মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক সামরিক সংঘাত এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিরক্ষা ব্যয় মেটাতে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের কাছে অতিরিক্ত ৮৭.৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, অর্থাৎ প্রায় ₹৮.৩ লক্ষ কোটি টাকার অতিরিক্ত অর্থায়নের আবেদন জানিয়েছেন। হোয়াইট হাউসের দাবি, জাতীয় নিরাপত্তা, সামরিক প্রস্তুতি এবং অস্ত্রভাণ্ডার শক্তিশালী করার জন্য এই অর্থ প্রয়োজন। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের এই প্রস্তাব কংগ্রেসে ক্রমবর্ধমান বিরোধিতার মুখে পড়েছে, ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ইরান নীতি আবারও রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে এসেছে।
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, চাওয়া ৮৭.৬ বিলিয়ন ডলারের অর্থ বিদ্যমান অনুমোদিত প্রতিরক্ষা বাজেটের অতিরিক্ত। গত বছর যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা বাজেট অনুমোদন করেছিল। আগামী অর্থবছরের জন্য ট্রাম্প প্রশাসন ইতোমধ্যে প্রায় ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা বাজেটের আবেদন করেছে।
সরকারের বক্তব্য, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান, সেনা মোতায়েন, অস্ত্রের ব্যবহার এবং নিরাপত্তা প্রস্তুতির কারণে প্রতিরক্ষা সম্পদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে। তাই সামরিক সক্ষমতা বজায় রাখা এবং ভবিষ্যতের সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন রয়েছে।
প্রশাসনের মতে, অতিরিক্ত অর্থায়নের বড় অংশ ইরান-সংক্রান্ত সামরিক কার্যক্রমে ব্যয় হবে। এর মধ্যে সেনাবাহিনীর পরিচালন ব্যয়, ক্ষেপণাস্ত্র ও অস্ত্রভাণ্ডার পুনরায় পূরণ, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ এবং কিছু গোপন প্রতিরক্ষা কর্মসূচিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, পশ্চিম এশিয়ায় ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক নিরাপত্তা স্বার্থ বিবেচনায় প্রতিরক্ষা প্রস্তুতিতে কোনো ঘাটতি রাখা যাবে না। কর্মকর্তাদের মতে, অতিরিক্ত সম্পদ না পেলে ভবিষ্যতে জাতীয় নিরাপত্তা প্রভাবিত হতে পারে।
ট্রাম্পের এই প্রস্তাব মার্কিন কংগ্রেসে উল্লেখযোগ্য বিরোধিতার মুখে পড়েছে। সম্প্রতি মার্কিন সিনেট একটি প্রস্তাব পাস করে প্রেসিডেন্টকে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ সীমিত রাখার আহ্বান জানিয়েছে। এর আগে প্রতিনিধি পরিষদও একই ধরনের একটি প্রস্তাব অনুমোদন করেছিল।
এছাড়া কয়েকজন রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাও এ বিষয়ে ট্রাম্পের অবস্থান সমর্থন করেননি। চারজন রিপাবলিকান সদস্য ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সঙ্গে ভোট দিয়ে ওই প্রস্তাবের পক্ষে অবস্থান নেন। এতে ইঙ্গিত মিলছে যে, ইরান নীতি নিয়ে প্রেসিডেন্ট নিজ দলের মধ্যেও মতপার্থক্যের মুখোমুখি হচ্ছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কংগ্রেসের এই বিরোধিতা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য চ্যালেঞ্জ হতে পারে, কারণ অতিরিক্ত অর্থায়নের অনুমোদনের জন্য বিস্তৃত রাজনৈতিক সমর্থন প্রয়োজন হবে।
ইরান সংকটের মধ্যেই বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে কিছুটা স্বস্তি দেখা গেছে। মার্কিন অপরিশোধিত তেল (WTI)-এর দাম ব্যারেলপ্রতি ৭০ ডলারের নিচে নেমেছে এবং ব্রেন্ট ক্রুডের দাম কমে প্রায় ৭৩.৫০ ডলার প্রতি ব্যারেলে পৌঁছেছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, তেলের দাম কমলে বৈশ্বিক অর্থনীতি কিছুটা স্বস্তি পেতে পারে। এতে পরিবহন ব্যয় এবং বিভিন্ন শিল্পের খরচ কমতে পারে, যা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে।
তবে বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি এখনও সংবেদনশীল এবং নতুন কোনো ঘটনার প্রভাব দ্রুত তেলের বাজারে প্রতিফলিত হতে পারে।
অপরিশোধিত তেলের দাম কমলেও ভোক্তারা পর্যাপ্ত সুবিধা না পাওয়ায় ট্রাম্প প্রশাসন তেল কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। প্রেসিডেন্ট যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগকে প্রধান তেল কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।
