রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু ড. দীনেশ শর্মাকে আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের নতুন উপরাজ্যপাল হিসেবে নিয়োগ করেছেন। তিনি অ্যাডমিরাল ডি কে জোশির স্থলাভিষিক্ত হবেন, যিনি অক্টোবর ২০১৭ থেকে এই কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের উপরাজ্যপাল হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দীনেশ শর্মার নিয়োগ কার্যকর হবে যেদিন তিনি উপরাজ্যপাল পদে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন।
উত্তরপ্রদেশের প্রাক্তন উপমুখ্যমন্ত্রী এবং লখনউয়ের প্রাক্তন মেয়র দীনেশ শর্মা নতুন দায়িত্বকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখলেও সেই চ্যালেঞ্জকে সুযোগে পরিণত করে কাজ করা তাঁর কাজের ধরন বলে জানিয়েছেন। নতুন দায়িত্ব পেলেও লখনউয়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক শেষ হবে না বলেও তিনি স্পষ্ট করেছেন। তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে লখনউ গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে থেকেছে এবং শহরের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ বজায় থাকবে।
নতুন দায়িত্ব পাওয়ার পর দীনেশ শর্মা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, রাষ্ট্রপতি এবং দলের নেতৃত্বের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, নেতৃত্ব তাঁর ওপর যে আস্থা রেখেছে, তা সম্পূর্ণ নিষ্ঠা, পরিশ্রম ও সততার সঙ্গে পালন করাই তাঁর অগ্রাধিকার। তাঁর মতে, কোনও পদের গুরুত্ব শুধু পদের নামের মধ্যে নয়, বরং সেই পদের মাধ্যমে মানুষের জন্য করা কাজের মধ্যে নিহিত।
বঙ্গোপসাগরে অবস্থিত আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ নিরাপত্তা ও কৌশলগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল। পর্যটন, পরিবেশ, পরিকাঠামো এবং স্থানীয় উন্নয়নের ক্ষেত্রেও এই অঞ্চলের গুরুত্ব রয়েছে। উপরাজ্যপাল হিসেবে প্রশাসনিক ব্যবস্থা উন্নত করা এবং কেন্দ্রীয় সরকারের প্রকল্পগুলি কার্যকরভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব তাঁর সামনে থাকবে।
দীনেশ শর্মা ইঙ্গিত দিয়েছেন যে আন্দামান-নিকোবরের পর্যটনকে নতুন দিশা দেওয়া তাঁর অগ্রাধিকারের মধ্যে থাকবে। তাঁর মতে, এই অঞ্চলে পর্যটনের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সংরক্ষণ করে এটিকে দেশের বড় পর্যটনকেন্দ্রগুলির মধ্যে উন্নীত করা যেতে পারে। আন্দামানের সমুদ্রসৈকত, দ্বীপ, সামুদ্রিক কার্যকলাপ, প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং জীববৈচিত্র্য দেশ-বিদেশের পর্যটকদের আকর্ষণ করার সক্ষমতা রাখে।
নভেম্বর ২০২৫-এর একটি প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় চার লক্ষ জনসংখ্যার এই দ্বীপপুঞ্জে আগের বছর ৭.২ লক্ষ পর্যটক এসেছিলেন। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্তই পর্যটকের সংখ্যা ছয় লক্ষে পৌঁছেছিল। পর্যটন বৃদ্ধির পাশাপাশি পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখার ওপরও প্রশাসন জোর দিয়েছে এবং নতুন দ্বীপগুলিকে নিয়ন্ত্রিতভাবে পর্যটকদের জন্য খুলে দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করেছে।
পর্যটন সম্প্রসারণের সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণের ভারসাম্য বজায় রাখাও দীনেশ শর্মার সামনে একটি দায়িত্ব হবে। দ্বীপগুলির প্রাকৃতিক সক্ষমতা সীমিত হওয়ায় পর্যটন সম্প্রসারণের সময় পর্যটকের সংখ্যা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র, স্থানীয় সম্পদ এবং পরিকাঠামোর ওপর বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন হবে। প্রশাসন ইতিমধ্যেই পর্যটনের প্রভাব নিয়ে সমীক্ষা এবং সংবেদনশীল এলাকায় নিয়ন্ত্রিত পর্যটনের দিকে কাজ করছে।
দীনেশ শর্মার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা মূলত উত্তরপ্রদেশের মতো বড় এবং ঘনবসতিপূর্ণ রাজ্যের সঙ্গে যুক্ত। ২০১৭ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে তিনি উত্তরপ্রদেশের যোগী আদিত্যনাথ সরকারের উপমুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। সেই সময় তিনি মাধ্যমিক শিক্ষা, উচ্চশিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং তথ্যপ্রযুক্তি ও ইলেকট্রনিক্সের মতো দফতরের দায়িত্ব সামলেছেন। এর আগে তিনি লখনউয়ের মেয়রও ছিলেন।
