জিম্বাবুয়েতে বিজ্ঞানীরা ২১ কোটি বছর পুরোনো ডাইনোসরের একটি নতুন প্রজাতি Musango matusadonaensis আবিষ্কার করেছেন। গবেষকদের মতে, এই আবিষ্কার দক্ষিণ আফ্রিকার প্রাচীন বাস্তুতন্ত্র এবং ডাইনোসরের প্রাথমিক বিবর্তন সম্পর্কে আরও ভালোভাবে বোঝার সুযোগ তৈরি করবে।
গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, Musango matusadonaensis প্রায় ২১ কোটি বছর আগে লেট ট্রায়াসিক (Late Triassic) যুগে পৃথিবীতে বসবাস করত। এই আবিষ্কারকে শুধু জিম্বাবুয়ে নয়, সমগ্র আফ্রিকার জীবাশ্মবিদ্যার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, Musango matusadonaensis জিম্বাবুয়েতে আনুষ্ঠানিকভাবে নামকরণ করা মাত্র পঞ্চম ডাইনোসর প্রজাতি। আফ্রিকার বহু অঞ্চলে এখনও জীবাশ্ম গবেষণা তুলনামূলকভাবে সীমিত থাকায় এই আবিষ্কার বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। জীবাশ্মটি জিম্বাবুয়ের লেক কারিবা (Lake Kariba)-র তীর থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, ভবিষ্যতে এই অঞ্চল থেকে আরও গুরুত্বপূর্ণ জীবাশ্ম আবিষ্কৃত হতে পারে।
এই গবেষণায় জিম্বাবুয়ে, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং যুক্তরাজ্যের বিজ্ঞানীরা যৌথভাবে অংশ নেন। গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে Journal of Systematic Palaeontology-এ। গবেষণা দলের নেতৃত্ব দেন লন্ডনের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের অধ্যাপক পল ব্যারেট। তাঁর মতে, এই আবিষ্কার প্রমাণ করে যে প্রাচীন দক্ষিণ আফ্রিকায় ডাইনোসরের বৈচিত্র্য পূর্বের ধারণার তুলনায় অনেক বেশি ছিল।
বিজ্ঞানীদের মতে, ডাইনোসরটির দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ৪.৫ মিটার, যা একটি মাঝারি আকারের গাড়ির সমান। জীবাশ্ম বিশ্লেষণে জানা গেছে, মৃত্যুর সময় এর বয়স ছিল প্রায় আট বছর এবং এটি প্রায় পূর্ণাঙ্গভাবে বিকশিত হয়েছিল। গবেষকরা এর মেরুদণ্ড, সামনের অঙ্গ এবং পায়ের হাড় উদ্ধার করেছেন। এসব জীবাশ্মের ভিত্তিতেই এর শারীরিক গঠন ও জীবনযাত্রা নিয়ে গবেষণা করা হয়েছে।

Musango ছিল Sauropodomorph গোষ্ঠীর সদস্য। পরবর্তীকালে Diplodocus-এর মতো বৃহদাকার ডাইনোসর এই গোষ্ঠী থেকেই বিকশিত হয়। তবে Musango তার বিশাল উত্তরসূরিদের মতো চার পায়ে নয়, প্রধানত দুই পায়ে চলাচল করত। গবেষকদের মতে, এই তথ্য প্রাথমিক ডাইনোসরদের বিবর্তন সম্পর্কে ধারণা দেয়।
বিজ্ঞানীদের মতে, Musango সম্পূর্ণ তৃণভোজী ছিল না। গবেষণায় বলা হয়েছে, এটি ছিল সর্বভুক (Omnivore), অর্থাৎ উদ্ভিদের পাশাপাশি ছোট প্রাণীও খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করত। ধারণা করা হয়, সে সময়ের কুমিরসদৃশ Phytosaurs, Lungfish এবং ছোট ডাইনোসরও এর খাদ্যের অংশ ছিল। এই তথ্য প্রাথমিক ডাইনোসরদের খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে নতুন ধারণা দেয়।
Musango যখন পৃথিবীতে বাস করত, তখন বর্তমান আফ্রিকা ছিল গন্ডোয়ানা (Gondwana) নামে পরিচিত একটি বিশাল মহাদেশের অংশ। এই সুপারকন্টিনেন্টের অন্তর্ভুক্ত ছিল বর্তমান দক্ষিণ আমেরিকা, ভারত, অস্ট্রেলিয়া এবং অ্যান্টার্কটিকাও। বিজ্ঞানীদের মতে, সে সময় এসব অঞ্চলে বিভিন্ন ছোট বাস্তুতন্ত্র ছিল, যেখানে ভিন্ন ধরনের প্রাণী ও ডাইনোসরের বিকাশ ঘটেছিল।
দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, দক্ষিণ আফ্রিকায় বসবাসকারী অধিকাংশ ডাইনোসর প্রায় একই ধরনের ছিল। তবে Musango-এর আবিষ্কার সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানায়। অধ্যাপক পল ব্যারেটের মতে, নতুন জীবাশ্ম প্রমাণ করে যে গন্ডোয়ানা অঞ্চল বহু ছোট বাস্তুতন্ত্রে বিভক্ত ছিল, যেখানে বিভিন্ন ধরনের ডাইনোসর ও অন্যান্য প্রাণী বসবাস করত।
ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় ডাইনোসরের জীবাশ্ম নিয়ে কয়েক দশক ধরে ব্যাপক গবেষণা হলেও আফ্রিকায় তুলনামূলকভাবে কম গবেষণা হয়েছে। এ কারণে আফ্রিকা থেকে প্রতিটি নতুন আবিষ্কার বৈশ্বিক বৈজ্ঞানিক মহলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী বছরগুলোতে আফ্রিকা থেকে আরও নতুন ডাইনোসর প্রজাতির সন্ধান মিলতে পারে, যা পৃথিবীর বিবর্তন সম্পর্কে গবেষণায় ভূমিকা রাখবে।
Musango matusadonaensis-এর আবিষ্কার শুধু একটি নতুন প্রজাতির পরিচয় নয়। এই গবেষণা ডাইনোসরের বিবর্তন, বিভিন্ন অঞ্চলে তাদের বৈচিত্র্য এবং পরিবর্তিত পরিবেশের সঙ্গে তাদের অভিযোজন সম্পর্কে ধারণা দিতে সহায়তা করে। এছাড়া এই আবিষ্কার প্রাচীন পৃথিবীর বাস্তুতন্ত্র আধুনিক বিশ্বের তুলনায় আরও বৈচিত্র্যময় ও জটিল ছিল বলে নির্দেশ করে।









