মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট Donald Trump হরমুজ প্রণালী থেকে জাহাজ নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার জন্য শুরু করা ‘প্রোজেক্ট ফ্রিডম’ স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছেন। ট্রাম্প বলেন, পাকিস্তানের অনুরোধ এবং ইরানের সঙ্গে আলোচনায় অগ্রগতির পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
রিপোর্ট অনুযায়ী, ট্রাম্প প্রশাসন পাকিস্তানের আবেদন এবং ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য সমঝোতার লক্ষ্যে চলমান আলোচনার অগ্রগতি বিবেচনায় নিয়ে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সোমবার সকালে ‘প্রোজেক্ট ফ্রিডম’ নামে বিশেষ সামুদ্রিক নিরাপত্তা অভিযান শুরু করেছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল হরমুজ প্রণালীতে আটকে পড়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে নিরাপদে বের করে আনা।
হরমুজ প্রণালী বিশ্বে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ, যার মাধ্যমে বৈশ্বিক তেল সরবরাহের একটি বড় অংশ পরিবাহিত হয়। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে প্রতিদিন প্রায় ১৩০টি জাহাজ এই পথ ব্যবহার করে।
তবে বর্তমান সংঘাত এবং নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। মার্কিন অভিযানের সময় সোমবার মাত্র দুটি জাহাজ নিরাপদে সরানো সম্ভব হয় এবং মঙ্গলবার শুধুমাত্র একটি জাহাজ ওই পথ অতিক্রম করে।
মঙ্গলবার রাতে অভিযান স্থগিত করার ঘোষণা দিয়ে ট্রাম্প বলেন, পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রকে এই অভিযান বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছিল।
সূত্রগুলোর দাবি, পাকিস্তান আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানো এবং ইরানের সঙ্গে সংলাপকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিল। ট্রাম্প বলেন, ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য সমঝোতা নিয়ে ইতিবাচক সংকেত পাওয়া যাচ্ছে এবং সেই কারণে সামরিক উত্তেজনা সাময়িকভাবে কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে মার্কিন প্রশাসন জানিয়েছে, ওই অঞ্চলে মার্কিন নৌবাহিনীর নজরদারি এবং কৌশলগত উপস্থিতি অব্যাহত থাকবে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম মার্কিন সিদ্ধান্তকে “কৌশলগত বিজয়” বলে উল্লেখ করেছে। তেহরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র হরমুজে তাদের কৌশল বাস্তবায়নে সফল হয়নি এবং পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে।
ইরানি কর্মকর্তারা বলেন, হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ আঞ্চলিক দেশগুলোর এবং বিশেষ করে ইরানের অধিকারভুক্ত। তাদের অনুমতি ছাড়া কোনো সামরিক অভিযান গ্রহণযোগ্য হবে না।
‘প্রোজেক্ট ফ্রিডম’ শুরু হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই অঞ্চলে উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পায়। ইরান সতর্ক করে বলেছিল, তাদের অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ এই পথ নিরাপদে ব্যবহার করতে পারবে না।
এরপর দক্ষিণ কোরিয়ার একটি জাহাজে হামলা, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা এবং সামুদ্রিক পথে মাইন পেতে রাখার অভিযোগ সামনে আসে। এসব ঘটনার ফলে বৈশ্বিক বাণিজ্য এবং জ্বালানি বাজারে উদ্বেগ বৃদ্ধি পায়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র United Nations Security Council-এ একটি নতুন প্রস্তাব উত্থাপন করেছে। প্রস্তাবে ইরানের কাছে হরমুজে জাহাজে হামলা বন্ধ, সামুদ্রিক পথে মাইন পেতে রাখা বন্ধ এবং জাহাজ থেকে কথিত টোল আদায় বন্ধ করার দাবি জানানো হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্য, বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত করা আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে। ইউএই সরকার দাবি করেছে, তাদের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন আকাশেই ধ্বংস করেছে।
ফুজাইরাহ অঞ্চলে হামলায় তিন ভারতীয় নাগরিক আহত হওয়ার পর ভারতও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ভারত সরকার জানিয়েছে, বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু করা গ্রহণযোগ্য নয় এবং সব পক্ষকে অবিলম্বে সহিংসতা বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
ভারতের জন্য হরমুজ প্রণালী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশের জ্বালানি চাহিদার একটি বড় অংশ উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে আমদানি করা হয়।
এদিকে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী Abbas Araghchi এসব ঘটনার মধ্যে চীন সফরে গেছেন। ধারণা করা হচ্ছে, তেহরান বেইজিংয়ের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থন চাচ্ছে।
চীন একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ নীতির সমালোচনা করেছে, অন্যদিকে হরমুজ প্রণালী খোলা রাখার ওপরও জোর দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান জাতিসংঘে চীনের সমর্থন প্রত্যাশা করছে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে চীনও উদ্বিগ্ন। পাশাপাশি পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে দুই দেশের সহযোগিতা আরও বাড়তে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা এবং সম্ভাব্য শান্তি আলোচনার প্রভাব বৈশ্বিক তেলের বাজারেও পড়েছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, ব্রেন্ট ক্রুড এবং মার্কিন ডব্লিউটিআই ক্রুডের দাম কমেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালী পুনরায় স্বাভাবিকভাবে চালু হলে বৈশ্বিক তেল সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।
এদিকে, ইরানের Islamic Revolutionary Guard Corps হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে সতর্ক করে বলেছে, তারা যেন শুধুমাত্র তেহরান নির্ধারিত পথ ব্যবহার করে।
এছাড়া ইরান সংযুক্ত আরব আমিরাতকে সতর্ক করেছে যে, তাদের ভূখণ্ড যেন যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের সামরিক কার্যক্রমের জন্য ব্যবহার করতে না দেওয়া হয়।











