স্বপ্ন ভেঙেছিল নিজের, কিন্তু অন্যের স্বপ্ন গড়ার লড়াই থামাননি। বাঁকুড়ার ছাতনা ব্লকের দুমদুমি গ্রামের বাসিন্দা ভারতী মুদি গত ১৬ বছর ধরে কোনও পারিশ্রমিক ছাড়াই আদিবাসী কিশোরীদের ফুটবল প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। সীমিত সামর্থ্য, আর্থিক অনটন আর সামাজিক বাধা পেরিয়ে তাঁর এই উদ্যোগ আজ বহু মেয়ের জীবনে নতুন দিশা দেখাচ্ছে।
অপূর্ণ স্বপ্ন থেকেই শুরু নতুন পথচলা
ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলার প্রতি গভীর আগ্রহ ছিল ভারতী মুদির। অ্যাথলেটিক্সে দক্ষ হলেও ফুটবলার হওয়ার ইচ্ছা পূরণ হয়নি সংসারের দায়িত্ব ও আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে। তবে সেই স্বপ্নকে বিসর্জন না দিয়ে তিনি সিদ্ধান্ত নেন, গ্রামের মেয়েদের ফুটবলের সুযোগ করে দেবেন।২০০৯ সালে মেয়ে তানিয়া মুদির উৎসাহ এবং স্বামীর সহযোগিতায় শুরু হয় একটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যের ফুটবল প্রশিক্ষণ কেন্দ্র।
১৬ বছর ধরে এক টাকাও নেননি
প্রায় দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে কোনও পারিশ্রমিক ছাড়াই নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিয়ে চলেছেন ভারতী মুদি। বর্তমানে প্রায় ২৫ জন আদিবাসী কিশোরী তাঁর কাছে ফুটবলের কৌশল শিখছে।এই দীর্ঘ যাত্রায় তাঁর প্রশিক্ষণে তৈরি অন্তত ১৮ জন ফুটবলার রাজ্যস্তরে খেলেছেন। অনেকে আবার জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় গোয়া, চণ্ডীগড় ও ভোপালের মতো শহরেও নিজেদের দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন।
মেয়েই আজ সফল ফুটবল রেফারি
ভারতী মুদির নিজের মেয়ে তানিয়া মুদিও মায়ের কাছ থেকেই ফুটবলের প্রথম পাঠ নিয়েছিলেন। বর্তমানে তিনি একজন ফুটবল রেফারি হিসেবে নিজের পরিচয় তৈরি করেছেন। মেয়ের এই সাফল্য ভারতী মুদির দীর্ঘ পরিশ্রমের অন্যতম বড় স্বীকৃতি।
অনটনের মধ্যেও থামেনি লড়াই
এই প্রশিক্ষণ কেন্দ্র চালাতে গিয়ে প্রতিনিয়ত আর্থিক সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় ভারতী মুদিকে। ফুটবল, বুট, জার্সি-সহ অধিকাংশ সরঞ্জামই নিজের উদ্যোগে সংগ্রহ করেন তিনি। এই কাজে তাঁর সবচেয়ে বড় ভরসা স্বামী, যিনি আর্থিকভাবে সবসময় পাশে থেকেছেন।কোনও সরকারি অনুদান ছাড়াই শুধুমাত্র ইচ্ছাশক্তি ও নিষ্ঠার জোরে এগিয়ে চলেছে এই ফুটবল প্রশিক্ষণ কেন্দ্র।
ফুটবলই মেয়েদের আত্মনির্ভরতার পথ
ভারতী মুদির বিশ্বাস, ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়, বরং প্রান্তিক এলাকার মেয়েদের আত্মনির্ভরশীল হওয়ার অন্যতম মাধ্যম। তাঁর প্রশিক্ষণে গড়ে ওঠা একাধিক ফুটবলার ইতিমধ্যেই সরকারি চাকরির সুযোগ পেয়েছেন।এখন তাঁর একটাই লক্ষ্য—এই প্রত্যন্ত এলাকার কোনও এক কিশোরী একদিন ভারতের জার্সি পরে আন্তর্জাতিক মঞ্চে দেশের প্রতিনিধিত্ব করবে।
ফ্যানভাত খেয়েও অনুশীলন ছাড়েননি
প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ফুটবলার মাম্পি বাউরির কথায়, তাঁদের কাছে ভারতী মুদি শুধু কোচ নন, ‘বড়মা’। চরম আর্থিক অভাবের মধ্যেও অনেকদিন শুধু ফ্যানভাত খেয়েই তাঁরা মাঠে নেমেছেন। কিন্তু ভারতী মুদির অনুপ্রেরণায় কখনও অনুশীলন বন্ধ করেননি।
সংসারের চাপে নিজের ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হয়নি। কিন্তু সেই স্বপ্নই অন্যদের চোখে বাঁচিয়ে রেখেছেন বাঁকুড়ার আদিবাসী গৃহবধূ ভারতী মুদি। ২০০৯ সাল থেকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে গ্রামের মেয়েদের ফুটবল প্রশিক্ষণ দিয়ে তৈরি করেছেন বহু রাজ্য ও জাতীয় স্তরের খেলোয়াড়।










