নিঠারি কাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত মামলাগুলিতে সুপ্রিম কোর্ট থেকে দোষমুক্ত হওয়ার পর হরিদ্বারে বসবাস করছিলেন সুরেন্দ্র কোলি। তাঁর মৃত্যুর পর শনিবার হরিদ্বার জেলা হাসপাতালে ময়নাতদন্ত করা হবে। পুলিশ জানিয়েছে, শুক্রবার হরিদ্বারের ভূপতওয়ালা এলাকায় তাঁর চায়ের দোকানের ভিতর ফাঁসিতে ঝুলন্ত অবস্থায় তাঁর দেহ উদ্ধার হয়। পুলিশ দেহটি উদ্ধার করে হরিদ্বার জেলা হাসপাতালের মর্গে পাঠিয়েছিল। ময়নাতদন্তের পর পরিবারের হাতে দেহ তুলে দেওয়া হবে।
পুলিশ বর্তমানে সুরেন্দ্র কোলির মৃত্যুর পরিস্থিতি খতিয়ে দেখছে। প্রাথমিক তদন্তে ঘটনাটি আত্মহত্যা বলে মনে হলেও মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং ঘটনার ধারাবাহিকতা ময়নাতদন্তের রিপোর্ট ও পুলিশি তদন্তের পরই নিশ্চিত করা যাবে।
সুরেন্দ্র কোলির মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর তাঁর পরিবারের সদস্যরা হরিদ্বারে পৌঁছতে শুরু করেন। তাঁর ভাই হরিশও হরিদ্বারে পৌঁছে গেছেন। পরিবারের উপস্থিতিতে ময়নাতদন্তের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। এরপর দেহ শেষকৃত্যের জন্য নিয়ে যাওয়া হবে। পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, খড়খড়ি শ্মশানঘাটে সুরেন্দ্র কোলির শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে।
নিঠারি মামলায় দীর্ঘ সময় জেলে থাকার পর কিছুদিন আগে সুরেন্দ্র কোলি স্বাভাবিক জীবন শুরু করার চেষ্টা করেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর পরিবারের কাছে বর্তমান ঘটনাটি আকস্মিক।
সুরেন্দ্র কোলি মূলত উত্তরাখণ্ডের আলমোড়া জেলার স্যালদে এলাকার মঙ্গরুখাল গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। চার ভাইয়ের মধ্যে তিনি দ্বিতীয় ছিলেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাঁর বড় ভাই চন্দন রাম কোলি এবং ছোট ভাই হরিশ কোলি দিল্লিতে থাকেন। সবচেয়ে ছোট ভাই আনন্দ রাম কোলি তাঁর পরিবারের সঙ্গে মাসি এলাকায় থাকেন।
পরিবারের তথ্য সামনে আসার পর তাঁর ভাইরা হরিদ্বারের উদ্দেশে রওনা হন। হরিশ হরিদ্বারে পৌঁছনোর পর পরিবারের সদস্যরা শেষকৃত্যের প্রক্রিয়ায় অংশ নেবেন।
পুলিশের মতে, সুরেন্দ্র কোলি কিছুদিন ধরে হরিদ্বারে থাকছিলেন। তিনি ভূপতওয়ালা রোডের সপ্ত সরোবর এলাকায় একটি ছোট চায়ের দোকান শুরু করেছিলেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি সেখানে প্রায় এক মাস ধরে ছিলেন। অন্য একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি কয়েক দিন আগেই দোকানটি শুরু করেছিলেন।
হরিদ্বারে তিনি ‘সদা রাম’ নামে থাকছিলেন। আশপাশের কয়েকজন মানুষ তাঁর পুরনো পরিচয় সম্পর্কে জানতেন না।
শুক্রবার সকালে তাঁর দোকান না খোলায় আশপাশের মানুষের সন্দেহ হয়। তাঁর পরিচিত ধর্মেন্দ্র কৌশিক দোকানে গিয়ে পরিস্থিতি দেখেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, সকাল সাড়ে ১০টার দিকে দোকানের শাটার খোলা হলে ভিতরে সুরেন্দ্র কোলির দেহ ফাঁসিতে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। এরপর পুলিশকে খবর দেওয়া হয়।
পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেহ উদ্ধার করে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ শুরু করে। ঘটনাস্থল থেকে কোনও সুইসাইড নোট পাওয়া গেছে বলে তথ্য সামনে আসেনি।
মৃত্যুর আগে সুরেন্দ্র কোলির পরিস্থিতি কেমন ছিল, পুলিশ সেটিও তদন্ত করছে। তাঁর এক পরিচিত ব্যক্তি সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, কোলি কিছুদিন ধরে সমস্যায় ছিলেন। একটি প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মৃত্যুর এক দিন আগে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ফোনে তাঁর তর্ক হয়েছিল। তবে সেই কথোপকথন কোন বিষয় নিয়ে হয়েছিল, তা স্পষ্ট নয়।
পুলিশ এই ধরনের তথ্যও খতিয়ে দেখছে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে।
মৃত্যুর পরিস্থিতি নিয়ে পুলিশ এখনও কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়নি। প্রাথমিকভাবে আত্মহত্যার আশঙ্কা করা হলেও মৃত্যুর কারণের সরকারি নিশ্চিতকরণ ময়নাতদন্ত ও তদন্তের পরই সম্ভব। ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া প্রমাণ, আশপাশের পরিস্থিতি এবং মৃত ব্যক্তির সংস্পর্শে থাকা ব্যক্তিদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য তদন্তের অংশ করা হচ্ছে। এই তদন্তে ময়নাতদন্তের রিপোর্টও গুরুত্বপূর্ণ হবে।
