১৯৮৪ সালের শিখবিরোধী দাঙ্গা নিয়ে কংগ্রেসকে আক্রমণ বিজেপির, রাহুলের কাছে ক্ষমা দাবি

পঞ্জাবের সঙ্গরুরে রাহুল গান্ধীর নির্বাচনী জনসভার দিন চণ্ডীগড়ে ১৯৮৪ সালের শিখবিরোধী দাঙ্গা নিয়ে সম্মেলন করল বিজেপি। রাজীব গান্ধীর পুরনো মন্তব্যের প্রসঙ্গ তুলে কংগ্রেস ও গান্ধী পরিবারের কাছে ক্ষমা দাবি করলেন রবিশঙ্কর প্রসাদ।

পঞ্জাবে আগামী বছর বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে কংগ্রেস ও বিজেপির মধ্যে রাজনৈতিক চাপানউতোর তীব্র হয়েছে। বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬, কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী সঙ্গরুরে নির্বাচনী প্রচারে জনসভা করেন। অন্যদিকে, একই দিনে চণ্ডীগড়ে ১৯৮৪ সালের শিখবিরোধী দাঙ্গা নিয়ে সম্মেলনের আয়োজন করে বিজেপি। 'জখম ৮৪ দে' শীর্ষক ওই সম্মেলনে প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তথা বিজেপি সাংসদ রবিশঙ্কর প্রসাদ কংগ্রেসকে আক্রমণ করেন। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর একটি পুরনো বক্তব্যের প্রসঙ্গ তুলে তিনি রাহুল গান্ধী ও গান্ধী পরিবারের কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানান।

চণ্ডীগড়ে বিজেপির উদ্যোগে একদিনের 'জখম ৮৪ দে' সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সেখানে ১৯৮৪ সালের শিখবিরোধী হিংসার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন রবিশঙ্কর প্রসাদ।

তাঁর বক্তব্য, ৪২ বছর পেরিয়ে গেলেও সেই হিংসায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির যন্ত্রণা এখনও শেষ হয়নি। ওই ঘটনায় বহু মানুষ তাঁদের পরিবারের সদস্যদের হারিয়েছিলেন। এই পরিস্থিতিতে ১৯৮৪ সালের ঘটনার দায় নিয়ে কংগ্রেসকে জবাবদিহি করতে হবে বলে দাবি করেন তিনি।

রবিশঙ্কর প্রসাদ রাহুল গান্ধীকে প্রশ্ন করেন, ১৯৮৪ সালের নভেম্বর মাসে তাঁর বাবা তথা প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী যে বক্তব্য রেখেছিলেন, সেই বিষয়ে তাঁর অবস্থান কী? একই সঙ্গে ওই বক্তব্যের জন্য গান্ধী পরিবারের কাছে দেশের মানুষের সামনে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানান তিনি।

বিজেপি নেতার বক্তব্য, পঞ্জাবে নির্বাচনী জনসভা করতে আসা রাহুল গান্ধীর উচিত ১৯৮৪ সালের দাঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির প্রশ্নেরও জবাব দেওয়া।

সম্মেলনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে রাজীব গান্ধীর ১৯ নভেম্বর ১৯৮৪ সালের ভাষণের প্রসঙ্গ তোলেন রবিশঙ্কর প্রসাদ। ওই ভাষণেই রাজীব গান্ধী বলেছিলেন, যখন বড় গাছ পড়ে, তখন মাটি কেঁপে ওঠে।

তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর হত্যার পর দিল্লি-সহ বিভিন্ন এলাকায় সংঘটিত শিখবিরোধী হিংসার প্রেক্ষাপটে রাজীব গান্ধীর এই বক্তব্য দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্কের বিষয়।

রবিশঙ্কর প্রসাদের অভিযোগ, সেই সময় রাজীব গান্ধীর দেওয়া বক্তব্য হিংসাকে সমর্থন করার মতো ছিল। এই বিষয়ে কংগ্রেস নেতৃত্বের স্পষ্ট অবস্থান জানানো উচিত বলেও দাবি করেন তিনি।

প্রসাদ আরও জানান, অটলবিহারী বাজপেয়ীর সরকারের আমলে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী থাকাকালীন তিনি রাজীব গান্ধীর ওই ভাষণের রেকর্ডিং সরকারি নথিতে পুনরায় উপলব্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন।

বিজেপির বক্তব্য, ১৯৮৪ সালের ওই মন্তব্য এবং তার পরবর্তী ঘটনাগুলি ভুলে যাওয়া উচিত নয়।

সম্মেলনে ১৯৮৪ সালের দাঙ্গা সংক্রান্ত মামলাগুলির তদন্ত এবং আইনি পদক্ষেপে দীর্ঘসূত্রিতা নিয়েও কংগ্রেসকে আক্রমণ করেন রবিশঙ্কর প্রসাদ।

