দেশের সুরক্ষায় দায়িত্ব পালন করা কখনও সহজ নয়, আর বিশ্বের সর্বোচ্চ যুদ্ধক্ষেত্র সিয়াচেনে সেই দায়িত্ব পালন করা আরও কঠিন। তুষার, হিমাঙ্কের বহু নীচের তাপমাত্রা এবং অক্সিজেনের ঘাটতির মধ্যেও নিজের দক্ষতা ও সাহসের পরিচয় দিয়ে ইতিহাস গড়েছেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন শিবা চৌহান। ২০২৩ সালে তিনি প্রথম মহিলা অফিসার হিসেবে সিয়াচেনের কুমার পোস্টে অপারেশনাল দায়িত্ব পালন করে নতুন নজির স্থাপন করেন।
সিয়াচেনে প্রথম মহিলা অফিসার, ভারতীয় সেনার ইতিহাসে নতুন অধ্যায়
২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ভারতীয় সেনাবাহিনীর কোর অব ইঞ্জিনিয়ার্স-এর অফিসার ক্যাপ্টেন শিবা চৌহান বিশ্বের সর্বোচ্চ যুদ্ধক্ষেত্র সিয়াচেনের কুমার পোস্টে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৫,৬৩২ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এই পোস্টে প্রথমবার কোনও মহিলা অফিসারকে অপারেশনাল দায়িত্ব দেওয়া হয়। ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীতে নারীদের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে এটি একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়।
ছোটবেলার কঠিন লড়াই থেকেই শুরু স্বপ্নপূরণের যাত্রা
রাজস্থানের উদয়পুরের বাসিন্দা শিবা চৌহানের জীবন সহজ ছিল না। মাত্র ১১ বছর বয়সে বাবাকে হারানোর পর পরিবারের সমস্ত দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন তাঁর মা। প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও পড়াশোনা এবং সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার স্বপ্ন ছাড়েননি শিবা। পরিবারের সমর্থনই তাঁকে জীবনের প্রতিটি ধাপে এগিয়ে যেতে সাহস জুগিয়েছে।
সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে অল ইন্ডিয়া র্যাঙ্ক–১
উদয়পুরের টেকনো এনজেআর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক হওয়ার পর তিনি ভারতীয় সেনাবাহিনীর SSC-Tech 25 এন্ট্রির জন্য আবেদন করেন। প্রথম দুই প্রচেষ্টায় সফল না হলেও তৃতীয়বারে সার্ভিসেস সিলেকশন বোর্ড (SSB)-এর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং ১৯ এসএসবি এলাহাবাদে অল ইন্ডিয়া র্যাঙ্ক–১ অর্জন করে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দেন।
OTA-র কঠোর প্রশিক্ষণ পেরিয়ে সেনাবাহিনীতে কমিশন
এসএসবি-তে সাফল্যের পর চেন্নাইয়ের অফিসার্স ট্রেনিং অ্যাকাডেমিতে (OTA) কঠোর সামরিক প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেন শিবা। ২০২১ সালে তিনি ভারতীয় সেনাবাহিনীর কোর অব ইঞ্জিনিয়ার্স-এ কমিশনপ্রাপ্ত অফিসার হিসেবে যোগ দেন। পরে তাঁকে ফায়ার অ্যান্ড ফিউরি কর্পস-এর অধীন সুরা সোই ইঞ্জিনিয়ার রেজিমেন্টে পোস্টিং দেওয়া হয়।
সিয়াচেনে যাওয়ার আগে ছিল কঠিন প্রস্তুতি
সিয়াচেনে দায়িত্ব নেওয়ার আগে তাঁকে সিয়াচেন ব্যাটল স্কুলে এক মাসের বিশেষ প্রশিক্ষণ নিতে হয়। বরফে আরোহন, তুষারধস থেকে উদ্ধার, ক্রেভাস রেসকিউ, চরম আবহাওয়ায় বেঁচে থাকার কৌশল এবং উচ্চতাজনিত প্রতিকূল পরিস্থিতিতে কাজ করার মতো কঠিন প্রশিক্ষণ সফলভাবে সম্পন্ন করেন তিনি। এই দক্ষতার ভিত্তিতেই তাঁকে বিশ্বের অন্যতম দুর্গম যুদ্ধক্ষেত্রে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
শুধু সেনা অফিসার নন, দক্ষ নেতৃত্বেরও পরিচয়
সিয়াচেনে ক্যাপ্টেন শিবা চৌহানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ছিল স্যাপারদের নেতৃত্ব দেওয়া। হেলিপ্যাড নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ, দুর্গম এলাকায় সেনাবাহিনীর রসদ সরবরাহ নিশ্চিত করা, সামরিক অবকাঠামো তৈরি এবং অপারেশনাল প্রস্তুতি বজায় রাখার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ তিনি দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করেন। এর আগে ২০২২ সালে কার্গিল বিজয় দিবস উপলক্ষে ৫০৮ কিলোমিটারের একটি উচ্চ পার্বত্য সাইকেল অভিযানেরও নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি।
ভারতীয় নারীদের জন্য অনুপ্রেরণার নতুন প্রতীক
ক্যাপ্টেন শিবা চৌহানের এই সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়, ভারতীয় নারীদের সক্ষমতারও উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। কঠোর পরিশ্রম, ধৈর্য এবং আত্মবিশ্বাস থাকলে যে কোনও লক্ষ্য অর্জন সম্ভব—এই বার্তাই তাঁর জীবন থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রতিরক্ষা পরিষেবায় যোগ দিতে ইচ্ছুক হাজার হাজার তরুণ-তরুণীর কাছে আজ তিনি এক অনুপ্রেরণার নাম।
রাজস্থানের সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসে ভারতীয় সেনাবাহিনীতে নজির গড়েছেন ক্যাপ্টেন শিবা চৌহান। বিশ্বের সর্বোচ্চ যুদ্ধক্ষেত্র সিয়াচেনের কুমার পোস্টে প্রথম মহিলা অফিসার হিসেবে অপারেশনাল দায়িত্ব পালন করে তিনি ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। কঠোর প্রশিক্ষণ, অধ্যবসায় এবং অদম্য মানসিক শক্তির এই সাফল্যের গল্প আজ অসংখ্য তরুণ-তরুণীর কাছে অনুপ্রেরণা।