সুরেন্দ্র কোলির নাম দেশের আলোচিত নিঠারি কাণ্ডের পর দীর্ঘ সময় ধরে সংবাদে ছিল। ২০০৬ সালের ডিসেম্বরে নয়ডার নিঠারি এলাকায় একাধিক শিশু ও মহিলার নিখোঁজ হওয়া এবং মানবদেহের অবশেষ পাওয়ার পর ঘটনাটি জাতীয় স্তরে আলোচনায় আসে। এই মামলায় কোলিকে গ্রেফতার করা হয়েছিল এবং তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা চলেছিল।
পরবর্তীতে আদালতে মামলাগুলির দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া চলে। শেষ পর্যন্ত নিঠারি কাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত মামলাগুলিতে তিনি দোষমুক্ত হন।
সুপ্রিম কোর্ট থেকে দোষমুক্ত হওয়ার পর জেল থেকে বেরিয়ে সুরেন্দ্র কোলি নতুন জীবন শুরু করার চেষ্টা করেছিলেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে জেল থেকে বেরিয়ে আসেন এবং পরে হরিদ্বারে যান। সেখানে পরিচয় পরিবর্তন করে ‘সদা রাম’ নামে থাকতে শুরু করেন এবং চায়ের দোকান চালাতে থাকেন। তাঁর পরিচিতদের মতে, তিনি কাজেরও চেষ্টা করছিলেন।
প্রতিবেদনগুলিতে আরও বলা হয়েছে, সুরেন্দ্র কোলি প্রায় ২১ বছর জেলে ছিলেন। এত দীর্ঘ সময়ের পর জেল থেকে বেরিয়ে স্বাভাবিক জীবন শুরু করা তাঁর সামনে একটি চ্যালেঞ্জ ছিল। হরিদ্বারে ছোট একটি দোকানের মাধ্যমে তিনি জীবন এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। দোকান শুরু করার কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর মৃত্যুর খবর সামনে আসে।
আলমোড়ায় তাঁর পৈতৃক বাড়ির বর্তমান অবস্থার কথাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। মঙ্গরুখাল গ্রামে তাঁর পুরনো বাড়ি এখন ধ্বংসাবশেষে পরিণত হয়েছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। জেল থেকে বেরিয়ে তিনি একবার নিজের গ্রামেও গিয়েছিলেন।
পরিবারের সদস্যদের মতে, দীর্ঘ সময় জেলে থাকা এবং পরবর্তী পরিস্থিতির কারণে পরিবারের জীবনও বদলে গিয়েছিল।
শনিবার হরিদ্বার জেলা হাসপাতালে ময়নাতদন্তের পর মৃত্যুর সঙ্গে যুক্ত বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার আশা রয়েছে। ময়নাতদন্তের সময় চিকিৎসাগত পরীক্ষার মাধ্যমে মৃত্যুর কারণ এবং সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হবে। এরপর পুলিশ তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যাবে।
ময়নাতদন্তের রিপোর্টে কোনও অস্বাভাবিক পরিস্থিতির ইঙ্গিত পাওয়া গেলে পুলিশ সেই দিকেই তদন্ত এগিয়ে নিতে পারে।
পরিবার হরিদ্বারে পৌঁছনোর পর শেষকৃত্যের প্রক্রিয়াও সম্পন্ন করা হবে। পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, খড়খড়ি শ্মশানঘাটে সুরেন্দ্র কোলির শেষকৃত্য হবে। পরিবারের সদস্য ও পরিচিতরা সেখানে উপস্থিত থাকবেন। এরপর ধর্মীয় রীতিনীতি অনুযায়ী শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হবে।
এই মুহূর্তে পুলিশের তদন্তের কেন্দ্রে রয়েছে মৃত্যুর আগে ঘটে যাওয়া ঘটনা, ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি এবং সুরেন্দ্র কোলির সংস্পর্শে থাকা ব্যক্তিরা। কোনও সুইসাইড নোট না পাওয়ার তথ্যও সামনে এসেছে। ফলে পরিস্থিতিগত প্রমাণ এবং ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পুলিশের তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মৃত্যুর এক দিন আগে পরিবারের সঙ্গে কথিত কথোপকথন এবং তাঁর মানসিক পরিস্থিতি নিয়ে ওঠা দাবিগুলিও পুলিশ স্বাধীনভাবে তদন্ত করতে পারে।
সুরেন্দ্র কোলির মৃত্যুর পর নিঠারি মামলার সঙ্গে যুক্ত তাঁর পুরনো আইনি ইতিহাস নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। তবে বর্তমান ঘটনাকে তাঁর পুরনো মামলার ভিত্তিতে কোনও সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত করা যাবে না। তিনি নিঠারি-সংক্রান্ত মামলাগুলিতে দোষমুক্ত হয়েছিলেন। হরিদ্বারে তাঁর মৃত্যু একটি পৃথক পুলিশি তদন্তের বিষয় এবং এর কারণ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তদন্ত শেষ হওয়ার পরই সামনে আসবে।
বর্তমানে পরিবারের সদস্যরা ময়নাতদন্ত ও শেষকৃত্যের প্রক্রিয়ার জন্য হরিদ্বারে রয়েছেন। পুলিশ দেহটি সংরক্ষিত রেখেছে এবং পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হচ্ছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পাওয়ার পর পুলিশি তদন্তের দিক আরও স্পষ্ট হবে এবং সুরেন্দ্র কোলির মৃত্যু কোন পরিস্থিতিতে হয়েছে, তা নির্ধারণ করা সম্ভব হবে। এরপরই ঘটনাটির সঙ্গে যুক্ত বাকি প্রশ্নগুলির সরকারি উত্তর সামনে আসবে।











