৮ সেপ্টেম্বর আশা ভোঁসলের জন্মবার্ষিকী। ২০২৬ সালের এই জন্মদিনটি বিশেষভাবে আবেগঘন, কারণ চলতি বছরের ১২ এপ্রিল ৯২ বছর বয়সে প্রয়াত হয়েছেন কিংবদন্তি গায়িকা। তাঁর দীর্ঘ সঙ্গীতজীবনের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনও ছিল নানা ঘটনা ও বাঁকে ভরা। প্রথম বিয়ে, তিন সন্তান, জীবনের কঠিন সময় পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত সুরকার আর. ডি. বর্মণের সঙ্গে তৈরি হয় তাঁর গভীর সম্পর্ক। পঞ্চম দার সঙ্গে তাঁর প্রেম ও দাম্পত্যের গল্প আজও সঙ্গীতপ্রেমীদের আগ্রহের বিষয়।
ছোট বয়স থেকেই সঙ্গীতই ছিল আশার ভরসা
১৯৩৩ সালের ৮ সেপ্টেম্বর মহারাষ্ট্রের সাংলি রাজ্যের গোয়ার এলাকায় জন্ম আশা ভোঁসলের। পরিবারে সঙ্গীতের পরিবেশ থাকলেও শৈশব মোটেই সহজ ছিল না। বাবার মৃত্যুর পর সংসারের দায়িত্বের চাপ এসে পড়ে পরিবারের উপর। খুব অল্প বয়সেই গানকে পেশা হিসেবে নিতে হয় তাঁকে।চলচ্চিত্রে গান গাওয়ার মাধ্যমে শুরু হয় তাঁর পেশাগত যাত্রা। ধীরে ধীরে নিজের প্রতিভা এবং পরিশ্রমের জোরে তিনি হিন্দি ছবির অন্যতম জনপ্রিয় প্লেব্যাক গায়িকা হয়ে ওঠেন।
শুরুতে সাফল্যের পথ ছিল কঠিন
ক্যারিয়ারের প্রথম দিকে আশাকে নিজের আলাদা পরিচয় তৈরি করতে যথেষ্ট লড়াই করতে হয়েছিল। সেই সময়ে চলচ্চিত্রের সঙ্গীত জগতে একাধিক প্রতিষ্ঠিত কণ্ঠের দাপট ছিল। লতা মঙ্গেশকরের বিপুল জনপ্রিয়তার মধ্যেও নিজের জায়গা তৈরি করতে পিছপা হননি আশা।স্বল্প বাজেটের ছবিতে গান গাওয়া থেকে শুরু করে নানা ধরনের সঙ্গীতে নিজেকে মেলে ধরেন তিনি। ক্যাবারে থেকে পপ, লোকসঙ্গীত থেকে গজল কিংবা ভজন—বিভিন্ন ধারায় তাঁর কণ্ঠের অনন্য উপস্থিতি তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে দেয়।
প্রথম বিয়ে, তিন সন্তান—ব্যক্তিগত জীবনেও ছিল ঝড়
কর্মজীবনের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনেও একাধিক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন আশা ভোঁসলে। অল্প বয়সেই গণপতরাও ভোঁসলের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। এই দাম্পত্যে তাঁদের তিন সন্তানও জন্ম নেয়।তবে সেই সম্পর্ক শেষ পর্যন্ত টেকেনি। দাম্পত্য ভেঙে যাওয়ার পর সন্তানদের দায়িত্ব সামলে ফের নিজের জীবন ও কেরিয়ারকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হয় তাঁকে। কঠিন সময়েও গানই হয়ে ওঠে তাঁর অন্যতম প্রধান শক্তি।
সঙ্গীতের সূত্রেই পঞ্চম দার সঙ্গে আলাপ
আশা ভোঁসলের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় আর. ডি. বর্মণের সঙ্গে পরিচয়ের পর। সঙ্গীতের সূত্রেই তাঁদের আলাপ। একটি পুরনো সাক্ষাৎকারে আশা জানিয়েছিলেন, প্রথমদিকে পঞ্চম দাকে দেখতে ছিলেন অত্যন্ত তরুণ, রোগা এবং মোটা চশমা পরা একজন মানুষ।প্রথম সাক্ষাতেই পঞ্চম দা তাঁর কাছে অটোগ্রাফ চেয়েছিলেন। তিনি জানিয়েছিলেন, রেডিওতে আশার মারাঠি থিয়েটারের গান শুনেছিলেন। সেই পরিচয় থেকেই ধীরে ধীরে তাঁদের মধ্যে বন্ধুত্ব তৈরি হয়।
পড়াশোনা নিয়ে মতের অমিল, তারপরই বাড়তে থাকে ঘনিষ্ঠতা
আশা জানতে পারেন, পঞ্চম দা কলকাতায় পড়াশোনা মাঝপথে ছেড়ে দিয়েছিলেন। বিষয়টি জানার পর তিনি তাঁকে পড়াশোনা শেষ করার পরামর্শ দেন। কিন্তু সেই পরামর্শ পঞ্চম দার খুব একটা ভালো লাগেনি। রেকর্ডিংয়ের সময়ও তাঁর বিরক্তির প্রকাশ ঘটেছিল বলে পুরনো সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে।তবে সেই ছোটখাটো মতবিরোধ তাঁদের সম্পর্ককে থামাতে পারেনি। বরং সময়ের সঙ্গে তাঁরা একে অপরকে আরও গভীরভাবে জানতে শুরু করেন।
