পূর্ব মেদিনীপুরের তাজপুরে প্রস্তাবিত গভীর সমুদ্র বন্দরকে ঘিরে ফের আশাবাদী রাজ্যবাসী। বহু বছর ধরে পরিকল্পনা, দরপত্র ও বিনিয়োগকারী বদলের মধ্যে আটকে থাকা এই প্রকল্প এবার নতুন সরকারের আমলে বাস্তব রূপ পেতে পারে বলেই জোর জল্পনা শুরু হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কেন্দ্র ও রাজ্যের সমন্বিত উদ্যোগ সফল হলে তাজপুর ভবিষ্যতে পূর্ব ভারতের অন্যতম বড় বাণিজ্যিক প্রবেশদ্বার হয়ে উঠতে পারে।
রাজনৈতিক পালাবদলে নতুন গতি প্রকল্পে
রাজ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিজেপি সরকার গঠনের পর তাজপুর বন্দরের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে। শিল্পমহলের দাবি, এতদিন কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবেই প্রকল্পের কাজ এগোচ্ছিল না। কিন্তু এখন প্রশাসনিক জট কাটিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্ভব হতে পারে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর প্রকল্প বাস্তবায়নের সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় এলাকাবাসীর মধ্যেও উচ্ছ্বাস দেখা দিয়েছে।
পূর্ব ভারতের বাণিজ্যে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত
বিশেষজ্ঞদের মতে, তাজপুর বন্দর চালু হলে কলকাতা ও হলদিয়া বন্দরের উপর চাপ অনেকটাই কমবে। বড় গভীরতার জাহাজ সরাসরি নোঙর করতে পারায় আন্তর্জাতিক ট্রান্সশিপমেন্টের উপর নির্ভরতা কমবে এবং পণ্য পরিবহণের খরচও হ্রাস পাবে। এর ফলে রফতানি শিল্প, লজিস্টিক পরিষেবা এবং আমদানি-রফতানি ব্যবসায় নতুন গতি আসতে পারে। পাশাপাশি বন্দরের আশপাশে গড়ে উঠতে পারে নতুন শিল্পাঞ্চল ও কর্মসংস্থানের সুযোগ।
এক দশকের পুরনো স্বপ্নের ইতিহাস
তাজপুরে গভীর সমুদ্র বন্দর তৈরির পরিকল্পনা প্রথম সামনে আসে এক দশকেরও বেশি আগে। মূল লক্ষ্য ছিল কলকাতা ডক সিস্টেমের উপর অতিরিক্ত চাপ কমানো এবং রাজ্যের সামুদ্রিক পরিকাঠামোকে আরও শক্তিশালী করা। শুরুতে এই প্রকল্পে সহযোগিতার কথা ছিল Syama Prasad Mookerjee Port-এর। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে তাজপুরকে ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবেও দেখা হচ্ছিল।
পিপিপি মডেল ও দরপত্র ঘিরে নাটকীয় মোড়
পরবর্তীতে রাজ্য সরকার পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ বা পিপিপি মডেলে প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয়। ২০২১ সালে ডিবিএফওটি কাঠামোর অধীনে দরপত্র আহ্বান করা হলে Adani Ports and Special Economic Zone সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে নির্বাচিত হয়। তারা JSW Infrastructure-কে পিছনে ফেলে প্রকল্পের দায়িত্ব পেয়েছিল। তবে প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক জটিলতার কারণে কাজ এগোয়নি। পরে আদানি গোষ্ঠী প্রকল্প থেকে সরে দাঁড়ালে আবার নতুন করে দরপত্র ডাকা হয়।
নতুন বিনিয়োগকারীর আগ্রহে বাড়ছে আশাবাদ
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে নতুন করে আবেদন জমা নেওয়ার পর মার্চে দরপত্র খোলা হয়। প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে, এবার সজ্জন জিন্দাল গোষ্ঠীর সংস্থা জেএসডব্লিউ এই প্রকল্পের জন্য সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে। ফলে বহুদিন ধরে থমকে থাকা তাজপুর বন্দরের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ইতিবাচক বার্তা মিলছে। শিল্প বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় বিনিয়োগকারী সংস্থা এগিয়ে এলে দ্রুত নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে।
স্থানীয় অর্থনীতিতে বদলের প্রত্যাশা
রামনগরের নবনির্বাচিত বিধায়ক চন্দ্রশেখর মণ্ডল জানিয়েছেন, নতুন সরকার গঠনের পর কেন্দ্র ও রাজ্যের যৌথ উদ্যোগে বন্দরের কাজ দ্রুত শুরু করার চেষ্টা করা হবে। স্থানীয়দের আশা, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে পর্যটনের পাশাপাশি পরিবহণ, হোটেল, গুদামজাতকরণ এবং ক্ষুদ্র ব্যবসাতেও বড় পরিবর্তন আসবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন মূল চ্যালেঞ্জ হল বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখা এবং দ্রুত নীতিগত অনুমোদন সম্পূর্ণ করা।
দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক জট ও রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে থমকে থাকা তাজপুর গভীর সমুদ্র বন্দর প্রকল্প আবারও আলোচনায়। রাজ্যে নতুন সরকার গঠনের পর কেন্দ্র-রাজ্যের সমন্বয়ে ২৫ হাজার কোটি টাকার এই মেগা প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। শিল্পমহল মনে করছে, বন্দর চালু হলে পূর্ব ভারতের বাণিজ্য ও রফতানি ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে।











