দীপাবলির পর থেকেই বিহার, ঝাড়খণ্ড এবং পূর্ব উত্তরপ্রদেশের বিভিন্ন পরিবারে শুরু হয়ে যায় ছটপুজোর প্রস্তুতি। পুজোর জন্য বাঁশের সূপ, ডালা এবং প্রসাদ তৈরির সামগ্রী সংগ্রহ করতে শুরু করেন ভক্তরা। চার দিন ধরে চলা এই উৎসবে সূর্যদেব এবং ছঠী মাইয়ার আরাধনা করা হয়। পরিবারের সুখ-শান্তি, সন্তানদের সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনায় নারী-পুরুষ নির্বিশেষে অনেকেই এই ব্রত পালন করেন। ২০২৬ সালে ছট মহাপর্ব শুরু হবে শুক্রবার, ১৩ নভেম্বর এবং শেষ হবে সোমবার, ১৬ নভেম্বর।
হিন্দু পঞ্জিকা অনুযায়ী, কার্তিক মাসের শুক্লপক্ষের চতুর্থী তিথিতে ছটপুজোর সূচনা হয়। প্রথম দিন পালিত হয় নহায়-খায়। পরের দিন অর্থাৎ দ্বিতীয় দিনে পালন করা হয় খরনা। তৃতীয় দিন সন্ধ্যায় অস্তগামী সূর্যকে অর্ঘ্য নিবেদন করা হয়। চতুর্থ দিন সকালে উদীয়মান সূর্যের পুজো ও অর্ঘ্য প্রদানের পর ব্রত ভঙ্গ করেন ব্রতীরা।
২০২৬ সালে ১৩ নভেম্বর, শুক্রবার পালিত হবে নহায়-খায়। ১৪ নভেম্বর, শনিবার খরনা পালন করা হবে। ১৫ নভেম্বর, রবিবার সন্ধ্যায় দেওয়া হবে সন্ধ্যা অর্ঘ্য। এরপর ১৬ নভেম্বর, সোমবার সকালে ঊষা অর্ঘ্যের মাধ্যমে শেষ হবে ছটপুজো।
এই উৎসবে অস্তগামী সূর্যেরও বিশেষভাবে পুজো করা হয়। সন্ধ্যায় ব্রতীরা নদী, পুকুর অথবা ছটঘাটে গিয়ে জলে দাঁড়িয়ে সূর্যদেবকে অর্ঘ্য নিবেদন করেন। পরের দিন সকালে আবার ঘাটে উপস্থিত হয়ে উদীয়মান সূর্যকে জল নিবেদন করা হয়। এরপর পরিবারের সদস্যরা প্রসাদ গ্রহণ করেন।
নহায়-খায়ের মধ্য দিয়েই শুরু হয় ছটপুজোর আনুষ্ঠানিকতা। এই দিন ব্রতীরা সকালে স্নান করেন। অনেক জায়গায় ভক্তরা গঙ্গা অথবা অন্য নদীতে গিয়ে স্নান করেন। এরপর বাড়িতে পুজোর জন্য আলাদা করে নিরামিষ খাবার তৈরি করা হয়।
নহায়-খায়ের দিনে সাধারণত কুমড়োর তরকারি, ছোলার ডাল এবং ভাত রান্না করা হয়। এই খাবার তৈরিতে পেঁয়াজ ও রসুন ব্যবহার করা হয় না। প্রথমে ব্রতীরা খাবার গ্রহণ করেন। তারপর পরিবারের অন্য সদস্যরা খাবার খান। তবে বিভিন্ন পরিবারে রান্না ও পুজোর নিয়মে কিছুটা পার্থক্য থাকতে পারে।
এই দিন থেকেই বাড়িতে ছটপুজোর প্রসাদ তৈরির প্রস্তুতিও শুরু হয়। গম পরিষ্কার করা হয় এবং পুজোর কাজে ব্যবহৃত বাসনপত্র ধুয়ে আলাদা করে রাখা হয়। প্রসাদ তৈরির জায়গা পরিষ্কার রাখার দিকেও বিশেষ নজর দেওয়া হয়।
পঞ্জিকা অনুযায়ী, কার্তিক শুক্লপক্ষের চতুর্থী তিথি শুরু হবে ১২ নভেম্বর সন্ধ্যা প্রায় ৬টা ৯ মিনিটে। এই তিথি শেষ হবে ১৩ নভেম্বর রাত প্রায় ৮টা ৪২ মিনিটে। উদয়া তিথি অনুসারে ১৩ নভেম্বর পালিত হবে নহায়-খায়।
ছটপুজোর দ্বিতীয় দিনকে বলা হয় খরনা। অনেক জায়গায় এই দিনটি লোহন্ডা নামেও পরিচিত। ২০২৬ সালে ১৪ নভেম্বর, শনিবার পালিত হবে খরনা। এই দিন ব্রতীরা সকাল থেকে খাবার গ্রহণ করেন না। সন্ধ্যায় সূর্যাস্তের পর পুজো সম্পন্ন করে প্রসাদ গ্রহণের মাধ্যমে এই দিনের উপবাস শেষ করেন।
![]()
খরনার জন্য বাড়িতে গুড় ও চাল দিয়ে ক্ষীর তৈরি করা হয়। পাশাপাশি রুটিও প্রস্তুত করা হয়। অনেক পরিবারে মাটির উনুনে এই ক্ষীর রান্না করা হয়। পুজো সম্পন্ন হওয়ার পর প্রথমে ব্রতীরা প্রসাদ গ্রহণ করেন। এরপর পরিবারের সদস্য এবং আশপাশের প্রতিবেশীদের মধ্যে প্রসাদ বিতরণ করা হয়।
