হাজার হাজার ভুয়ো বার্থ সার্টিফিকেটের অভিযোগ! রাজ্যজুড়ে শুরু ভেরিফিকেশন, কীভাবে হবে নথি পরীক্ষা?

ভুয়ো জন্ম ও মৃত্যু শংসাপত্রের অভিযোগে রাজ্যজুড়ে শুরু ভেরিফিকেশন অভিযান। পুরসভা-পঞ্চায়েতের রেজিস্টার স্ক্যান থেকে বাড়ি বাড়ি নথি যাচাই—জেনে নিন কীভাবে হবে পুরো প্রক্রিয়া।

ভুয়ো জন্ম ও মৃত্যু শংসাপত্র নিয়ে এবার কড়া পদক্ষেপের পথে রাজ্য সরকার। বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই রাজ্যজুড়ে শুরু হয়েছে জন্ম-মৃত্যু নথির বিশেষ ভেরিফিকেশন অভিযান। পুরসভা থেকে পঞ্চায়েত—বিভিন্ন স্তরে সংরক্ষিত রেজিস্টার ও নথি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এই অভিযান নিয়ে সাংবাদিক বৈঠকে মুখ্যসচিব জানান, রাজ্যের সমস্ত বার্থ ও ডেথ সার্টিফিকেটের তথ্য যাচাই করা হবে। তবে সাধারণ মানুষকে অযথা আতঙ্কিত না হওয়ার বার্তাও দেওয়া হয়েছে।

কেন শুরু হল এই ভেরিফিকেশন?

জন্ম ও মৃত্যু শংসাপত্র সরকারি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নথির ক্ষেত্রে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। আধার, প্যান-সহ একাধিক সরকারি পরিষেবা ও নথিপত্র তৈরির ক্ষেত্রে জন্মতারিখের প্রমাণ হিসেবে বার্থ সার্টিফিকেট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে এই নথি তৈরিতে কোনও ধরনের জালিয়াতি হলে তার প্রভাব পড়তে পারে প্রশাসনিক ব্যবস্থাতেও।মুখ্যসচিবের বক্তব্য অনুযায়ী, রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ভুয়ো জন্ম ও মৃত্যু শংসাপত্র ইস্যুর অভিযোগ সামনে এসেছে। নকশালবাড়ি থেকে মাটিগাড়া এবং কাকদ্বীপ—বিভিন্ন এলাকার নথি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এই সংক্রান্ত কিছু বিষয় আদালতেও বিচারাধীন রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

কীভাবে হবে জন্ম-মৃত্যু শংসাপত্রের যাচাই?

প্রশাসনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, পুরসভা ও পঞ্চায়েতগুলিতে থাকা পুরনো রেজিস্টার ও নথি ধাপে ধাপে স্ক্যান করা হবে। এরপর সেই তথ্যের ভিত্তিতে সরকারি ভাবে পরীক্ষা চালানো হবে।কোনও বার্থ বা ডেথ সার্টিফিকেট নিয়ে সন্দেহ দেখা দিলে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে তা যাচাই করা হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী জেলাশাসক এবং তাঁর নিযুক্ত আধিকারিকরা নথি পরীক্ষা করবেন। শুধু অফিসে বসে নয়, প্রয়োজনে এলাকায় গিয়ে এবং বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য যাচাই করার কথাও জানানো হয়েছে।

কোন কোন নথি খতিয়ে দেখা হবে?

প্রশাসনের বক্তব্য অনুযায়ী, আগে ইস্যু হওয়া সমস্ত জন্ম ও মৃত্যু শংসাপত্রই ধাপে ধাপে পরীক্ষার আওতায় আসতে পারে। পুরসভা ও পঞ্চায়েত স্তরের রেজিস্টার স্ক্যান করে পুরনো তথ্যও ডিজিটাল রেকর্ডের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হবে।যেখানে বার্থ সার্টিফিকেট রয়েছে, সেখানেও প্রয়োজন অনুযায়ী তথ্য যাচাই করা হতে পারে। আবার কারও জন্মের নথি না থাকলে, সেই ক্ষেত্রেও অন্যান্য প্রমাণ ও তথ্য পরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

জন্ম নথিভুক্ত করার নিয়ম কী?