পঞ্চম দার কাছে সঙ্গীতই ছিল সবার আগে
আশা ভোঁসলের কথায়, আর. ডি. বর্মণ সঙ্গীত নিয়ে অত্যন্ত আবেগপ্রবণ ছিলেন। তাঁর চিন্তাভাবনার বড় অংশ জুড়েই থাকত সুর, রেকর্ডিং এবং বাদ্যযন্ত্র।নিজের আরাম বা অন্যান্য প্রয়োজনের তুলনায় সঙ্গীতের যন্ত্রপাতি ও কাজকেই বেশি গুরুত্ব দিতেন পঞ্চম দা। তাঁর এই স্বভাব ধীরে ধীরে বুঝতে পারেন আশা। আর সেখান থেকেই দু'জনের সম্পর্ক আরও গভীর হয়ে ওঠে।
১৯৮০ সালে বিয়ে, তারপর তৈরি হয় এক ঐতিহাসিক জুটি
দীর্ঘ পরিচয় ও সম্পর্কের পর ১৯৮০ সালে বিয়ে করেন আশা ভোঁসলে এবং আর. ডি. বর্মণ। তাঁদের ব্যক্তিগত সম্পর্কের পাশাপাশি পেশাগত জুটিও হয়ে ওঠে অত্যন্ত জনপ্রিয়।পঞ্চম দার সুর এবং আশার কণ্ঠ একসঙ্গে তৈরি করেছে একের পর এক স্মরণীয় গান। ‘পিয়া তু আব তো আজা’, ‘দম মারো দম’, ‘আজা আজা মে হুঁ প্যার তেরা’ এবং ‘চুরা লিয়া হ্যায় তুমনে’-এর মতো গান তাঁদের সৃষ্টিশীল যুগলবন্দির জনপ্রিয়তার উদাহরণ।
জন্মদিনে ঝাড়ু উপহার! পঞ্চম দার রসিকতায় অবাক আশা
আশা-পঞ্চমের সম্পর্কের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি মজার গল্প আজও আলোচিত হয়। শোনা যায়, জন্মদিনে আশা ভোঁসলেকে ঝাড়ু উপহার দিয়েছিলেন পঞ্চম দা।এর পিছনেও ছিল তাঁর রসিকতা। আশার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস নিয়ে মজা করতেই নাকি এমন উপহার দিয়েছিলেন তিনি। শুধু ঝাড়ু নয়, তার সঙ্গে মাছও উপহার দিয়েছিলেন বলে পুরনো সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন আশা। রান্না ও ঘরদোর পরিষ্কার রাখার প্রতি তাঁর আগ্রহকে পঞ্চম দা নিজের রসবোধ দিয়ে এভাবেই বিশেষ করে তুলেছিলেন।
সঙ্গীতজীবনে একের পর এক সম্মান
দীর্ঘ কয়েক দশকের সঙ্গীতজীবনে আশা ভোঁসলের ঝুলিতে জমেছে অসংখ্য সম্মান। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার থেকে শুরু করে দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার—ভারতীয় সঙ্গীতে তাঁর অবদানের স্বীকৃতি মিলেছে একাধিক ক্ষেত্রে।২০০৮ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মবিভূষণে সম্মানিত করে। ফিল্মফেয়ার-সহ বহু পুরস্কারও পেয়েছেন তিনি। শুধু ভারতেই নয়, আন্তর্জাতিক স্তরেও তাঁর কণ্ঠের জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়েছিল।
৯২ বছর বয়সে থামল কিংবদন্তির কণ্ঠ
২০২৬ সালের ১২ এপ্রিল মুম্বইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে ৯২ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন আশা ভোঁসলে। তাঁর প্রয়াণে ভারতীয় সঙ্গীত জগতে নেমে আসে গভীর শোক।তবে তাঁর গান, কণ্ঠ এবং সঙ্গীতজীবনের অসংখ্য স্মৃতি তাঁকে শ্রোতাদের মনে চিরকাল বাঁচিয়ে রাখবে। আর. ডি. বর্মণের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কও ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায় হয়ে থাকবে।
লতা মঙ্গেশকরের বোন হিসেবেই শুধু নয়, নিজের অসাধারণ কণ্ঠ ও বহুমুখী গানের জন্য ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাসে স্বতন্ত্র জায়গা করে নিয়েছিলেন আশা ভোঁসলে। জীবনের নানা ওঠাপড়ার মধ্যেই তাঁর জীবনে এসেছিলেন সুরকার আর. ডি. বর্মণ, অর্থাৎ পঞ্চম দা। বন্ধুত্ব থেকে তৈরি হয়েছিল ভালোবাসা, আর ১৯৮০ সালে সেই সম্পর্ক পরিণতি পায় বিয়েতে। তাঁদের সম্পর্কের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বহু মজার ও আবেগঘন কাহিনি।









