বর্ষা মানেই তিস্তার বদলে যাওয়া রূপ। কখনও শান্ত, কখনও প্রচণ্ড উগ্র। পাহাড়ি ঢল নামলেই নদী ফুলে-ফেঁপে ওঠে, আর সেই স্রোতের মাঝেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নেমে পড়েন নদীপাড়ের বাসিন্দারা। কারও হাতে থার্মোকলের ভেলা, কারও হাতে বাঁশের লাঠি। লক্ষ্য একটাই—ভেসে আসা কাঠ সংগ্রহ করে সারা বছরের জ্বালানির ব্যবস্থা করা। প্রকৃতির রুদ্ররূপের মাঝেও বেঁচে থাকার এই লড়াই যেন উত্তরবঙ্গের এক অনন্য জীবনচিত্র।
বর্ষা এলেই বদলে যায় তিস্তার চরিত্র
পাহাড় ও সমতলে টানা বৃষ্টির জেরে তিস্তার জলস্তর দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। শান্ত নদী মুহূর্তের মধ্যে পরিণত হচ্ছে প্রবল স্রোতস্বিনীতে। নদীভাঙনের আশঙ্কায় বহু পরিবার ঘরবাড়ি হারানোর ভয়ে দিন কাটাচ্ছে। তবে এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেও অনেকের কাছে বর্ষা নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়।কারণ পাহাড়ি স্রোতে ভেসে আসে বড় বড় গাছের গুঁড়ি ও বিভিন্ন ধরনের কাঠ, যা সংগ্রহ করেই বহু পরিবার বছরের রান্নার জ্বালানি মজুত করে রাখে।
থার্মোকলের ভেলাই ভরসা, জীবনের ঝুঁকিই নিত্যসঙ্গী
তিস্তার বুকে বড় নৌকা নয়, থার্মোকলের টুকরো জুড়ে তৈরি অস্থায়ী ভেলাতেই নদীতে নামছেন অনেকে। শিশু থেকে বৃদ্ধ—বয়সের কোনও বাধা নেই। কেউ কাঠ সংগ্রহ করছেন, আবার কেউ একই ভেলায় বসে মাছ ধরছেন।সাম্প্রতিক সময়ে এমনই এক দৃশ্য নজর কেড়েছে, যেখানে তিন ভাই থার্মোকলের ভেলায় চেপে প্রবল স্রোতের মধ্যে ভেসে আসা কাঠ সংগ্রহ করছেন। তাঁদের কাছে এটি শুধু ঝুঁকিপূর্ণ কাজ নয়, বরং আগামী কয়েক মাসের জ্বালানির নিশ্চয়তা।
ভাঙনের আতঙ্কের মাঝেও হাসির কারণ
নদী যখন ফুলে ওঠে, তখন একদিকে বাড়িঘর নদীগর্ভে তলিয়ে যাওয়ার ভয় তাড়া করে। অন্যদিকে একই নদী আবার ভেসে আনে মূল্যবান কাঠ, যা কিনতে গেলে বহু টাকার প্রয়োজন হতো।তাই তিস্তার রুদ্ররূপ যেমন কেড়ে নেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করে, তেমনই অনেক দরিদ্র পরিবারের কাছে আশীর্বাদও হয়ে ওঠে। প্রকৃতির এই দ্বৈত চরিত্রই বর্ষাকালের তিস্তাকে অন্য মাত্রা দেয়।
জলস্তর বাড়ছে, জারি হলুদ সতর্কতা
অবিরাম বৃষ্টির কারণে তিস্তার জল বিপদসীমার কাছাকাছি পৌঁছেছে। পরিস্থিতির উপর নজর রাখছে সেচ দফতর। বিভিন্ন ব্যারেজে সতর্কতামূলক সংকেত পরিবর্তন করা হয়েছে।বর্তমানে তিস্তার অসংরক্ষিত এলাকা এবং জলঢাকা নদীর সংরক্ষিত অঞ্চলে হলুদ সতর্কতা জারি রয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে নদীপাড়ের মানুষকে সর্বক্ষণ সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
আরও ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস, বাড়ছে উদ্বেগ
আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামী কয়েকদিন জলপাইগুড়ি-সহ উত্তরবঙ্গের একাধিক জেলায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে তিস্তার জলস্তর আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।তবুও জীবিকার তাগিদে বহু মানুষ প্রতিদিন নদীতে নামছেন। তাঁদের কাছে এই ঝুঁকি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ ভেসে আসা কাঠই আগামী দিনের রান্নার চুলোর জ্বালানি, কখনও বা সামান্য আয়ের উৎস।
উত্তরবঙ্গে টানা বৃষ্টিতে ফুলেফেঁপে উঠেছে তিস্তা নদী। একদিকে ভাঙনের আতঙ্ক, অন্যদিকে সেই উত্তাল নদীতেই থার্মোকলের ভেলায় ভেসে কাঠ সংগ্রহ করছেন তিস্তাপাড়ের মানুষ। জীবনের ঝুঁকি নিয়েই বছরের জ্বালানি জোগাড়ের এই সংগ্রাম আজও বাস্তব।












