ইরানের তেল বাণিজ্যে সহায়তার অভিযোগে ভারতীয় নাগরিক ও সংস্থার উপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা

ইরানের তেল পরিবহণে জাল নথি সরবরাহ এবং নিষেধাজ্ঞা এড়াতে সহায়তার অভিযোগে ভারতীয় নাগরিক, একাধিক সংস্থা ও তুরস্কের Fugo Ground Services Inc-এর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে আমেরিকা।

ইরানের তেল বাণিজ্যে কথিতভাবে সহায়তা করার অভিযোগে ভারতীয় নাগরিক ও একাধিক সংস্থার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে আমেরিকা। একইসঙ্গে তুরস্কের একটি বিমান পরিষেবা সংস্থার বিরুদ্ধেও পদক্ষেপ করেছে মার্কিন প্রশাসন। মার্কিন অর্থ মন্ত্রকের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সংস্থাগুলি মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য চালিয়ে যেতে সাহায্য করেছে।

ইরানের উপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর লক্ষ্যে ভারত ও তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্কিত একাধিক ব্যক্তি ও সংস্থার বিরুদ্ধে বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬ নতুন নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা করেছে মার্কিন অর্থ মন্ত্রক। অভিযোগ, ভারত থেকে পরিচালিত একটি ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক ইরানের তেল পরিবহণকারী জাহাজগুলিকে জাল নথিপত্র সরবরাহ করত। অন্যদিকে, তুরস্কের একটি সংস্থার বিরুদ্ধে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা ইরানি বিমান সংস্থাগুলিকে পরিষেবা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

মার্কিন অর্থ মন্ত্রকের এই পদক্ষেপের কেন্দ্রে রয়েছেন চণ্ডীগড়ের সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যবসায়ী সুনীল কুমার শর্মা এবং তাঁর স্ত্রী জসপ্রীত প্রীতি শাহিদ। মার্কিন অর্থ মন্ত্রকের অভিযোগ, একাধিক সংস্থার মাধ্যমে তাঁরা এমন একটি ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক তৈরি করেছিলেন, যার সাহায্যে ইরানের তেল পরিবহণকারী নিষিদ্ধ জাহাজগুলি নিজেদের প্রকৃত পরিচয় গোপন রেখে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছিল।

মার্কিন কর্তৃপক্ষ ওই নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত আরও নয়টি সংস্থাকে নিষেধাজ্ঞার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। পাশাপাশি, ভারতীয় নাগরিক অশ্বনী কুমার ধিমান এবং ইশবিন্দর সিংয়ের বিরুদ্ধেও পদক্ষেপ করা হয়েছে। তাঁদের নাম শর্মার সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যবসায়িক নেটওয়ার্কে উঠে এসেছে।

নিষেধাজ্ঞার আওতায় আসা সংস্থাগুলির মধ্যে রয়েছে Oceaniek Technologies India, Aryavart Ship Management Private Limited, Precept Trends Private Limited এবং Polynesia Maritime Private Limited।

মার্কিন অর্থ মন্ত্রকের অভিযোগ, ভারত-সম্পর্কিত একটি নেটওয়ার্ক ইরানের তেল পরিবহণকারী জাহাজগুলির জন্য জাল নথিপত্র তৈরি করত। এর মধ্যে জাহাজের রেজিস্ট্রেশন এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত শংসাপত্রও ছিল। এই নথি ব্যবহার করে আমেরিকার নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা জাহাজগুলি অন্য দেশের পরিচয়ে সমুদ্রে চলাচল করত বলে অভিযোগ।

ইরানের তেল বাণিজ্যে সহায়তার অভিযোগে ভারতীয় নাগরিক ও সংস্থার উপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা

মার্কিন কর্তৃপক্ষের দাবি, এই কাজে গায়ানা, লাওস এবং ইস্বাতিনির মতো দেশের নাম ব্যবহার করা হয়েছিল। নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা নিজেদের ওই দেশগুলির পক্ষে জাহাজের নথিপত্র তৈরি করার অনুমোদিত সংস্থা হিসেবে পরিচয় দিতেন। এই উদ্দেশ্যে তাঁরা ওয়েবসাইটও তৈরি করেছিলেন। সেখানে জাহাজের রেজিস্ট্রেশন এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত শংসাপত্র দেওয়ার দাবি করা হত।

আমেরিকার দাবি, এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ইরানের এমন কিছু জাহাজও সুবিধা পেয়েছে, যেগুলির সঙ্গে দেশটির সামরিক বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলির সম্পর্ক ছিল।

মার্কিন অর্থ মন্ত্রকের বক্তব্য, জাল নথিপত্র ব্যবহার করে চলাচলকারী জাহাজগুলির কারণে সমুদ্রে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়তে পারে। একাধিক জাহাজের প্রয়োজনীয় বিমা না থাকার আশঙ্কাও রয়েছে। ফলে কোনও জাহাজ ডুবে গেলে, অন্য জাহাজের সঙ্গে সংঘর্ষ হলে অথবা তেল ছড়িয়ে পড়ে পরিবেশের ক্ষতি হলে সেই ক্ষতিপূরণের দায় কার উপর বর্তাবে, তা নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে।

ভারতের পাশাপাশি তুরস্কের Fugo Ground Services Inc-কেও নিষেধাজ্ঞার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে আমেরিকা। সংস্থাটির বিরুদ্ধে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা ইরানি বিমান সংস্থাগুলিকে বিমানবন্দরে প্রয়োজনীয় পরিষেবা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

মার্কিন অর্থ মন্ত্রকের দাবি, একাধিক ইরানি বিমান সংস্থার সঙ্গে Fugo Ground Services Inc-এর সরাসরি পরিষেবা চুক্তি ছিল। এই সংস্থাগুলির মধ্যে রয়েছে Iran Air Tour, Saha Airlines, Sepehran Airlines এবং Taban Airlines।

আমেরিকার অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট পরিষেবা পাওয়ার ফলে নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা ইরানি বিমান সংস্থাগুলি নিজেদের বিমান পরিষেবা পরিচালনা অব্যাহত রাখতে সক্ষম হয়েছিল।

ইরানের তেল বিক্রি থেকে আয় বন্ধ করার লক্ষ্যে ২৪ আগস্ট ২০২৬ 'অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট' শুরু করেছিল আমেরিকা। এই অভিযানের আওতায় ট্রাম্প প্রশাসন এমন সংস্থাগুলির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করছে, যারা মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইরানের কাছ থেকে তেল কিনছে অথবা দেশটিতে অর্থ পৌঁছে দিতে সাহায্য করছে।

আমেরিকার বক্তব্য, ইরান তেল বিক্রি করে যে অর্থ উপার্জন করে, তা দেশের সামরিক বাহিনী এবং অন্যান্য সংগঠনের সহায়তায় ব্যবহার করে। সেই কারণে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখা বিদেশি সংস্থাগুলির উপর নজরদারি বাড়িয়েছে মার্কিন প্রশাসন। নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে ইরানকে সহায়তা করার অভিযোগ রয়েছে, এমন সংস্থাগুলির বিরুদ্ধেও তদন্ত করা হচ্ছে।

গত সপ্তাহে মার্কিন অর্থ মন্ত্রক জানিয়েছিল, এই নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়েছে। দেশটির মুদ্রা রিয়ালের মূল্য রেকর্ড স্তরে নেমে গিয়েছে। পাশাপাশি, ইরানে মুদ্রাস্ফীতি প্রায় ৯০ শতাংশে পৌঁছেছে বলেও দাবি করা হয়েছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের সমস্যাও বাড়ছে।

 

Leave a comment