রাষ্ট্রসংঘে প্রচলিত অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে ভারত ও ইজরায়েল পৃথক অবস্থান নিয়েছে। পাকিস্তান ও বেলারুশের পেশ করা ওই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে দুই দেশ। সোমবার, ২ নভেম্বর, রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদের প্রথম কমিটিতে অনুষ্ঠিত ভোটাভুটিতে ১৮০টি দেশ প্রস্তাবটির পক্ষে সমর্থন জানায়। অন্যদিকে, ভারত ও ইজরায়েল প্রস্তাবটির বিরোধিতা করে।
ভারতের বক্তব্য, প্রচলিত অস্ত্র নিয়ন্ত্রণকে শুধুমাত্র আঞ্চলিক বা উপ-আঞ্চলিক নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করা যায় না। কোনও দেশের নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগ কেবল তার প্রতিবেশী দেশগুলির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর সঙ্গে বৃহত্তর আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিও জড়িত।
রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদের প্রথম কমিটিতে পাকিস্তান ও বেলারুশ আঞ্চলিক এবং উপ-আঞ্চলিক স্তরে প্রচলিত অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব পেশ করে। অস্ত্রের সংখ্যা এবং সামরিক সক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের জন্য বিভিন্ন অঞ্চলের দেশগুলির মধ্যে চুক্তি ও সমঝোতা গড়ে তোলাই এই প্রস্তাবের মূল উদ্দেশ্য।
ভোটাভুটিতে ১৮০টি দেশ প্রস্তাবটির পক্ষে সমর্থন জানায়। ভারত ও ইজরায়েল ছিল একমাত্র দুই দেশ, যারা এর বিরুদ্ধে ভোট দেয়। কোনও সদস্য দেশ ভোটদানে বিরত থাকার বিকল্প বেছে নেয়নি। যদিও রাষ্ট্রসংঘের ১৯৩টি সদস্য দেশের প্রত্যেকেই ভোটাভুটিতে অংশ নেয়নি।
ভারত স্পষ্ট করেছে, অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যের বিরোধিতা করা তাদের অবস্থান নয়। বরং প্রস্তাবে যে আঞ্চলিক দৃষ্টিভঙ্গিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, তাতেই আপত্তি রয়েছে নয়াদিল্লির। ভারতের মতে, কোনও দেশের নিরাপত্তা সংক্রান্ত হুমকি শুধুমাত্র তার আশপাশের দেশগুলির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। অনেক ক্ষেত্রে অন্যান্য অঞ্চল এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির সঙ্গেও নিরাপত্তার বিষয়গুলি যুক্ত থাকে।
এই কারণেই প্রচলিত অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে মূলত আঞ্চলিক ও উপ-আঞ্চলিক চুক্তির উপর নির্ভর করার প্রস্তাবের সঙ্গে একমত হয়নি ভারত।
ভোটাভুটির পর ভারতের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন রাষ্ট্রসংঘে ভারতের স্থায়ী মিশনের প্রথম সচিব অনমোল শের বেদী। তিনি বলেন, প্রচলিত অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ একটি আন্তর্জাতিক বিষয়। একে শুধুমাত্র কোনও নির্দিষ্ট অঞ্চলের দেশগুলির নিরাপত্তার প্রয়োজনের ভিত্তিতে বিচার করা সম্ভব নয়।
বেদীর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রস্তাবটিতে ধরে নেওয়া হয়েছে যে দেশগুলির নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগ তাদের আঞ্চলিক সীমানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি তেমন নয়।
আঞ্চলিক স্তরে সামরিক সক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার ধারণাকেও অবাস্তব বলে উল্লেখ করেন তিনি। ভারতের বক্তব্য, কোনও দেশের প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত প্রয়োজন নির্ধারণের সময় বৃহত্তর আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে উপেক্ষা করা যায় না।
ভারতীয় প্রতিনিধি আরও স্পষ্ট করেন, এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত দেশের পূর্ববর্তী অবস্থানের সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ।
