সারাদিন শরীরটা যেন কেমন দুর্বল লাগে? খাওয়ার ইচ্ছা কমে গিয়েছে, প্রস্রাবের রংও আগের তুলনায় গাঢ়। আবার কোনও কোনও ক্ষেত্রে চোখ-ত্বক হলুদ হওয়া বা সারা শরীরে অস্বস্তিকর চুলকানিও দেখা দিতে পারে। এসব উপসর্গকে সাধারণ সমস্যা ভেবে এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়। কারণ কিছু ক্ষেত্রে এগুলি হেপাটাইটিসের লক্ষণ হতে পারে। বিশেষ করে হেপাটাইটিস বি ও সি দীর্ঘদিন উপসর্গহীন থাকায় নিয়মিত ঝুঁকি অনুযায়ী পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ।
হেপাটাইটিস আসলে কী?
হেপাটাইটিস বলতে মূলত যকৃত বা লিভারে প্রদাহকে বোঝায়। ভাইরাসঘটিত হেপাটাইটিসের মধ্যে এ, বি, সি, ডি এবং ই—এই পাঁচ ধরনের সংক্রমণ সবচেয়ে পরিচিত।তবে সব হেপাটাইটিসের কারণ ভাইরাস নয়। অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণ, কিছু ওষুধ, অটোইমিউন রোগ এবং নির্দিষ্ট বিষাক্ত পদার্থের কারণেও লিভারে প্রদাহ হতে পারে।
কেন হেপাটাইটিসকে ‘নীরব’ বলা হয়?
হেপাটাইটিসের অন্যতম সমস্যা হল, আক্রান্ত হওয়ার পর অনেকেরই দীর্ঘদিন কোনও স্পষ্ট উপসর্গ দেখা যায় না। বিশেষ করে দীর্ঘস্থায়ী হেপাটাইটিস বি বা সি অনেক সময় নীরবে লিভারের ক্ষতি করতে পারে।ফলে শুধু শরীরে কোনও লক্ষণ নেই বলেই সংক্রমণ নেই—এমনটা ধরে নেওয়া উচিত নয়। ঝুঁকি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রক্ত পরীক্ষা করা জরুরি।
সারাক্ষণ ক্লান্ত লাগছে?
পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রামের পরেও যদি দীর্ঘদিন অস্বাভাবিক ক্লান্তি থাকে, তার বিভিন্ন কারণ হতে পারে। হেপাটাইটিসের ক্ষেত্রেও এমন ক্লান্তি দেখা দিতে পারে।তবে শুধুমাত্র ক্লান্তিকে হেপাটাইটিসের নিশ্চিত লক্ষণ বলা যায় না। এর সঙ্গে অন্য উপসর্গ রয়েছে কি না এবং পরীক্ষায় কী ফল পাওয়া যাচ্ছে, সেটিই আসল বিষয়।
হঠাৎ খাওয়ার ইচ্ছে কমে গিয়েছে?
হেপাটাইটিসের ক্ষেত্রে ক্ষুধামান্দ্য বা খাবারের প্রতি অনীহা দেখা দিতে পারে। এর সঙ্গে বমি বমি ভাব, বমি কিংবা দুর্বলতা থাকলে বিষয়টি আরও গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।দীর্ঘদিন এমন সমস্যা চললে কারণ জানতে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
প্রস্রাব গাঢ়, মল ফ্যাকাশে?
হেপাটাইটিসের অন্যতম লক্ষণ হতে পারে প্রস্রাবের রং অস্বাভাবিকভাবে গাঢ় হয়ে যাওয়া। একইসঙ্গে মল স্বাভাবিক বাদামি রঙের বদলে ফ্যাকাশে, ধূসর বা মাটির মতো রঙের হতে পারে।লিভারের সমস্যা বা পিত্তপ্রবাহে বাধার কারণে শরীরে বিলিরুবিনের মাত্রা বেড়ে গেলে এমন পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। তবে এই লক্ষণগুলির অন্য কারণও থাকতে পারে।
চোখ-ত্বক হলুদ হওয়া কি বড় সতর্কবার্তা?
জন্ডিস অর্থাৎ চোখের সাদা অংশ ও ত্বক হলুদ হয়ে যাওয়া হেপাটাইটিসের পরিচিত লক্ষণ। এর সঙ্গে গাঢ় প্রস্রাব থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।জন্ডিস নিজে কোনও নির্দিষ্ট রোগের নাম নয়। লিভারের সমস্যা ছাড়াও বিভিন্ন কারণে এটি হতে পারে। তাই পরীক্ষা ছাড়া নিজে থেকে হেপাটাইটিস ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
ত্বকে চুলকানিও কি হেপাটাইটিসের লক্ষণ?
