচারপতি পঙ্কজ মিঠাল ও প্রসন্ন বি ভারালের ডিভিশন বেঞ্চ স্পষ্ট জানালেন—এই অভিযোগ কোনওভাবেই ভোলা যাবে না। আদালতের পর্যবেক্ষণ, “অন্যায়কারীকে ক্ষমা করা যেতে পারে, কিন্তু অন্যায়কে ভোলা যায় না। এবার থেকে তাঁর রেজিউমে বা অভিজ্ঞতার বিবরণীতে এই যৌন হেনস্থার অভিযোগ উল্লেখ থাকবেই।” আদালতের এই নির্দেশ এক নতুন নজির তৈরি করল।

মামলার পটভূমি

২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে পশ্চিমবঙ্গের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব জুডিশিয়াল সায়েন্সেস (NUJS)-এর উপাচার্যের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার অভিযোগ আনেন বিশ্ববিদ্যালয়েরই এক ফ্যাকাল্টি সদস্যা। অভিযোগে বলা হয়, উপাচার্য তাঁকে নিজের কক্ষে ডেকে অশালীন প্রস্তাব দেন। অভিযোগ মানা না হওয়ায় তাঁকে পদ থেকে সরানো হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

এলসিসি থেকে হাইকোর্ট

অভিযোগটি প্রথমে জমা পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকাল কমপ্লেন কমিটি (LCC)-তে। কিন্তু কমিটি অভিযোগ খারিজ করে জানায়, ঘটনাটি অভিযোগ জানানোর নির্দিষ্ট সময়সীমার (৩–৬ মাস) বাইরে হওয়ায় তা গ্রহণযোগ্য নয়। এরপরেই অভিযোগকারী কলকাতা হাইকোর্টে যান। সিঙ্গল বেঞ্চে মামলার শুনানি শুরু হলেও পরে ডিভিশন বেঞ্চ জানায়, তাঁর পদ থেকে অপসারণ ছিল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, যৌন হেনস্থার অভিযোগের সঙ্গে এর কোনও যোগ নেই।

সুপ্রিম কোর্টে আবেদন

হাইকোর্টের রায়কে চ্যালেঞ্জ করে অভিযোগকারী সুপ্রিম কোর্টে যান। তবে এখানেও তিনি ব্যাকফুটে পড়েন। মামলা খারিজ করে দেয় শীর্ষ আদালত। কিন্তু এখানেই তৈরি হয় নজির। আদালত উপাচার্যকে ক্ষমা করলেও, তাঁর জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে এই অভিযোগের ছায়া থাকার নির্দেশ দেয়।

আদালতের পর্যবেক্ষণ: কঠোর বার্তা

বিচারপতি পঙ্কজ মিঠাল ও প্রসন্ন বি ভারালের বেঞ্চ বলেন, “উপাচার্যকে ক্ষমা করা গেলেও, এই অভিযোগ যেন তাঁকে চিরকাল তাড়িয়ে বেড়ায়, সেই ব্যবস্থাই করতে হবে। তাঁর রেজিউমে বা পেশাগত বিবরণীতে এই ঘটনার উল্লেখ থাকতেই হবে।” আদালতের এই নির্দেশ কার্যত এক নতুন দৃষ্টান্ত, যা ভবিষ্যতে যৌন হেনস্থার মামলায় রেফারেন্স হয়ে থাকবে।

শিক্ষাক্ষেত্রে প্রভাব

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রায় কেবল উপাচার্যের জন্য নয়, বরং দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনিক স্তরে বার্তা পাঠাচ্ছে। অভিযোগ সময়সীমার কারণে খারিজ হলেও, তা ভোলা যাবে না। ফলে ভবিষ্যতে পদাধিকারীরা যে কোনও অসঙ্গত আচরণ করার আগে একাধিকবার ভাবতে বাধ্য হবেন।

বাংলার নামজাদা আইন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার অভিযোগে মামলা খারিজ হলেও সুপ্রিম কোর্টে তীব্র ভর্ৎসনার মুখে পড়লেন তিনি। আদালতের পর্যবেক্ষণ, উপাচার্যকে ক্ষমা করা গেলেও এই অভিযোগ যেন চিরকাল তাঁর রেজিউমে থেকে যায়। বেনজির এই রায় এক নজির তৈরি করল।

Leave a comment