প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত আরও একটি বিষয় নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে ভারত। সেখানে রাষ্ট্রসংঘের নিরস্ত্রীকরণ কমিশনকে আঞ্চলিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তির জন্য নতুন নীতি ও নির্দেশিকা তৈরির বিষয়টি বিবেচনা করার অনুরোধ জানানো হয়েছিল।
এ প্রসঙ্গে অনমোল শের বেদী জানান, কমিশন ইতিমধ্যেই এই বিষয়ে একাধিকবার কাজ করেছে। ১৯৯৩ সালে আঞ্চলিক নিরস্ত্রীকরণের জন্য নির্দেশিকা তৈরি করা হয়েছিল। এরপর ১৯৯৯ সালে প্রচলিত অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে ঐকমত্য তৈরি হয়। ২০১৭ সালে প্রচলিত অস্ত্র সংক্রান্ত আস্থা বৃদ্ধির পদক্ষেপ নিয়েও সুপারিশ গৃহীত হয়েছিল।
![]()
ভারতের প্রশ্ন, একই বিষয়ে ইতিমধ্যেই তিনবার ঐকমত্য তৈরি হয়ে থাকলে নতুন করে আর একটি প্রক্রিয়া শুরু করার প্রয়োজন কেন? ভারতীয় প্রতিনিধির বক্তব্য, আগে থেকে তৈরি নির্দেশিকাগুলিকে বিবেচনায় না নিয়ে একই বিষয় নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু করা যথাযথ নয়।
প্রস্তাবের যে অনুচ্ছেদে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রচলিত অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত উদ্যোগের উল্লেখ ছিল, তার বিরুদ্ধেও পৃথকভাবে ভোট দেয় ভারত।
ওই অনুচ্ছেদে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। এর মধ্যে লাতিন আমেরিকার দেশগুলির মধ্যে হওয়া আলোচনা এবং দক্ষিণ এশিয়ায় সামনে আসা প্রস্তাবগুলিও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
খসড়া প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, আঞ্চলিক নিরাপত্তা বজায় রাখার ক্ষেত্রে সামরিক সক্ষমতাসম্পন্ন বড় দেশগুলির বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে। তবে আঞ্চলিক সামরিক ভারসাম্যের এই ধারণা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে ভারত।
নয়াদিল্লির যুক্তি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র ভৌগোলিক সীমানা কিংবা প্রতিবেশী দেশগুলির সামরিক সক্ষমতাকে বিবেচনা করলে চলবে না।
প্রচলিত অস্ত্রের মধ্যে ট্যাঙ্ক, কামান, যুদ্ধবিমান, যুদ্ধজাহাজ এবং সাধারণ সামরিক অস্ত্র অন্তর্ভুক্ত। এই ধরনের অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্য হল অস্ত্র প্রতিযোগিতা কমানো এবং দেশগুলির মধ্যে সংঘাতের আশঙ্কা হ্রাস করা।
পাকিস্তান ও বেলারুশের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, শীতল যুদ্ধের পর থেকে একাধিক নিরাপত্তা হুমকি একই অঞ্চলে অবস্থিত দেশগুলির মধ্যে তৈরি হয়েছে। সেই কারণে আঞ্চলিক চুক্তি ও সমঝোতাকে উৎসাহিত করা প্রয়োজন।
প্রস্তাব অনুযায়ী, শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য অস্ত্র এবং সামরিক বাহিনীর সংখ্যা যথাসম্ভব কম পর্যায়ে রাখার লক্ষ্যে কাজ করা উচিত। তবে ভারতের বক্তব্য, এই ধরনের উদ্যোগ গ্রহণের সময় বৃহত্তর আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকেও বিবেচনায় রাখা জরুরি।
পাকিস্তান ও বেলারুশের পেশ করা খসড়া প্রস্তাবটি রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদের প্রথম কমিটির অনুমোদন পেয়েছে। তবে এই অনুমোদন রাষ্ট্রসংঘের পূর্ণ সাধারণ পরিষদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়।
প্রথম কমিটিতে অনুমোদিত খসড়াটি এবার বিবেচনার জন্য রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদে পাঠানো হবে। ভোটাভুটিতে ভারত ও ইজরায়েল বিরোধিতা করলেও ১৮০টি দেশের সমর্থনে প্রস্তাবটি পরবর্তী পর্যায়ে এগিয়ে গিয়েছে।
এখন সাধারণ পরিষদে প্রস্তাবটি কীভাবে গৃহীত হয়, সেটাই পরবর্তী প্রক্রিয়ার বিষয়। প্রচলিত অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ভারতের অবস্থান, বৃহত্তর আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগগুলিকে বিবেচনায় রেখেই এই বিষয়ে পদক্ষেপ করা প্রয়োজন।









