ন্যাশনাল স্ট্রেস অ্যাওয়ারনেস ডে ২০২৬: মানসিক চাপের লক্ষণ, কারণ ও মোকাবিলার উপায়

৪ নভেম্বর পালিত হচ্ছে ন্যাশনাল স্ট্রেস অ্যাওয়ারনেস ডে ২০২৬। জেনে নিন মানসিক চাপের সাধারণ লক্ষণ, এর বিভিন্ন কারণ এবং দৈনন্দিন জীবনে মানসিক চাপ কমানোর উপায়।

সকাল থেকে রাত পর্যন্ত নানা চিন্তা মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। কারও অফিসের কাজ শেষ করার তাড়া, কারও সংসারের খরচ নিয়ে দুশ্চিন্তা। আবার সন্তানদের পড়াশোনা এবং পারিবারিক দায়িত্বও অনেক সময় মানসিক চাপ বাড়িয়ে দেয়। সামান্য উদ্বেগ স্বাভাবিক হলেও কোনও বিষয় নিয়ে সারাদিন অস্থির থাকা এবং রাতে ঘুমের সমস্যা দেখা দিলে তা অবহেলা করা উচিত নয়। দীর্ঘদিন ধরে মানসিক চাপ চলতে থাকলে ঘুম ও স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব পড়তে পারে।

মানসিক চাপের কারণ, লক্ষণ এবং তা মোকাবিলার উপায় সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে প্রতিবছর নভেম্বর মাসের প্রথম বুধবার ন্যাশনাল স্ট্রেস অ্যাওয়ারনেস ডে পালন করা হয়।

২০২৬ সালের নভেম্বর মাসের প্রথম বুধবার ৪ নভেম্বর। সেই অনুযায়ী এদিন পালন করা হচ্ছে ন্যাশনাল স্ট্রেস অ্যাওয়ারনেস ডে। বিশেষ করে যাঁরা নানা কারণে মানসিক চাপে থাকেন, অথচ নিজেদের সমস্যার কথা অন্যদের জানাতে পারেন না, তাঁদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোই এই দিনের অন্যতম উদ্দেশ্য। পাশাপাশি মানসিক চাপের লক্ষণ এবং তা মোকাবিলার বিভিন্ন উপায় সম্পর্কেও মানুষকে জানানো হয়।

পরীক্ষা এগিয়ে এলে অনেক পড়ুয়ার ঘুমের সমস্যা দেখা দেয়। কেউ পরীক্ষায় ভালো নম্বর না পাওয়ার আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন থাকে, আবার কেউ চাকরির ইন্টারভিউ নিয়ে চিন্তায় থাকে। সংসারের খরচ, অফিসের কাজ এবং পারিবারিক দায়িত্বও উদ্বেগের কারণ হতে পারে। তবে প্রতিটি ক্ষেত্রে এই অস্থিরতা যে বড় কোনও সমস্যার লক্ষণ, এমনটা নয়। অনেকের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কাজ শেষ হয়ে গেলে উদ্বেগও ধীরে ধীরে কমে যায়।

কিন্তু কিছু মানুষের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আলাদা। কাজ শেষ হওয়ার পরেও একই বিষয় নিয়ে চিন্তা চলতে থাকে। রাতে বিছানায় যাওয়ার পরেও ঘুম আসে না। সকালে ঘুম থেকে উঠেই নতুন করে দুশ্চিন্তা শুরু হয়। এর প্রভাব পড়তে পারে ব্যক্তির আচরণেও। আগে যে কাজগুলি সহজেই করতে পারতেন, সেগুলির প্রতিও আগ্রহ কমে যেতে পারে। সামান্য বিষয়েও রাগ হতে পারে এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথাবার্তাও কমে যেতে পারে।

ন্যাশনাল স্ট্রেস অ্যাওয়ারনেস ডে পালনের অন্যতম উদ্দেশ্য হল, মানুষ যাতে নিজেদের সমস্যা লুকিয়ে না রেখে তা নিয়ে কথা বলতে পারেন। অনেকেই মনে করেন, কয়েক দিনের মধ্যেই সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যাবে। কিন্তু উদ্বেগের কারণে ঘুম, কাজকর্ম এবং পারিবারিক জীবন প্রভাবিত হতে শুরু করলে চিকিৎসক বা কাউন্সেলরের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

মানসিক চাপের লক্ষণ প্রত্যেকের ক্ষেত্রে একরকম হয় না। কিছু মানুষের মধ্যে সহজেই বিরক্ত হয়ে পড়ার প্রবণতা দেখা যায়। সামান্য বিষয়েও রাগ হতে পারে এবং কোনও কাজে মন বসতে চায় না। আবার অনেকের রাতে ঘুম আসতে সমস্যা হয়।

কিছু মানুষের বারবার মাথাব্যথা হতে পারে। বেশি কাজ না করলেও সারাদিন ক্লান্তি অনুভূত হতে পারে। ঘাড় ও কাঁধে টান ধরার পাশাপাশি পেটের সমস্যাও দেখা দিতে পারে।

মানসিক চাপের প্রভাব পড়তে পারে খাওয়ার অভ্যাসেও। কারও খাওয়ার ইচ্ছা কমে যায়, আবার কেউ উদ্বিগ্ন থাকলে বারবার কিছু খেতে চান।

এছাড়া অনেকেই অন্যদের সঙ্গে কথাবার্তা কমিয়ে দেন। বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করার আগ্রহ কমে যায়। আগে যে কাজগুলি করতে ভালো লাগত, সেগুলির প্রতিও আগ্রহ হারিয়ে যেতে পারে।

