প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনের বাইরে কংগ্রেসের বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এবং কংগ্রেসের মধ্যে রাজনৈতিক বিতর্ক তীব্র হয়েছে। বিজেপির জাতীয় সভাপতি নীতিন নবীন, রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভের সমালোচনা করে একে "অরাজকতার রাজনীতি" বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর বক্তব্য, গণতন্ত্রে প্রতিবাদের অধিকার সকলের থাকলেও সেই প্রতিবাদেরও একটি সীমা রয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনের বাইরে অনুষ্ঠিত এই বিক্ষোভ রাজনৈতিক মতভেদের প্রকাশ নয়, বরং শৃঙ্খলা ও ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করার পদক্ষেপ।
সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে নীতিন নবীন রাহুল গান্ধীর আচরণকে "অশোভন ও নিন্দনীয়" বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, সরকারের নীতির বিরোধিতা করা বিরোধী দলের সাংবিধানিক অধিকার হলেও প্রতিবাদ এবং অরাজকতার মধ্যে পার্থক্য বোঝা জরুরি। তাঁর অভিযোগ, রাহুল গান্ধী বিরোধী দলনেতার সাংবিধানিক পদের মর্যাদা রক্ষা করেননি। তিনি বলেন, বিরোধী দলনেতার পদ দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোতে গুরুত্বপূর্ণ এবং ওই পদে থাকা ব্যক্তির কাছ থেকে দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশিত।
নীতিন নবীন বলেন, যখন কোনো প্রতিবাদ গণতান্ত্রিক সীমা অতিক্রম করে, তখন তা অরাজকতার রূপ নেয়। তাঁর ভাষায়, "প্রতিবাদ এবং অরাজকতা দুটি আলাদা বিষয়। যখন প্রতিবাদ শালীনতার সীমা অতিক্রম করে, তখন তা অরাজকতায় পরিণত হয়।" তিনি আরও অভিযোগ করেন, রাহুল গান্ধী ধারাবাহিকভাবে এমন রাজনীতি করছেন, যার ফলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং সাংবিধানিক পদগুলির মর্যাদা ক্ষুণ্ন হচ্ছে।
বিজেপি সভাপতির দাবি, প্রধানমন্ত্রী কোনো একটি রাজনৈতিক দলের নেতা নন, বরং সমগ্র দেশের নির্বাচিত প্রতিনিধি। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর পদ দেশের কোটি কোটি নাগরিকের আস্থা ও বিশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত। তাই প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনের বাইরে এ ধরনের বিক্ষোভ উপযুক্ত নয়। তাঁর অভিযোগ, কংগ্রেস নেতাদের এই কর্মসূচি গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের পরিবর্তে রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা।
এই বিতর্কের সূত্রপাত কংগ্রেসের সেই বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে, যেখানে রাহুল গান্ধী, কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভাদ্রা এবং দলের একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতা প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনের বাইরে পৌঁছান। কংগ্রেসের দাবি, NEET প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ এবং শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে পুলিশের পদক্ষেপের প্রতিবাদে এই কর্মসূচি নেওয়া হয়। বিরোধী দল শিক্ষা ব্যবস্থায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানায়। কংগ্রেসের অভিযোগ, পরীক্ষা-সংক্রান্ত অনিয়মের কারণে লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সরকারকে এই বিষয়ে জবাব দিতে হবে।
![]()
বিক্ষোভ চলাকালে প্রধানমন্ত্রীর দফতরের প্রতিমন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব গোবিন্দ মোহন রাহুল গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে অবস্থান কর্মসূচি প্রত্যাহারের অনুরোধ জানান। তবে রাহুল গান্ধী এবং অন্যান্য বিরোধী নেতারা বিক্ষোভ প্রত্যাহার করতে অস্বীকার করেন। এরপর পুলিশ বিক্ষোভকারীদের সেখান থেকে সরিয়ে দেয় এবং কয়েকজন নেতাকে হেফাজতে নেয়। এ সময় ঘটনাস্থলে রাজনৈতিক স্লোগান এবং উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদবও রাহুল গান্ধীর সমর্থনে বিক্ষোভস্থলে পৌঁছান এবং তাকেও হেফাজতে নেওয়া হয়। পরে রাহুল গান্ধী, অখিলেশ যাদব এবং অন্যান্য নেতাদের মুক্তি দেওয়া হয়।
কংগ্রেস সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে জানায়, শিক্ষার্থীদের কণ্ঠস্বর দমন করার চেষ্টা করা হচ্ছে। দলের বক্তব্য, NEET প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো গুরুতর বিষয়ে সংসদ ও রাজপথ—উভয় ক্ষেত্রেই জবাবদিহি দাবি করা বিরোধী দলের দায়িত্ব। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে এবং অন্যান্য নেতারা বলেন, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের সঙ্গে যুক্ত বিষয়গুলিতে সরকারকে স্বচ্ছতা দেখাতে হবে এবং দায়িত্ব নির্ধারণ করতে হবে।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে কেন্দ্র সরকার এবং বিরোধী শিবিরের মধ্যে রাজনৈতিক সংঘাত আরও তীব্র হয়েছে। কংগ্রেস এই আন্দোলনকে শিক্ষার্থী ও যুবকদের অধিকারের লড়াই হিসেবে তুলে ধরছে। অন্যদিকে বিজেপির দাবি, এটি গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের পরিবর্তে রাজনৈতিক প্রদর্শন এবং ব্যবস্থাবিরোধী পদক্ষেপ। বিজেপির বক্তব্য, NEET-সংক্রান্ত ঘটনায় সরকার ইতোমধ্যেই তদন্ত ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। অপরদিকে বিরোধী দল সংসদে আলোচনা এবং জবাবদিহির দাবি অব্যাহত রেখেছে।
রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে এই বিক্ষোভের পর দেশে গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের সীমা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিবাদ গণতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং সাংবিধানিক পদগুলির মর্যাদা বজায় রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে বিরোধী দলগুলির বক্তব্য, সরকারের নীতি ও সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো গণতন্ত্রে তাদের অধিকার।
NEET প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং কংগ্রেসের বিক্ষোভকে ঘিরে আগামী দিনগুলিতে সংসদের ভিতরে এবং বাইরে রাজনৈতিক বক্তব্য ও পাল্টা বক্তব্য অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। বিজেপি যেখানে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে অরাজক রাজনীতির অভিযোগ করছে, সেখানে কংগ্রেস শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়গুলিতে সরকারের কাছে জবাবদিহি দাবি করছে। ফলে বিষয়টি বর্ষাকালীন অধিবেশনেও রাজনৈতিক আলোচনার অন্যতম প্রধান ইস্যু হয়ে থাকতে পারে।








