কোভিড মহামারির স্মৃতি এখনও টাটকা। এরই মধ্যে বিশ্বজুড়ে আরেক সংক্রামক রোগের বাড়বাড়ন্ত নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। এবার উদ্বেগের কেন্দ্রে কলেরা। WHO-এর সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে কলেরায় আক্রান্তের সংখ্যা কিছুটা কমলেও মৃত্যুর হার আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, ১৯৯৯ সালের পর গত বছরই এক বছরে কলেরায় সর্বোচ্চ মৃত্যুর ঘটনা রিপোর্ট হয়েছে।
২০২৫ সালে কলেরায় মৃত্যু ৭,৮৭০ জনের
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বের ৪৭টি দেশে ৪,৫১,৪৯৯ জন কলেরায় আক্রান্ত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৭,৮৭০ জনের মৃত্যু হয়েছে।২০২৪ সালের তুলনায় আক্রান্তের মোট সংখ্যা কিছুটা কমলেও মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে। WHO-এর কাছে রিপোর্ট হওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৯ সালের পর কোনও এক বছরে কলেরায় এত বেশি মৃত্যুর ঘটনা আর নথিভুক্ত হয়নি।তবে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক দেশে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সব তথ্য স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় নথিভুক্ত না হওয়ায় প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
বাংলাদেশ-সহ ৭ দেশে পরিস্থিতি বেশি উদ্বেগের
WHO-এর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে কলেরায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর প্রায় ৯০ শতাংশ ঘটনা ৭টি দেশে ঘটেছে। তালিকায় রয়েছে—
বাংলাদেশ
অ্যাঙ্গোলা
গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র
নাইজেরিয়া
দক্ষিণ সুদান
সুদান
ইয়েমেন
বিশেষ করে আফ্রিকার দেশগুলিতে কলেরার প্রাদুর্ভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে আফ্রিকা অঞ্চলে কলেরায় আক্রান্তের সংখ্যা ৩৪ শতাংশ এবং মৃত্যুর হার ৫৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
কলেরা আসলে কী ধরনের রোগ?
কলেরা কোনও ভাইরাসজনিত রোগ নয়। এটি Vibrio cholerae নামের ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে হওয়া একটি তীব্র ডায়রিয়াজনিত রোগ।সাধারণত দূষিত জল বা জীবাণুযুক্ত খাবারের মাধ্যমে এই ব্যাকটেরিয়া শরীরে প্রবেশ করে। আক্রান্ত ব্যক্তির দ্রুত প্রচুর পরিমাণে জল ও ইলেক্ট্রোলাইট বেরিয়ে যাওয়ার ফলে শরীরে তীব্র জলশূন্যতা বা ডিহাইড্রেশন তৈরি হতে পারে।সময়মতো চিকিৎসা না হলে গুরুতর ডিহাইড্রেশন দ্রুত প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পৌঁছনোর আগেই মৃত্যু অনেকের
WHO-এর তথ্য অনুযায়ী, কলেরায় মৃতদের মধ্যে প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজনেরও বেশি রোগী স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পৌঁছনোর আগেই মারা গিয়েছেন।WHO Health Emergencies Programme-এর এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর ডঃ চিকওয়ে ইহেকওয়েজুর বক্তব্য অনুযায়ী, পরিচ্ছন্ন পানীয় জল, টিকাকরণ এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পরিষেবা আক্রান্ত এলাকাগুলিতে দ্রুত পৌঁছে দেওয়া জরুরি।
প্রতিরোধ করা সম্ভব কলেরা
কলেরা গুরুতর রোগ হলেও প্রতিরোধ ও চিকিৎসার মাধ্যমে মৃত্যুর ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। নিরাপদ ও বিশুদ্ধ পানীয় জল, উন্নত নিকাশি ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ওরাল কলেরা ভ্যাকসিন ব্যবহারের মাধ্যমে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।আক্রান্ত হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়াও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ডায়রিয়ার সঙ্গে শরীরে জলশূন্যতার লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
বাড়ছে ওরাল কলেরা ভ্যাকসিনের উৎপাদন
উদ্বেগজনক পরিস্থিতির মধ্যেও টিকাকরণ ক্ষেত্রে কিছু অগ্রগতি হয়েছে। WHO জানিয়েছে, ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ওরাল কলেরা ভ্যাকসিন (OCV)-এর বার্ষিক বৈশ্বিক উৎপাদন ৩ কোটি ডোজ থেকে বেড়ে ৮ কোটি ডোজ হয়েছে।২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৭.১ কোটি ডোজ ভ্যাকসিন বিতরণের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আক্রান্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলিতে এই ভ্যাকসিন সরবরাহ রোগ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হচ্ছে।
কেন বাড়ছে মৃত্যুর হার?
কলেরায় আক্রান্তের সংখ্যা কমলেও মৃত্যুর হার বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশুদ্ধ পানীয় জল ও পর্যাপ্ত স্বাস্থ্য পরিষেবার অভাব, দ্রুত চিকিৎসা না পাওয়া এবং আক্রান্ত ও মৃত্যুর সব তথ্য নথিভুক্ত না হওয়ার মতো বিষয় পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলতে পারে।বিশেষ করে যেখানে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পৌঁছনো কঠিন, সেখানে তীব্র ডিহাইড্রেশন দ্রুত গুরুতর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
বিশ্বজুড়ে কলেরায় মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)। সংস্থার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ৪৭টি দেশে মোট ৪,৫১,৪৯৯ জন কলেরায় আক্রান্ত হন এবং মৃত্যু হয়েছে ৭,৮৭০ জনের। ১৯৯৯ সালের পর এক বছরে রিপোর্ট হওয়া কলেরায় মৃত্যুর এটি সর্বোচ্চ সংখ্যা। বাংলাদেশ-সহ মাত্র ৭টি দেশে আক্রান্ত ও মৃত্যুর প্রায় ৯০ শতাংশ ঘটনা ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।