প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, শিশুর জন্মের পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জন্ম নথিভুক্ত করা উচিত। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, জন্মের ২১ দিনের মধ্যে রেজিস্ট্রেশন করলে সাধারণত অতিরিক্ত জরিমানার প্রয়োজন হয় না। নির্দিষ্ট সময় পেরিয়ে গেলে নিয়ম মেনে অতিরিক্ত প্রক্রিয়া বা ফি প্রযোজ্য হতে পারে।তবে সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও যদি কোনও নথি তৈরি করা হয়ে থাকে, সেটির বৈধতা নিয়েও প্রয়োজনে পরীক্ষা হতে পারে।

ভুয়ো নথি ধরা পড়লে কী হবে?

যাচাইয়ের সময় ইচ্ছাকৃতভাবে ভুয়ো বা বেআইনি নথি ব্যবহার করার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। একইসঙ্গে কোনও সরকারি কর্মীর দায়িত্বে গাফিলতি বা ইচ্ছাকৃত অনিয়ম ধরা পড়লেও ব্যবস্থা নেওয়ার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।তবে প্রশাসনের তরফে স্পষ্ট করা হয়েছে, নিছক মানবিক ভুল বা অনিচ্ছাকৃত ত্রুটিকে ইচ্ছাকৃত জালিয়াতির সঙ্গে এক করে দেখা হবে না। মানবিক ভুলের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। কিন্তু পরিকল্পিতভাবে ভুল তথ্য বা ভুয়ো নথি তৈরি কিংবা ব্যবহার করা হলে তা বরদাস্ত করা হবে না।

কারা বার্থ ও ডেথ সার্টিফিকেট ইস্যু করবেন?

প্রশাসনিক ব্যবস্থায় জন্ম ও মৃত্যু শংসাপত্র ইস্যুর প্রক্রিয়াতেও পরিবর্তনের কথা জানানো হয়েছে। পুরসভার চেয়ারম্যান বা কোনও অস্থায়ী সরকারি কর্মী ইচ্ছেমতো এই ধরনের শংসাপত্র ইস্যু করতে পারবেন না বলে জানানো হয়েছে।নতুন ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি আধিকারিকদের মাধ্যমেই সার্টিফিকেট ইস্যুর প্রক্রিয়া পরিচালিত হবে। সরকারি হাসপাতালের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সার্টিফিকেট দেওয়ার ব্যবস্থা থাকবে বলে জানানো হয়েছে।

সাধারণ মানুষের জন্য কী বার্তা?

এই ভেরিফিকেশন নিয়ে সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত না হওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে। প্রশাসনের বক্তব্য, বৈধ নথি থাকা সাধারণ নাগরিকদের ভয় পাওয়ার কোনও কারণ নেই। মূল লক্ষ্য হল জালিয়াতি বন্ধ করা এবং জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও নির্ভরযোগ্য করে তোলা।প্রয়োজনে রাজ্যস্তরে নতুন গাইডলাইন তৈরি করা হবে। স্বাস্থ্য দফতরের তরফে সেই নির্দেশিকা প্রস্তুত করা হতে পারে বলে জানানো হয়েছে। জেলা ও স্থানীয় স্তরে নথি যাচাইয়ের প্রক্রিয়াও সেই নির্দেশিকা অনুযায়ী পরিচালিত হবে।

জন্ম ও মৃত্যু শংসাপত্রে জালিয়াতির অভিযোগ ঘিরে রাজ্যজুড়ে শুরু হয়েছে নথি যাচাই অভিযান। পুরসভা ও পঞ্চায়েত স্তরে থাকা রেজিস্টার স্ক্যান করে তথ্য খতিয়ে দেখা হবে। সন্দেহজনক নথি পাওয়া গেলে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে আরও গভীরভাবে যাচাই করা হবে বলে জানিয়েছেন মুখ্যসচিব।

Leave a comment