খরনার প্রসাদ গ্রহণের পর প্রায় ৩৬ ঘণ্টার নির্জলা ব্রত শুরু হয়। এই সময় ব্রতীরা জলও পান করেন না। পরের দিন সন্ধ্যায় অস্তগামী সূর্যকে অর্ঘ্য দেওয়ার পরেও এই ব্রত অব্যাহত থাকে। ১৬ নভেম্বর সকালে উদীয়মান সূর্যকে অর্ঘ্য নিবেদনের পরেই ব্রত ভঙ্গ করা হয়।
পঞ্জিকা অনুযায়ী, কার্তিক শুক্লপক্ষের পঞ্চমী তিথি শুরু হবে ১৩ নভেম্বর রাত প্রায় ৮টা ৪২ মিনিটে। এই তিথি শেষ হবে ১৪ নভেম্বর রাত প্রায় ১১টা ২৩ মিনিটে।
ছট মহাপর্বের তৃতীয় দিনকে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়। এই দিন সন্ধ্যায় ব্রতীরা ঘাটে গিয়ে অস্তগামী সূর্যকে অর্ঘ্য নিবেদন করেন। ২০২৬ সালে ১৫ নভেম্বর, রবিবার পালিত হবে সন্ধ্যা অর্ঘ্য।
কার্তিক শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী তিথি শুরু হবে ১৪ নভেম্বর রাত প্রায় ১১টা ২৩ মিনিটে। এই তিথি শেষ হবে ১৬ নভেম্বর রাত প্রায় ২টো নাগাদ।
সন্ধ্যা অর্ঘ্য প্রদানের সময় শহরভেদে সূর্যাস্তের সময় অনুযায়ী আলাদা হবে। পাটনায় ১৫ নভেম্বর সূর্যাস্ত হবে সন্ধ্যা প্রায় ৫টা ১ মিনিটে। অন্যদিকে, দিল্লিতে সূর্যাস্তের সময় সন্ধ্যা প্রায় ৫টা ২৮ মিনিট।
এই দিন ছটঘাটে বাঁশের ঝুড়ি ও সূপের মধ্যে ঠেকুয়া, ফল, নারকেল এবং পুজোর অন্যান্য সামগ্রী সাজিয়ে রাখা হয়। পরিবারের সদস্যরাও ব্রতীদের সঙ্গে ঘাটে উপস্থিত হন। সূর্যাস্তের সময় জলে দাঁড়িয়ে সূর্যদেবকে অর্ঘ্য নিবেদন করা হয়।
ছটপুজোর শেষ দিন ২০২৬ সালের ১৬ নভেম্বর, সোমবার। এই দিন সকালে উদীয়মান সূর্যকে অর্ঘ্য নিবেদন করা হয়। ব্রতীরা সূর্যোদয়ের আগেই ঘাটে পৌঁছে সূর্যদেবের আরাধনা করেন।
পাটনায় ১৬ নভেম্বর সূর্যোদয় হবে সকাল প্রায় ৬টা ৭ থেকে ৮ মিনিটের মধ্যে। দিল্লিতে সূর্যোদয়ের সময় সকাল প্রায় ৬টা ৪৪ মিনিট। অন্যান্য শহরে স্থানীয় সূর্যোদয়ের সময় অনুযায়ী অর্ঘ্য নিবেদন করা হবে।
পঞ্জিকা অনুযায়ী, কার্তিক শুক্লপক্ষের সপ্তমী তিথি শুরু হবে ১৬ নভেম্বর রাত প্রায় ২টোয়। এই তিথি শেষ হবে ১৭ নভেম্বর ভোর প্রায় ৪টা ১৯ মিনিটে।
উদীয়মান সূর্যকে অর্ঘ্য নিবেদনের পর ব্রতীরা পুজো সম্পন্ন করেন। এরপর প্রসাদ গ্রহণ করে ব্রত ভঙ্গ করেন। এর মধ্য দিয়েই চার দিন ধরে চলা ছট মহাপর্বের সমাপ্তি ঘটে।
বিহার, ঝাড়খণ্ড এবং পূর্ব উত্তরপ্রদেশের মানুষের জীবনে ছটপুজোর বিশেষ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব রয়েছে। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, এই দিনে সূর্যদেব ও ছঠী মাইয়ার আরাধনা করলে পরিবারে সুখ-শান্তি বজায় থাকে। পাশাপাশি সন্তানদের সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ুর আশীর্বাদ পাওয়া যায় বলেও বিশ্বাস করেন ভক্তরা। এই বিশ্বাস ও আস্থাকে কেন্দ্র করেই প্রতি বছর অসংখ্য মানুষ ছটের ব্রত পালন করেন।
ছটপুজোয় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং পুজোর নিয়মকানুনের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। অনেক পরিবারে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই ব্রত পালিত হয়ে আসছে। পুজোর প্রস্তুতিতে পরিবারের প্রত্যেক সদস্য অংশ নেন। কেউ প্রসাদ তৈরিতে সাহায্য করেন, আবার কেউ পুজোর সামগ্রী ঘাটে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করেন।








