আজ তাঁকে দর্শকরা চেনেন বলিউডের জনপ্রিয় অভিনেত্রী হিসেবে। ‘গোলমাল’-এর মতো ছবিতে অভিনয় করে তৈরি হয়েছে আলাদা পরিচিতি। কিন্তু তাঁর জীবনের একটা সময় ছিল ভয়াবহ আর্থিক সংকটে ভরা। পরিবারের একটি ব্যবসায় বিপুল দেনা জমে যাওয়ার পর সামনে ছিল একটাই লক্ষ্য—ঋণ শোধ করা এবং সন্তানদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করা। সেই সময়েই অর্থের প্রয়োজনে এমন কিছু ছবিতে অভিনয় করেছিলেন সুস্মিতা মুখোপাধ্যায়, যেগুলিকে তিনি নিজেই ‘খারাপ’ বা ‘সি-গ্রেড’ কাজ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
কে এই অভিনেত্রী?
তিনি হলেন বাঙালি অভিনেত্রী সুস্মিতা মুখোপাধ্যায়। দীর্ঘ অভিনয়জীবনে হিন্দি সিনেমা ও টেলিভিশনের একাধিক কাজে তাঁকে দেখা গিয়েছে। জনপ্রিয় ‘গোলমাল’ ছবির সূত্রে দর্শকদের কাছে তাঁর পরিচিতিও তৈরি হয়।তবে অভিনয়ের পাশাপাশি তাঁর ব্যক্তিগত জীবনেও এসেছে কঠিন সময়। সম্প্রতি নিজের সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে সেই সময়ের কথা বলতে গিয়ে তিনি জানিয়েছেন, কীভাবে আর্থিক দায় সামলাতে গিয়ে তাঁকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল।
কীভাবে তৈরি হয়েছিল ১ কোটি টাকার দেনা?
অভিনেত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, ২০০২ সালে তিনি ও তাঁর স্বামী ‘প্রয়াস প্রোডাকশনস’ নামে একটি মিডিয়া সংস্থা পরিচালনা করতেন। ব্যবসায়িক পরিস্থিতি প্রতিকূল হয়ে পড়ায় সংস্থাটি আর্থিকভাবে ভেঙে পড়ে।
তাঁর দাবি, সেই সময় তাঁদের প্রায় ১ কোটি টাকার দেনা হয়ে গিয়েছিল। প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারাও ব্যবসায়িক সমস্যার অন্যতম কারণ ছিল বলে তিনি জানিয়েছেন।
ঋণদাতারা আসতেন বাড়ির দরজায়
সুস্মিতা জানিয়েছেন, সেই সময় পরিস্থিতি এতটাই কঠিন হয়ে উঠেছিল যে ঋণ আদায়কারীরা নিয়মিত তাঁদের বাড়িতে আসতেন। একই সময়ে তাঁর সন্তানরাও ছোট ছিল।ফলে সংসার চালানো, দেনা শোধ করা এবং সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার জন্য তাঁকে দ্রুত উপার্জনের দিকে মন দিতে হয়। তাঁর কথায়, তখন মূল লক্ষ্য ছিল যত দ্রুত সম্ভব ওই বিপুল ঋণ পরিশোধ করা।
কেন ‘সি-গ্রেড’ ছবিতে অভিনয় করেছিলেন?