হ্যাঁ, কিছু লিভার রোগে ত্বকে চুলকানি দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে পিত্তের প্রবাহে সমস্যা হলে শরীরে এমন অস্বস্তি তৈরি হতে পারে।
তবে ত্বকে চুলকানি অত্যন্ত সাধারণ একটি উপসর্গ এবং অ্যালার্জি, ত্বকের রোগ-সহ বহু কারণেই হতে পারে। তাই শুধু চুলকানি দেখে হেপাটাইটিসের সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না।
আরও কোন লক্ষণ দেখা দিতে পারে?
হেপাটাইটিসের ধরন ও রোগের পর্যায়ের উপর উপসর্গের পার্থক্য হতে পারে। সম্ভাব্য কিছু লক্ষণ হল—
হালকা জ্বর
বমি বমি ভাব বা বমি
ক্ষুধা কমে যাওয়া
পেটের ডানদিকের উপরের অংশে ব্যথা বা অস্বস্তি
অস্বাভাবিক ক্লান্তি
গাঢ় প্রস্রাব
ফ্যাকাশে মল
জন্ডিস
ত্বকে চুলকানি
পেশি ও অস্থিসন্ধিতে ব্যথা
হেপাটাইটিস বি-তে কারা বেশি ঝুঁকিতে?
হেপাটাইটিস বি মূলত সংক্রমিত রক্ত ও নির্দিষ্ট শারীরিক তরলের মাধ্যমে ছড়াতে পারে। ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হতে পারে—
সংক্রমিত রক্তের সংস্পর্শে আসা স্বাস্থ্যকর্মীদের
অনিরাপদ সূচ বা ইনজেকশন ব্যবহারের ক্ষেত্রে
সুরক্ষাহীন যৌনসম্পর্কের ক্ষেত্রে
হেপাটাইটিস বি-তে আক্রান্ত মায়ের সন্তানদের
অনিরাপদ চিকিৎসা পদ্ধতির সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের
নির্দিষ্ট উচ্চ-প্রবণতা অঞ্চলে বসবাস বা ভ্রমণকারী ব্যক্তিদের
তবে ঝুঁকি ব্যক্তিভেদে আলাদা হতে পারে। নিজের ক্ষেত্রে পরীক্ষা বা টিকা প্রয়োজন কি না, তা চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত।হেপাটাইটিস এ, বি, সি ও ই কি একইভাবে ছড়ায়?
না। হেপাটাইটিসের ধরন অনুযায়ী সংক্রমণের পথ আলাদা।হেপাটাইটিস এ ও ই সাধারণত দূষিত খাবার বা জলের মাধ্যমে ছড়াতে পারে। অন্যদিকে বি ও সি প্রধানত সংক্রমিত রক্ত বা নির্দিষ্ট শারীরিক তরলের মাধ্যমে ছড়ায়। হেপাটাইটিস ডি সাধারণত হেপাটাইটিস বি সংক্রমণের সঙ্গে সম্পর্কিত।তাই প্রতিটি ধরনের হেপাটাইটিস প্রতিরোধের পদ্ধতিও এক নয়।
কখন পরীক্ষা করানো জরুরি?
যদি জন্ডিস, অস্বাভাবিক গাঢ় প্রস্রাব, দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা, পেটের ডানদিকে ব্যথা বা অন্য কোনও সন্দেহজনক উপসর্গ থাকে, চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।এছাড়া সংক্রমণের ঝুঁকি থাকলেও উপসর্গের অপেক্ষা না করে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা গুরুত্বপূর্ণ। রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে হেপাটাইটিসের বিভিন্ন ধরন শনাক্ত করা সম্ভব।
হেপাটাইটিস হল যকৃতের প্রদাহ, যার কারণ হতে পারে ভাইরাস, অ্যালকোহল, কিছু ওষুধ, অটোইমিউন রোগ বা বিষাক্ত পদার্থের সংস্পর্শ। অনেক ক্ষেত্রে বিশেষ করে দীর্ঘস্থায়ী হেপাটাইটিস বি ও সি-তে শুরুতে কোনও স্পষ্ট উপসর্গ থাকে না। তবে অতিরিক্ত ক্লান্তি, ক্ষুধামান্দ্য, বমি বমি ভাব, গাঢ় প্রস্রাব, ফ্যাকাশে মল, জন্ডিস বা ত্বকে চুলকানির মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। সময়মতো পরীক্ষা ও চিকিৎসা না হলে দীর্ঘমেয়াদি লিভারের ক্ষতির ঝুঁকি বাড়তে পারে।