রাজনীতিতে আসার আগে তিনি লখনউ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্য বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। এরপর নগর রাজনীতিতে নিজের পরিচয় তৈরি করেন এবং দু’বার লখনউয়ের মেয়র নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালে প্রথমবার মেয়র হওয়ার পর ২০১২ সালে তিনি আবার এই দায়িত্ব পান। এরপর বিজেপি সংগঠনে তাঁর ভূমিকা বাড়ে এবং জাতীয় স্তরেও তিনি দলের বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন।
লখনউয়ে আয়োজিত একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও নতুন দায়িত্বের পর দীনেশ শর্মা শহরের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের কথা বলেন। তিনি জানান, লখনউয়ের সংস্কৃতি, ইতিহাস, সাহিত্য, খাদ্যাভ্যাস এবং সামাজিক ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত কর্মকাণ্ড শহরের পরিচয় বোঝার সুযোগ দেয়। নতুন সাংবিধানিক দায়িত্বের পরও লখনউয়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক বজায় থাকবে বলে তিনি জানান।
দীনেশ শর্মা স্পষ্ট করেছেন যে উপরাজ্যপাল পদে সাংবিধানিক দায়িত্ব গ্রহণের জন্য তাঁকে বিজেপি থেকে পদত্যাগ করতে হবে। বর্তমানে তিনি রাজ্যসভার সাংসদ এবং তাঁর রাজ্যসভা সদস্যপদের মেয়াদ নভেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত নির্ধারিত ছিল। উপরাজ্যপাল পদে দায়িত্ব নেওয়ার পর তাঁর রাজনৈতিক ভূমলের পরিবর্তে সাংবিধানিক ভূমিকা প্রধান হবে।
আন্দামান-নিকোবরের প্রশাসনে পর্যটনের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের জন্য উন্নত স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিবহণ, ডিজিটাল সংযোগ, কর্মসংস্থান এবং মৌলিক পরিষেবা শক্তিশালী করাও গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হবে। দ্বীপগুলির ভৌগোলিক পরিস্থিতি মূল ভূখণ্ডের থেকে আলাদা হওয়ায় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে স্থানীয় পরিস্থিতি অনুযায়ী কৌশল গ্রহণের প্রয়োজন হবে।
দীনেশ শর্মা বলেছেন, আন্দামান-নিকোবরের পর্যটন, পরিকাঠামো এবং জনসুবিধার ক্ষেত্রে কাজের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। প্রশাসন ও কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যে উন্নত সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করার কথাও তিনি বলেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় নীতি ও প্রকল্পের সুবিধা কার্যকরভাবে স্থানীয় মানুষের কাছে পৌঁছানো এবং স্থানীয় প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে অঞ্চলের উন্নয়ন করাই লক্ষ্য।
আন্দামান-নিকোবরকে পর্যটনের ক্ষেত্রে নতুন পরিচয় দেওয়ার পরিকল্পনায় সমুদ্রসৈকত ও প্রচলিত পর্যটনের পাশাপাশি নতুন অভিজ্ঞতার ওপরও নজর দেওয়া যেতে পারে। এখানে জলক্রীড়া, সামুদ্রিক পর্যটন, পাখি পর্যবেক্ষণ এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানভিত্তিক পর্যটনের মতো কর্মকাণ্ডের সম্ভাবনা ইতিমধ্যেই বিকশিত করা হচ্ছে। স্থানীয় যুবকদের পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করা এবং গাইডদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার দিকেও প্রশাসন পদক্ষেপ নিয়েছে।
দীনেশ শর্মা বলেছেন, তাঁর কাছে চ্যালেঞ্জ নতুন বিষয় নয়। তাঁর রাজনৈতিক জীবনে সংগঠন, নগর প্রশাসন, রাজ্য সরকার এবং সংসদ-সংক্রান্ত বিভিন্ন দায়িত্ব ছিল। এখন আন্দামান-নিকোবরের মতো কৌশলগত ও পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল অঞ্চলের দায়িত্ব তাঁর অভিজ্ঞতার নতুন পরীক্ষা হবে। তিনি এটিকে চাপের পরিবর্তে সুযোগ হিসেবে দেখছেন।
উত্তরপ্রদেশে ২০২৭ সালের বিধানসভা নির্বাচনের প্রস্তুতির পর্ব শুরু হওয়ার সময় তাঁর নিয়োগ হয়েছে। ফলে দীনেশ শর্মার আন্দামান-নিকোবর নিয়োগকে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও দেখা হচ্ছে। তবে উপরাজ্যপালের পদ সাংবিধানিক এবং এই ভূমিকায় কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের প্রশাসন, উন্নয়ন ও স্থানীয় স্বার্থের দেখভাল করাই তাঁর প্রধান দায়িত্ব হবে।
লখনউয়ের মেয়র থেকে উত্তরপ্রদেশের উপমুখ্যমন্ত্রী এবং রাজ্যসভার সাংসদ পর্যন্ত দায়িত্ব পালনের পর দীনেশ শর্মা এখন কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের উপরাজ্যপালের ভূমিকা গ্রহণ করতে চলেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, লখনউ তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং শহরের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক বজায় থাকবে। অন্যদিকে আন্দামান-নিকোবরের ক্ষেত্রে পর্যটন, পরিকাঠামো ও জনসুবিধার উন্নয়নের মাধ্যমে অঞ্চলটিকে দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলাই তাঁর লক্ষ্য।