ট্রাম্পের অভিযোগ, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমলেও বহু কোম্পানি পেট্রোল ও অন্যান্য জ্বালানির খুচরা মূল্যে প্রত্যাশিত হারে ছাড় দিচ্ছে না। প্রশাসনের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যহ্রাসের সুবিধা সরাসরি ভোক্তাদের কাছে পৌঁছানো উচিত।
তবে তেল শিল্প-সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, খুচরা জ্বালানির দাম নির্ধারণে আরও একাধিক উপাদান ভূমিকা রাখে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনেইর রাষ্ট্রীয় শেষকৃত্যে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ পাঠিয়েছেন। এই আমন্ত্রণ আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে, কারণ ভারত দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—উভয়ের সঙ্গেই ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করে আসছে।
![]()
বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের কূটনৈতিক পদক্ষেপ ভবিষ্যতের আঞ্চলিক রাজনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে এবং এতে ভারতের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে প্রযুক্তিগত পর্যায়ের আলোচনা ২৯ বা ৩০ জুন সুইজারল্যান্ডে পুনরায় শুরু হতে পারে। তাঁর মতে, এই বৈঠকের উদ্দেশ্য সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা কমানো।
রুবিও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে কূটনৈতিক সমাধানকে সমর্থন করছে। তবে ইরান যদি তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করে, তাহলে নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করা হতে পারে। তাঁর মতে, বর্তমান ছাড় স্থায়ী নয় এবং তা সম্পূর্ণভাবে ইরানের আচরণের ওপর নির্ভরশীল।
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA) এবং ইরানের মধ্যে দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচির পর্যবেক্ষণ নিয়ে মতপার্থক্য অব্যাহত রয়েছে। IAEA-এর দাবি, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো পরিদর্শনের অধিকার তাদের থাকা উচিত, যাতে কর্মসূচিটি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে কি না তা নিশ্চিত করা যায়।
অন্যদিকে ইরান জানিয়েছে, বিস্তৃত সমঝোতা এবং অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞায় শিথিলতার পরই যেকোনো পরিদর্শন ব্যবস্থার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এই বিষয়টি আসন্ন আলোচনার অন্যতম সংবেদনশীল ইস্যু হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
মার্কিন গবেষণা সংস্থা পিউ রিসার্চ সেন্টারের নতুন এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান সংকটের সময় পাকিস্তানই ছিল একমাত্র প্রধান মুসলিম-অধ্যুষিত দেশ, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে জনমতের উন্নতি লক্ষ্য করা গেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংলাপ প্রক্রিয়ায় পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা এই পরিবর্তনে অবদান রেখেছে।
তবে জরিপে এটিও উঠে এসেছে যে, পাকিস্তানের অধিকাংশ মানুষ এখনও যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বের ওপর পুরোপুরি আস্থা রাখেন না। বিপুলসংখ্যক উত্তরদাতা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের অতিরিক্ত অর্থায়নের আবেদন, ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য আলোচনা, তেলের বাজারের ওঠানামা এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে চলমান মতপার্থক্য আগামী দিনে বৈশ্বিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। কূটনৈতিক প্রচেষ্টা সফল হলে পশ্চিম এশিয়ায় স্থিতিশীলতা বাড়তে পারে, তবে তা ব্যর্থ হলে আঞ্চলিক উত্তেজনা আবারও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে মার্কিন কংগ্রেসে বাড়তে থাকা বিরোধিতা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হতে পারে। আগামী কয়েক সপ্তাহ এই পুরো পরিস্থিতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।