এই প্রসঙ্গেই অভিনেত্রী নিজের জীবনের অন্যতম কঠিন সিদ্ধান্তের কথা প্রকাশ্যে আনেন।তিনি জানান, সেই সময় অর্থের প্রয়োজনেই এমন কিছু ছবিতে কাজ করেছিলেন, যেগুলির বিষয়বস্তু বা মান নিয়ে তিনি নিজে সন্তুষ্ট ছিলেন না। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কাজগুলি তাঁর ব্যক্তিগত পছন্দের ছিল না, কিন্তু পরিবারের আর্থিক দায়িত্বের কারণে সেগুলি গ্রহণ করতে হয়েছিল।
‘নিজেকে বিক্রি করে দিয়েছিলাম’—এই ধরনের কঠিন শব্দও নিজের পরিস্থিতি বোঝাতে ব্যবহার করেছেন অভিনেত্রী। তবে একইসঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেছেন, সেই সিদ্ধান্তের পিছনে ছিল তীব্র আর্থিক চাপ ও পারিবারিক দায়বদ্ধতা।
৩-৪ বছরেই শোধ করেছিলেন ঋণ
সুস্মিতার বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি ও তাঁর স্বামী কঠোর পরিশ্রম করে প্রায় ৩ থেকে ৪ বছরের মধ্যে সেই ঋণ শোধ করতে সক্ষম হন।এরপরও তাঁর পরিবারের আর্থিক দায়িত্ব শেষ হয়নি। সন্তানদের উচ্চশিক্ষার জন্যও তাঁকে বড় অঙ্কের অর্থের ব্যবস্থা করতে হয়েছিল।
সন্তানদের বিদেশে পড়ানোর জন্যও লড়াই
অভিনেত্রী জানিয়েছেন, তাঁর দুই সন্তান উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে গিয়েছিলেন। একজন অস্ট্রেলিয়ায় এবং অন্যজন নিউজিল্যান্ডে পড়াশোনা করেন বলে তিনি জানান।সন্তানদের শিক্ষার খরচও ছিল যথেষ্ট বেশি। সেই কারণেও তাঁকে দীর্ঘদিন কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে বলে জানিয়েছেন সুস্মিতা।তাঁর মতে, একজন অভিভাবক হিসেবে সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য অনেক সময় এমন সিদ্ধান্তও নিতে হয়, যা ব্যক্তিগতভাবে খুব একটা পছন্দের নয়।
সেই কাজ নিয়ে কি আজও আফসোস করেন?
এখানেই তাঁর বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক।সুস্মিতা জানিয়েছেন, ওই সময়ের কিছু কাজ নিয়ে তিনি গর্বিত নন। তবে একইসঙ্গে তিনি বলেন, সেই পরিস্থিতিতে সেগুলিই তাঁর কাছে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত ছিল।অর্থাৎ অতীতের কাজগুলিকে তিনি নিজের শিল্পীসত্তার সেরা অধ্যায় হিসেবে দেখেন না, কিন্তু পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে নেওয়া সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখেন।
এখন আর মন না চাইলে কাজ করেন না
অভিনেত্রীর দাবি, বর্তমানে পরিস্থিতি অনেকটাই বদলেছে। এখন তিনি এমন কোনও কাজ করতে চান না, যা তাঁর নিজের পছন্দ বা মূল্যবোধের সঙ্গে যায় না।
তিনি জানিয়েছেন, বর্তমানে এমন প্রকল্পই বেছে নেন যা তাঁকে শিল্পী হিসেবে সন্তুষ্ট করে। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি উপলব্ধি করেছেন, কেন এবং কী উদ্দেশ্যে অর্থ উপার্জন করছেন—সেটি নিজের কাছে পরিষ্কার থাকা জরুরি।
একসময় প্রায় ১ কোটি টাকার দেনায় ডুবে গিয়েছিল অভিনেত্রী সুস্মিতা মুখোপাধ্যায়ের পরিবার। সংসারের আর্থিক চাপ ও সন্তানদের পড়াশোনার খরচ সামলাতে তাঁকে একাধিক ধরনের কাজ করতে হয়েছিল। নিজের একটি সাম্প্রতিক বক্তব্যে অভিনেত্রী জানিয়েছেন, সেই কঠিন সময়ে কিছু নিম্নমানের ছবিতেও অভিনয় করেছিলেন তিনি। বর্তমানে সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে খুব একটা গর্ববোধ না করলেও, পরিস্থিতির কারণে তখন সেটিই প্রয়োজনীয় মনে হয়েছিল তাঁর।