তবে মাথাব্যথা, ক্লান্তি কিংবা ঘুমের সমস্যার পিছনে অন্য শারীরিক অসুস্থতাও থাকতে পারে। তাই পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া প্রতিটি উপসর্গকে মানসিক চাপের সঙ্গে যুক্ত করা ঠিক নয়।

ন্যাশনাল স্ট্রেস অ্যাওয়ারনেস ডে ২০২৬: মানসিক চাপের লক্ষণ, কারণ ও মোকাবিলার উপায়

পারিবারিক এবং কর্মক্ষেত্রের বিভিন্ন সমস্যা অনেক সময় একসঙ্গে দেখা দেয়। চাকরিজীবীদের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার চাপ থাকতে পারে। অন্যদিকে, ব্যবসায়ীদের আয়, খরচ এবং সম্ভাব্য ক্ষতি নিয়ে দুশ্চিন্তা হতে পারে।

পড়ুয়াদের ক্ষেত্রেও পরীক্ষার সময় মানসিক চাপ বাড়তে পারে। ভালো নম্বর পাওয়ার চাপ এবং পরিবারের প্রত্যাশা অনেক সময় তাঁদের উদ্বেগ বাড়িয়ে দেয়।

পরিবারের কোনও সদস্যের অসুস্থতা, আর্থিক অভাব কিংবা সম্পর্কের মধ্যে মতবিরোধও মানসিক অস্থিরতার কারণ হতে পারে। কিছু মানুষের মধ্যে চাকরি হারানোর আশঙ্কা অথবা ভবিষ্যৎ নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগ দেখা যায়।

বর্তমানে অনেকেই মোবাইল ফোনে দীর্ঘ সময় কাটান। সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যদের ছবি ও জীবনযাপন দেখে কেউ কেউ নিজেদের সঙ্গে তাঁদের তুলনা করতে শুরু করেন। এর ফলেও মানসিক অস্বস্তি বাড়তে পারে।

এছাড়া প্রিয়জনকে হারানো কিংবা জীবনে হঠাৎ বড় কোনও পরিবর্তন আসার কারণেও মানসিক চাপ তৈরি হতে পারে। একটি বিষয় যে একজনকে যতটা উদ্বিগ্ন করে, অন্য ব্যক্তির ক্ষেত্রে তার প্রভাব একই রকম নাও হতে পারে।

কোনও বিষয় নিয়ে বারবার উদ্বেগ তৈরি হলে দৈনন্দিন অভ্যাসে কিছু পরিবর্তন আনার চেষ্টা করা যেতে পারে। প্রথমেই ঘুমাতে যাওয়া এবং ঘুম থেকে ওঠার নির্দিষ্ট সময় ঠিক করা জরুরি। অনেকেই রাতে দেরি করে ঘুমাতে যান এবং সকালে তাড়াতাড়ি উঠে পড়েন। এর ফলে পর্যাপ্ত ঘুম হয় না এবং পরের দিনও ক্লান্তি থেকে যায়। তাই রাতে পর্যাপ্ত ঘুম এবং শরীরকে বিশ্রাম দেওয়ার দিকে নজর দেওয়া উচিত।

সারাদিন বাড়ি কিংবা অফিসে বসে থাকার পরিবর্তে কিছুটা সময় বাইরে হাঁটাহাঁটি করা যেতে পারে। সকাল অথবা সন্ধ্যায় নিজের সুবিধামতো হাঁটার অভ্যাস গড়ে তোলা যায়। যাঁরা যোগব্যায়াম করতে পছন্দ করেন, তাঁরাও এর জন্য সময় বের করতে পারেন। শরীরচর্চা ছাড়াও বাগান করা, গান শোনা কিংবা পছন্দের অন্য কোনও কাজে সময় কাটানো মানসিক অস্বস্তি কমাতে সাহায্য করতে পারে।

অফিসে দীর্ঘ সময় কম্পিউটারের সামনে বসে কাজ করেন যাঁরা, তাঁদেরও বিশ্রামের দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। একটানা কাজ করলে ক্লান্তি বাড়তে পারে। তাই কাজের মাঝে কিছুক্ষণের জন্য চেয়ার থেকে উঠে হাঁটাহাঁটি করা যেতে পারে। একসঙ্গে অনেক কাজ থাকলে প্রথমে জরুরি কাজগুলি শেষ করার চেষ্টা করা উচিত। সব কাজ একই দিনে শেষ করার অতিরিক্ত চাপ নেওয়া থেকে বিরত থাকা দরকার।

অনেকেই নিজেদের সমস্যার কথা অন্য কাউকে জানান না। তাঁদের মনে হয়, পরিবারের সদস্য বা বন্ধুদের জানিয়েই বা কী লাভ হবে। তবে কাছের কোনও মানুষের সঙ্গে খোলাখুলি কথা বললে মানসিক চাপ কিছুটা কমতে পারে। কোনও বিষয় দীর্ঘদিন ধরে অস্বস্তির কারণ হলে পরিবারের সদস্য অথবা ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সঙ্গে তা ভাগ করে নেওয়া যেতে পারে।

মানসিক চাপ অনুভব করলে কিছুক্ষণ শান্ত পরিবেশে বসে ধীরে ধীরে শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করা যেতে পারে। অনেকের ক্ষেত্রে এতে স্বস্তি মেলে। পাশাপাশি রাতে মোবাইল ফোনে অতিরিক্ত সময় কাটানো এড়িয়ে চলা উচিত। সারাদিনে একাধিক কাপ চা বা কফি পান করার অভ্যাস থাকলে তার পরিমাণও কমানো যেতে পারে। বিশেষ করে ঘুমাতে যাওয়ার আগে চা-কফি পান করলে ঘুমের ওপর প্রভাব পড়তে পারে।

 

Leave a comment