ভূত চতুর্দশীতে পালং-পুঁই নয়, খেতে হয় এই ১৪ রকম শাক! চিনে নিন নাম ও পরিচিত গুণাগুণ

কালীপুজোর আগে ভূত চতুর্দশীতে কোন ১৪ শাক খাওয়ার নিয়ম? ওল, বেতো, হিঞ্চে, নিম-সহ সম্পূর্ণ তালিকা ও প্রচলিত গুণাগুণ জেনে নিন।

কালীপুজো মানেই শুধু প্রদীপ জ্বালানো, আলোর সাজ আর মা কালীর আরাধনা নয়। বাঙালির ঘরে ঘরে এই উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ভূত চতুর্দশীতে ১৪ শাক খাওয়ার রীতিও। কিন্তু বাজারে গিয়ে অনেকেই ১৪ শাকের তালিকা নিয়ে বিভ্রান্ত হন। পালং, পুঁই কিংবা লালশাক কিনে ফেললেও সেগুলি প্রচলিত ১৪ শাকের তালিকার অংশ নয়। তাহলে কোন কোন শাক দিয়ে তৈরি হয় এই বিশেষ পদ? চলুন, চিনে নেওয়া যাক একে একে।

ভূত চতুর্দশীতে পালং-পুঁই নয়, খেতে হয় এই ১৪ রকম শাক! চিনে নিন নাম ও পরিচিত গুণাগুণ
কবে ভূত চতুর্দশী, কখন খেতে হবে ১৪ শাক?

কার্তিক মাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশী তিথিতে পালিত হয় ভূত চতুর্দশী। ২০২৬ সালের দৃক সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা অনুযায়ী, ৭ নভেম্বর শনিবার সকাল ১০টা ৪৭ মিনিটে শুরু হয়ে ৮ নভেম্বর রবিবার সকাল ১১টা ২৭ মিনিটে শেষ হবে এই তিথি। সেই হিসেবে ৭ ও ৮ নভেম্বর সকালে ১৪ শাক খাওয়ার রীতি পালন করা যেতে পারে। অন্যদিকে, ৭ নভেম্বর রাতে ১৪ প্রদীপ জ্বালানোর প্রচলন রয়েছে।

কোন ১৪ শাক কিনবেন? রইল সম্পূর্ণ তালিকা

প্রচলিত ১৪ শাকের তালিকায় রয়েছে বেশ কিছু এমন শাক, যেগুলি অনেকের কাছেই অপরিচিত। বাজারে কেনাকাটার আগে নামগুলি জেনে নিন।

ওল শাক: ওল গাছের পাতা ও ডাঁটা খাওয়ার প্রচলন রয়েছে। লোকজ ও আয়ুর্বেদীয় ধারণায় এই শাক হজমে সহায়ক এবং অরুচি কমাতে ব্যবহৃত হয়।

কেঁউ শাক: কেঁউ শাককে লোকজ চিকিৎসায় কৃমির সমস্যা, অরুচি ও কিছু চর্মসমস্যার ক্ষেত্রে ব্যবহার করার কথা বলা হয়।

বেতো শাক: বেতো শাক পরিচিত একটি দেশি শাক। লোকজ চিকিৎসায় হজমের সমস্যা, অরুচি এবং পাইলসের অস্বস্তির সঙ্গে এর ব্যবহার জড়িয়ে রয়েছে।

সর্ষে শাক: সর্ষে শাক পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ। এতে বিভিন্ন ভিটামিন, খনিজ ও ফাইবার থাকে। শীতের রান্নায় এই শাকের বিশেষ জনপ্রিয়তা রয়েছে।

কালকাসুন্দে পাতা: কালকাসুন্দে গাছের পাতা লোকজ চিকিৎসায় ত্বকের সমস্যা, কোষ্ঠকাঠিন্য এবং জ্বর-সর্দির মতো উপসর্গে ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে।

নিম পাতা: নিমপাতার তিক্ত স্বাদের সঙ্গে বাঙালি পরিচিত। লোকজ ও আয়ুর্বেদীয় ব্যবহারে ত্বক ও হজমের নানা সমস্যার ক্ষেত্রে নিমের উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে অতিরিক্ত নিমপাতা খাওয়া উচিত নয়।

ভূত চতুর্দশীতে পালং-পুঁই নয়, খেতে হয় এই ১৪ রকম শাক! চিনে নিন নাম ও পরিচিত গুণাগুণ
জয়ন্তী পাতা: জয়ন্তী গাছের পাতা লোকজ চিকিৎসায় সর্দি, নাক বন্ধ এবং মাথা ভার লাগার মতো সমস্যায় ব্যবহৃত হয় বলে প্রচলিত ধারণা রয়েছে।