সজ্জন কুমার, জগদীশ টাইটলার এবং কমলনাথের নাম উল্লেখ করে তাঁর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে কংগ্রেস নিজেদের নেতাদের রাজনৈতিক সুরক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করেছে।

তবে এই নেতাদের সঙ্গে সম্পর্কিত মামলাগুলির আইনি অবস্থান এক নয়। ফলে কারও বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এবং আদালতে প্রমাণিত অপরাধের মধ্যে পার্থক্য রাখা প্রয়োজন।

১৯৮৪ সালের শিখবিরোধী দাঙ্গা নিয়ে কংগ্রেসকে আক্রমণ বিজেপির, রাহুলের কাছে ক্ষমা দাবি

রবিশঙ্কর প্রসাদ বলেন, কংগ্রেসের সরকারগুলি তদন্তের জন্য একাধিক কমিশন গঠন করলেও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির ন্যায়বিচার পেতে বহু বছর সময় লেগেছে।

তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকারের আমলে বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) গঠন এবং পুরনো মামলাগুলির পুনরায় তদন্তের বিষয়টিও উল্লেখ করেন। পাশাপাশি, ১৯৮৪ সালের দাঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্তদের হয়ে আইনি লড়াই চালানো প্রবীণ আইনজীবী এইচএস ফুলকার প্রচেষ্টার প্রশংসা করেন।

বুধবার পঞ্জাবের সঙ্গরুরে নির্বাচনী প্রচারে যান রাহুল গান্ধী। ২০২৭ সালের বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে সেখানে নিজেদের রাজনৈতিক প্রচার এগিয়ে নিয়ে যায় কংগ্রেস।

সঙ্গরুরের জনসভায় পঞ্জাবের বিভিন্ন সমস্যা, রাজ্য সরকারের জবাবদিহি এবং সাধারণ মানুষের বিষয়গুলিকে গুরুত্ব দেয় কংগ্রেস।

অন্যদিকে, একই দিনে চণ্ডীগড়ে ১৯৮৪ সালের দাঙ্গা নিয়ে সম্মেলনের আয়োজন করে বিজেপি। দুই দলের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে বিধানসভা নির্বাচনের আগে পঞ্জাবের রাজনীতিতে পৃথক ইস্যুতে আলোচনা শুরু হয়েছে।

কংগ্রেসের কর্মসূচির সময় নিয়েও প্রশ্ন তোলেন রবিশঙ্কর প্রসাদ। তাঁর বক্তব্য, নভেম্বর মাস শিখবিরোধী হিংসায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির কাছে বেদনাদায়ক স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত। তাই এই সময়ে কংগ্রেসের উচিত নিজেদের অতীতের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং বক্তব্য নিয়ে জবাব দেওয়া।

বিজেপির 'জখম ৮৪ দে' সম্মেলনের সূচনা হয় অরদাসের মাধ্যমে। এরপর ১৯৮৪ সালের ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন ছবি নিয়ে একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়।

প্রদর্শনীতে দিল্লির ত্রিলোকপুরী এলাকায় আগুনে পুড়ে যাওয়া বাড়ি, কনট প্লেসে অগ্নিসংযোগের শিকার দোকান এবং হিংসার কারণে বাড়িঘর ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হওয়া পরিবারগুলির ছবি তুলে ধরা হয়।

পঞ্জাব বিজেপির সভাপতি কেবল সিং ঢিলোঁ বলেন, ১৯৮৪ সালের হিংসার পর ৪০ বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও যেসব পরিবার তাঁদের প্রিয়জনদের হারিয়েছিল, তাদের পক্ষে সেই সময়ের স্মৃতি ভুলে যাওয়া এখনও কঠিন। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে ন্যায়বিচার দেওয়ার প্রশ্ন এখনও রয়ে গিয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীকেও আক্রমণ করেন ঢিলোঁ। তাঁর বক্তব্য, রাহুল গান্ধী পঞ্জাবে ন্যায়বিচারের কথা বললেও তাঁর পরিবারের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের সঙ্গে জড়িত প্রশ্নগুলিরও জবাব দেওয়া উচিত।

সম্মেলনে বিজেপির জাতীয় মুখপাত্র আরপি সিংও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ওই পরিবারগুলির ন্যায়বিচারের দাবিতে বিজেপি সরব থাকবে।

পঞ্জাবে বিধানসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক তৎপরতা ক্রমশ বাড়ছে। কংগ্রেস যখন নির্বাচনী প্রস্তুতিতে ব্যস্ত, তখন ১৯৮৪ সালের শিখবিরোধী হিংসা এবং সেই সংক্রান্ত মামলাগুলি নিয়ে কংগ্রেসকে প্রশ্ন করছে বিজেপি।

রবিশঙ্কর প্রসাদের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে রাহুল গান্ধী বা কংগ্রেসের তরফে কোনও সাম্প্রতিক প্রতিক্রিয়া সামনে এসেছে বলে জানা যায়নি।

 

Leave a comment