নির্বাচন কমিশনারদের আইনি সুরক্ষা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে নতুন মামলা, কেন্দ্রকে নোটিস

প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারদের আইনি সুরক্ষা সংক্রান্ত ২০২৩ সালের আইনের ১৬ নম্বর ধারাকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে নতুন আবেদন। কেন্দ্র ও নির্বাচন কমিশনকে চার সপ্তাহের মধ্যে জবাব দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে আদালত।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারদের আইনি সুরক্ষা দেওয়ার বিধান নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ২০২৩ সালের আইনের ১৬ নম্বর ধারার সাংবিধানিক বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে একাধিক নতুন আবেদন জমা পড়েছে। বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬, এই মামলাগুলির শুনানিতে কেন্দ্রীয় সরকার এবং নির্বাচন কমিশনকে নোটিস পাঠিয়ে জবাব চেয়েছে শীর্ষ আদালত।

আবেদনকারীদের বক্তব্য, কোনও আধিকারিককে তাঁর পদে থাকাকালীন সরকারি দায়িত্ব পালনের জন্য দেওয়া আইনি সুরক্ষা অবসর গ্রহণের পরেও বহাল রাখা যুক্তিসংগত নয়। এই যুক্তিতে তাঁরা ২০২৩ সালের আইনের ১৬ নম্বর ধারা বাতিল করার দাবি জানিয়েছেন।

বুধবার সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি. মোহনার বেঞ্চে মামলাটির শুনানি হয়। রাষ্ট্রীয় জনতা দলের (RJD) সাংসদ মনোজ ঝা এবং সমাজকর্মী ও আইনজীবী অরুণ কুমার আগরওয়াল নির্বাচন কমিশনারদের আইনি সুরক্ষার বিরুদ্ধে পৃথক আবেদন জমা দিয়েছেন।

শুনানির পর কেন্দ্রীয় সরকার এবং নির্বাচন কমিশনকে নোটিস জারি করে আদালত। চার সপ্তাহের মধ্যে উভয় পক্ষকে নিজেদের বক্তব্য জানাতে বলা হয়েছে। একই বিষয়ে আগে থেকে চলা মামলাগুলির সঙ্গে নতুন আবেদনগুলিও যুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছে আদালত।

নির্বাচন কমিশনারদের আইনি সুরক্ষা নিয়ে এর আগেও প্রশ্ন উঠেছে। এর আগে অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্র্যাটিক রিফর্মস (ADR) এবং লোক প্রহরী নামে একটি সংগঠনও সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিল। ADR-এর আবেদনের ভিত্তিতে অক্টোবর মাসেই কেন্দ্রীয় সরকার এবং নির্বাচন কমিশনকে নোটিস পাঠিয়েছিল শীর্ষ আদালত।

নির্বাচন কমিশনারদের আইনি পদক্ষেপ থেকে সুরক্ষা দেওয়ার বিষয়টি ২০২৩ সালে প্রণীত একটি আইনের সঙ্গে যুক্ত। ওই আইনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ, কার্যকাল ও চাকরির শর্তাবলি নির্ধারণ করা হয়েছে। বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে এই আইনের ১৬ নম্বর ধারা।

নির্বাচন কমিশনারদের আইনি সুরক্ষা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে নতুন মামলা, কেন্দ্রকে নোটিস

এই ধারায় বলা হয়েছে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার বা অন্য কোনও নির্বাচন কমিশনার পদে থাকাকালীন সরকারি দায়িত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনও সিদ্ধান্ত নিলে বা বক্তব্য রাখলে, সেই কারণে তাঁর বিরুদ্ধে দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলা চালানো যাবে না। পদ থেকে অবসর নেওয়ার পরেও এই আইনি সুরক্ষা বহাল থাকবে। তবে ব্যক্তিগত বিষয়গুলির ক্ষেত্রে এই ছাড় প্রযোজ্য হবে না।

আবেদনকারীদের আপত্তি, কোনও নির্বাচন কমিশনার নিজের ক্ষমতার অপব্যবহার করলে তাঁর বিরুদ্ধে কীভাবে আইনি পদক্ষেপ করা হবে? তাঁদের বক্তব্য, সরকারি দায়িত্ব পালনের আড়ালে কোনও ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও এই ধারার কারণে সংশ্লিষ্ট আধিকারিক আইনি সুরক্ষা পেতে পারেন। এই কারণেই ১৬ নম্বর ধারার সাংবিধানিক বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ জানানো হয়েছে।

নির্বাচনী সংস্কার নিয়ে কাজ করা সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্র্যাটিক রিফর্মস (ADR) ১০ অক্টোবর ২০২৬ সুপ্রিম কোর্টে এই বিষয়ে আবেদন জমা দিয়েছিল। সংগঠনটি নির্বাচন কমিশনারদের দেওয়া আইনি সুরক্ষার বিরোধিতা করেছে।

ADR-এর বক্তব্য, নির্বাচন কমিশনারদের কোনও চাপ ছাড়াই দায়িত্ব পালনের সুযোগ থাকা প্রয়োজন। তবে তার অর্থ এই নয় যে তাঁদের সরকারি সিদ্ধান্তকে আদালতে চ্যালেঞ্জ জানানোর পথ বন্ধ করে দেওয়া হবে।

সংগঠনটি আবেদনে সংবিধানের ১৪ এবং ২১ নম্বর অনুচ্ছেদেরও উল্লেখ করেছে। ADR-এর দাবি, আইনের চোখে প্রত্যেকের সমান অধিকার থাকা উচিত। কোনও আধিকারিকের বিরুদ্ধে ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল কাজ করার অভিযোগ উঠলে তাঁর বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপের সুযোগ থাকা প্রয়োজন। এই যুক্তিতেই ২০২৩ সালের আইনের ১৬ নম্বর ধারাকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করার আবেদন জানিয়েছে সংগঠনটি।

মামলার সঙ্গে সম্পর্কিত আবেদনগুলিতে রাষ্ট্রপতি এবং রাজ্যপালের আইনি সুরক্ষার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। সংবিধানের ৩৬১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, এই দুই সাংবিধানিক পদে থাকা ব্যক্তিদের নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে বিশেষ আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে।

আবেদনকারীদের প্রশ্ন, রাষ্ট্রপতি এবং রাজ্যপালের আইনি সুরক্ষার জন্য যেখানে সংবিধানে পৃথক বিধান রয়েছে, সেখানে নির্বাচন কমিশনারদের জন্য ২০২৩ সালের আইনের মাধ্যমে এত বিস্তৃত আইনি ছাড় দেওয়ার ভিত্তি কী?

তাঁদের বক্তব্য, নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা বজায় রাখা জরুরি। তবে কমিশনারদের কাজকর্মের বিরুদ্ধে আইনি প্রশ্ন তোলার অধিকারও বহাল থাকা প্রয়োজন। কোনও সিদ্ধান্তে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠলে সেই ঘটনার তদন্তের পথ খোলা রাখা উচিত।

নির্বাচন কমিশনারদের আইনি সুরক্ষা সংক্রান্ত ২০২৩ সালের আইনের ১৬ নম্বর ধারা এখনও বাতিল করেনি সুপ্রিম কোর্ট। আপাতত এই আইন কার্যকর রয়েছে। আদালত কেন্দ্রীয় সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য জানতে চেয়ে নোটিস জারি করেছে।

এই মামলায় পরবর্তী শুনানি ১২ ডিসেম্বর হওয়ার কথা রয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য শোনার পর সংশ্লিষ্ট ধারার সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ বিবেচনা করবে সুপ্রিম কোর্ট।

 

Leave a comment