দশমী পেরিয়ে গেলেই যখন বাংলার অধিকাংশ মণ্ডপে বিসর্জনের সুর, তখন উত্তরবঙ্গের ডুয়ার্সে আরও এক দিন উৎসবের আবহ। তিস্তাপারের বার্নিশ গ্রামে একাদশী তিথিতে পূজিত হন দেবী ভাণ্ডানি। কেন এখানে দশমীতেই মায়ের বিদায় হয় না? কেনই বা দুর্গার এই বিশেষ রূপকে ঘিরে কৃষিজীবী মানুষের এত ভক্তি? প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা লোককথা, কৃষিসংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের মেলবন্ধনেই আজও স্বতন্ত্র বার্নিশের ভাণ্ডানি উৎসব।
![]()
দশমীর পরেও উৎসবের রেশ, একাদশীতে ভাণ্ডানি পুজো
জলপাইগুড়ি জেলার ময়নাগুড়ির তিস্তাপার সংলগ্ন বার্নিশ গ্রামে প্রতি বছর একাদশী তিথিতে আয়োজিত হয় প্রাচীন ভাণ্ডানি পুজো। ডুয়ার্সের প্রাচীনতম ভাণ্ডানি পুজোগুলির মধ্যে এই পুজো অন্যতম। স্থানীয় ঐতিহ্য অনুযায়ী, এর বয়স প্রায় ৫০০ বছরেরও বেশি।২০২৬ সালেও সেই প্রথা মেনেই বৃহস্পতিবার ভোর থেকে মন্দিরে পুজো শুরু হয়। সকাল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভক্তদের ভিড় বাড়তে থাকে। শুধু জলপাইগুড়ি নয়, কোচবিহার ও আলিপুরদুয়ার-সহ উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ দেবী দর্শনে হাজির হন।
কেন কৈলাসে ফেরার আগে আরও এক দিন মর্ত্যে থাকেন দেবী?
দেবী ভাণ্ডানিকে ঘিরে বার্নিশ ও আশপাশের এলাকায় প্রচলিত রয়েছে একাধিক লোককথা। স্থানীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, বিজয়া দশমীতে কৈলাসে ফিরে যাওয়ার সময় তিস্তাপারের কৃষকরা দেবীর কাছে তাঁদের দুঃখ-দুর্দশার কথা জানিয়ে প্রার্থনা করেছিলেন।কৃষকদের অনুরোধে সাড়া দিয়ে দেবী আরও এক দিন মর্ত্যে অবস্থান করতে রাজি হন বলে লোকবিশ্বাস। সেই সময় তিনি কৃষকদের ফসল ও শস্যভাণ্ডার রক্ষার আশ্বাস দিয়েছিলেন বলেও কথিত রয়েছে।এই কাহিনি ঘিরেই দশমীর পর একাদশী তিথিতে দেবী ভাণ্ডানির পুজোর রীতি চলে আসছে। তবে এটি স্থানীয় লোকবিশ্বাস ও প্রজন্মান্তরে প্রচলিত কাহিনির অংশ, যার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এলাকার নিজস্ব সংস্কৃতি।
![]()
শস্যভাণ্ডারের রক্ষাকর্ত্রী বলেই কি নাম ‘ভাণ্ডানি’?
ডুয়ার্সের বহু মানুষের জীবিকা কৃষির সঙ্গে যুক্ত। ফসলের ফলন, খাদ্যের জোগান এবং কৃষকের পরিবারের মঙ্গল—সবই তাঁদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই দেবী ভাণ্ডানিকে ঘিরে থাকা শস্যভাণ্ডার রক্ষার বিশ্বাস স্থানীয় মানুষের কাছে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।লোককথা অনুযায়ী, কৃষকদের অন্ন ও ফসলের ভাণ্ডার রক্ষার আশ্বাস থেকেই দেবীর নাম হয়েছে ‘ভাণ্ডানি’। এই বিশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কৃষিজীবী সমাজের আশা, ভরসা ও ভক্তি। ফলে এই পুজো কেবল ধর্মীয় আচার নয়, বরং এলাকার কৃষিনির্ভর জীবনযাত্রা ও লোকসংস্কৃতিরও গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক।
![]()
পুজো ঘিরে বসে ঐতিহ্যবাহী মেলা, ভিড় সামলাতে তৎপর প্রশাসন
ভাণ্ডানি পুজোকে কেন্দ্র করে বার্নিশে বসে ঐতিহ্যবাহী মেলা। মন্দির সংলগ্ন এলাকায় গ্রামীণ সামগ্রী ও খাবারের দোকান সাজিয়ে বসেন ব্যবসায়ীরা। পুজো উপলক্ষে স্থানীয় বাজার ও আশপাশের এলাকাতেও উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে।বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দর্শনার্থীদের ভিড় এতটাই বেড়ে যায় যে পরিস্থিতি সামলাতে পুলিশ প্রশাসনকে তৎপর থাকতে হয়। পুজো কমিটির সূত্রে জানা যায়, দূরদূরান্ত থেকে বহু মানুষ এখানে আসেন। অনেকে মনস্কামনা পূরণের আশায় দেবী ভাণ্ডানির কাছে পুজো দিতেও হাজির হন।
উত্তরবঙ্গের লোকসংস্কৃতির অনন্য পরিচয়
বাংলার দুর্গাপুজোর রীতি অঞ্চলভেদে নানা বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ। বার্নিশের ভাণ্ডানি উৎসব তারই একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। যেখানে দশমী সাধারণত বিসর্জনের দিন, সেখানে এই অঞ্চলে একাদশীতেও দেবী আরাধনার মধ্য দিয়ে উৎসবের আবহ বজায় থাকে।প্রায় পাঁচ শতাব্দী ধরে চলে আসা এই প্রথা স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস, কৃষিজীবন এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে মিশে গিয়েছে। সময় বদলালেও সেই ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছেন এলাকার বাসিন্দারা।
![]()
বিজয়া দশমীতে বাংলার অধিকাংশ জায়গায় দেবী দুর্গার বিসর্জন হলেও উত্তরবঙ্গের ডুয়ার্সের জলপাইগুড়ির বার্নিশে ছবিটা আলাদা। এখানে একাদশী তিথিতে ধুমধাম করে পালিত হয় ঐতিহ্যবাহী ভাণ্ডানি পুজো ও মেলা। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, কৈলাসে ফেরার পথে তিস্তাপারের কৃষকদের প্রার্থনায় সাড়া দিয়ে দেবী আরও এক দিন মর্ত্যে থেকে গিয়েছিলেন। কৃষকের শস্যভাণ্ডার রক্ষার আশ্বাস থেকেই দেবীর নাম হয়েছে ‘ভাণ্ডানি’। প্রায় ৫০০ বছরের পুরনো এই উৎসব ঘিরে জলপাইগুড়ি, কোচবিহার ও আলিপুরদুয়ার-সহ বিভিন্ন এলাকা থেকে ভক্তদের সমাগম হয়।