শাঞ্চে শাক: সাঞ্চি বা মালঞ্চ নামেও পরিচিত এই শাক। এতে ফাইবার থাকে, যা হজমে সাহায্য করতে পারে। খাদ্যতালিকায় শাক হিসেবে এটি পুষ্টির জোগান দেয়।

হিঞ্চে শাক: হিলঞ্চ নামেও পরিচিত এই শাক। এতে বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান রয়েছে। প্রচলিত আয়ুর্বেদীয় ধারণায় একে ক্ষুধাবর্ধক ও রক্তশোধক হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

 পলতা পাতা: পটল গাছের পাতাকেই পলতা পাতা বলা হয়। এর তিক্ত স্বাদের কারণে লোকজ খাদ্যাভ্যাসে হজম ও অরুচির সমস্যায় ব্যবহারের কথা প্রচলিত।

 শৌলফ পাতা: লোকজ ও আয়ুর্বেদীয় ব্যবহারে শৌলফ পাতার উল্লেখ রয়েছে। পুরনো ক্ষত, জ্বর এবং কিছু সংক্রমণজনিত সমস্যায় এই পাতার ব্যবহার প্রচলিত বলে দাবি করা হয়।

 গুলঞ্চ শাক: গুলঞ্চ গাছের বিভিন্ন অংশ আয়ুর্বেদে ব্যবহৃত হয়। লোকজ ধারণায় ঋতু পরিবর্তনের সময়ে শরীরের সুস্থতা বজায় রাখা এবং নানা শারীরিক সমস্যায় এর ব্যবহার রয়েছে।

ভাট পাতা: ভাট গাছের পাতা লোকজ চিকিৎসায় ত্বকের সমস্যা, সর্দিকাশি, কৃমি এবং শরীরের ফোলাভাবের মতো উপসর্গে ব্যবহৃত হয় বলে প্রচলিত রয়েছে।

 শুষনি শাক: শুষনি শাক বাঙালির পরিচিত দেশি শাকগুলির মধ্যে অন্যতম। এতে বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান থাকে। লোকজ চিকিৎসায় ত্বকের সমস্যা, মাথাব্যথা ও মানসিক চাপের সঙ্গে এর ব্যবহারের উল্লেখ পাওয়া যায়।

ভূত চতুর্দশীতে পালং-পুঁই নয়, খেতে হয় এই ১৪ রকম শাক! চিনে নিন নাম ও পরিচিত গুণাগুণ
ঋতু পরিবর্তনে ১৪ শাক খাওয়ার রীতি কেন?

কার্তিক মাসে বর্ষার শেষ এবং শীতের শুরুর সময় প্রকৃতিতে পরিবর্তন দেখা যায়। এই সময়ে খাদ্যতালিকায় বিভিন্ন ধরনের শাক রাখার মধ্যে পুষ্টির বৈচিত্র্য পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। শাকপাতায় সাধারণত ফাইবার, ভিটামিন ও খনিজ থাকে, যা সুষম খাদ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ১৪ শাকের সম্মিলিত স্বাদে তিক্ততার প্রাধান্য থাকলেও, এই রীতির মূল আকর্ষণ বাঙালির ঐতিহ্য ও মরশুমি খাদ্যাভ্যাস।

শাক কেনার সময় কী কী বিষয়ে সতর্ক থাকবেন?

১৪ শাক কিনতে গেলে শুধু নাম জানলেই হবে না, সঠিক গাছের পাতা চিনে কেনাও জরুরি। অপরিচিত পাতা বা বুনো শাক নিজে থেকে সংগ্রহ করে খাবেন না। বিশ্বস্ত বিক্রেতার কাছ থেকে শাক কিনুন এবং রান্নার আগে ভালোভাবে পরিষ্কার জল দিয়ে ধুয়ে নিন। বিশেষ করে নিম, গুলঞ্চ বা অন্য ভেষজ পাতাকে কোনও রোগের ওষুধ ভেবে অতিরিক্ত খাবেন না।

ভূত চতুর্দশীতে পালং-পুঁই নয়, খেতে হয় এই ১৪ রকম শাক! চিনে নিন নাম ও পরিচিত গুণাগুণ
কালীপুজোর আগে ভূত চতুর্দশীতে ১৪ শাক খাওয়ার প্রথা বাঙালি সংস্কৃতির বহু পুরনো ঐতিহ্য। তবে এই তালিকায় পালং, পুঁই বা নটে শাকের মতো পরিচিত শাক থাকে না। ওল, বেতো, সর্ষে, নিম, হিঞ্চে-সহ নির্দিষ্ট ১৪ ধরনের শাকের উল্লেখ পাওয়া যায় প্রচলিত রীতিতে। ঋতু পরিবর্তনের সময়ে নানা ধরনের শাক খাওয়ার এই প্রথার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে খাদ্যাভ্যাস ও লোকজ বিশ্বাস।

Leave a comment