২৫ জুন ১৯৭৫ সালের রাতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সুপারিশে দেশে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়। ভারতের গণতান্ত্রিক ইতিহাসের বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত এই অধ্যায়ের আজ ৫১ বছর পূর্ণ হয়েছে। রাষ্ট্রপতি ফখরুদ্দিন আলি আহমদ ভারতীয় সংবিধানের ৩৫২ অনুচ্ছেদের অধীনে জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন। এই সময়কাল ২১ মার্চ ১৯৭৭ পর্যন্ত স্থায়ী হয় এবং প্রায় ২১ মাস ধরে ভারতের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংবিধানিক কাঠামোকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
জরুরি অবস্থা নিয়ে আজও ভারতে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক রয়েছে। বহু রাজনৈতিক দল এটিকে গণতন্ত্রের ওপর সবচেয়ে বড় আঘাত বলে মনে করে। অন্যদিকে, কিছু বিশ্লেষকের মতে, সে সময় সরকার জাতীয় স্থিতিশীলতা ও আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখার স্বার্থে এই পদক্ষেপকে প্রয়োজনীয় বলে ব্যাখ্যা করেছিল।
জরুরি অবস্থার পেছনে একাধিক রাজনৈতিক ও সামাজিক ঘটনা থাকলেও, এর প্রধান কারণ হিসেবে এলাহাবাদ হাইকোর্টের সেই ঐতিহাসিক রায়কে ধরা হয়, যেখানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে ১৯৭১ সালের লোকসভা নির্বাচনী প্রচারে নির্বাচনী অনিয়মের জন্য দোষী সাব্যস্ত করা হয়। সমাজবাদী নেতা রাজনারায়ণের দায়ের করা মামলার ভিত্তিতেই এই রায় আসে।
আদালত ইন্দিরা গান্ধীর নির্বাচন বাতিল করে দেয় এবং তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। একই সময়ে মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে দেশজুড়ে আন্দোলন চলছিল। লোকনায়ক জয়প্রকাশ নারায়ণের নেতৃত্বে বিরোধী দলগুলো সরকারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছিল। এই পরিস্থিতির মধ্যেই ২৫ জুন ১৯৭৫ দেশে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়।
জরুরি অবস্থা জারির পর একাধিক সাংবিধানিক ও নাগরিক অধিকারের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং বিক্ষোভের ওপর কঠোর নজরদারি চালানো হয়। বিরোধী শিবিরের বহু শীর্ষ নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়, যাঁদের মধ্যে ছিলেন জয়প্রকাশ নারায়ণ, অটল বিহারী বাজপেয়ী এবং লালকৃষ্ণ আদবাণী। এছাড়া হাজার হাজার রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মীকেও আটক করা হয়।

গণমাধ্যমের ওপর সেন্সরশিপ আরোপ করা হয়। সংবাদপত্র ও সাময়িকীগুলোকে প্রকাশের আগে সরকারি অনুমোদন নিতে হতো। সমালোচনামূলক সংবাদ প্রকাশে নিষেধাজ্ঞা থাকায় সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা গুরুতরভাবে প্রভাবিত হয়। এছাড়া এই সময় জোরপূর্বক বন্ধ্যাকরণ অভিযান এবং নগর পুনর্বিকাশের নামে নেওয়া কিছু বিতর্কিত প্রশাসনিক পদক্ষেপেরও ব্যাপক সমালোচনা হয়। পরবর্তী বছরগুলোতে এসব ঘটনাকে ঘিরে বিভিন্ন প্রতিবেদন ও রাজনৈতিক বিতর্ক সামনে আসে।
ইন্দিরা গান্ধীর প্রাক্তন ব্যক্তিগত সচিব আর. কে. ধাওয়ান বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে জরুরি অবস্থা সম্পর্কিত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দাবি করেছিলেন। তাঁর মতে, তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতার পরামর্শ জরুরি অবস্থা জারির সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছিল।
ধাওয়ান আরও দাবি করেছিলেন, ইন্দিরা গান্ধী ব্যক্তিগতভাবে পদত্যাগের বিকল্প বিবেচনা করছিলেন, তবে তাঁর সহযোগীরা তাঁকে পদে বহাল থাকার পরামর্শ দেন।
তাঁর দাবি অনুযায়ী, ১৯৭৭ সালে নির্বাচন আয়োজনের সিদ্ধান্তও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ইতিবাচক প্রতিবেদনের ভিত্তিতে নেওয়া হয়েছিল, যেখানে কংগ্রেসের সম্ভাব্য জয়ের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল। তবে ১৯৭৭ সালের সাধারণ নির্বাচনে কংগ্রেস পরাজিত হয় এবং জনতা পার্টি ক্ষমতায় আসে। স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে এটিই প্রথমবার, যখন কেন্দ্রে অ-কংগ্রেস সরকার গঠিত হয়।












