শারদোৎসবের মরশুমে প্যান্ডেল হপিংয়ের পরিকল্পনা করছেন? তাহলে এবারের পুজোয় দমদমের এই পাঁচটি মণ্ডপ আপনার তালিকায় রাখতে পারেন। কোথাও সাতটি ডিঙি নৌকার কাঠামোয় ফুটে উঠবে বাংলার প্রাচীন বাণিজ্যিক ইতিহাস, কোথাও দেখা মিলবে বিভিন্ন অঞ্চলের রথযাত্রার ঐতিহ্যের। আবার কোনও মণ্ডপে থাকবে পুতুলনাচের হারিয়ে যেতে বসা শিল্প, তো কোথাও একতা ও সময়ের বিবর্তনই হবে মূল আকর্ষণ। ঐতিহ্য, শিল্প এবং আধুনিক ভাবনার মেলবন্ধনে দর্শকদের জন্য বিশেষ অভিজ্ঞতা সাজাচ্ছেন পুজো উদ্যোক্তারা।
দমদম পার্ক তরুণ সংঘ: ‘বেনিয়া কথা’য় বাংলার বাণিজ্যিক ইতিহাস
দমদম পার্ক তরুণ সংঘের দুর্গাপুজো ২০২৬ সালে ৪১তম বর্ষে পা দিয়েছে। এবারের থিম ‘বেনিয়া কথা’। সৃজনশিল্পী অনির্বাণ দাসের ভাবনায় মণ্ডপে তুলে ধরা হচ্ছে বাংলার প্রাচীন বাণিজ্যিক ঐতিহ্য।চণ্ডীমঙ্গল ও মনসামঙ্গল কাব্যের প্রেক্ষাপটে বাংলার ব্যবসা-বাণিজ্য এবং নৌপথে যাতায়াতের ইতিহাসকে শিল্পের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মণ্ডপের কাঠামো তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছে সাতটি ডিঙি নৌকা। লোকসাহিত্য ও বাণিজ্যের অতীতকে একসূত্রে বেঁধে দর্শকদের সামনে তুলে ধরাই এই পুজোর অন্যতম উদ্দেশ্য।
দমদম পার্ক ভারতচক্র: ‘বঙ্গের রথকথা’য় রথযাত্রার ঐতিহ্য
দমদম পার্ক ভারতচক্রের পুজো এ বছর ২৬তম বর্ষে পদার্পণ করেছে। এবারের থিম ‘বঙ্গের রথকথা’। মণ্ডপসজ্জার দায়িত্বে রয়েছেন মানস দাস এবং প্রতিমা নির্মাণ করছেন সৈকত বসু।বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে প্রচলিত রথযাত্রার ইতিহাস, ধর্মীয় বিশ্বাস ও লোকসংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে সাজানো হচ্ছে এই মণ্ডপ। বিভিন্ন অঞ্চলের রথের প্রতিরূপের মাধ্যমে বাংলার সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে উদ্যোক্তাদের। ধর্মীয় ঐতিহ্যের পাশাপাশি শিল্পের নান্দনিক প্রকাশও এই থিমের অন্যতম আকর্ষণ হতে চলেছে।
দমদম তরুণ দল: ‘জোট’-এর বার্তায় একতার শক্তি
দমদম তরুণ দলের দুর্গাপুজো এ বছর ৪৯তম বর্ষে পা দিয়েছে। সৃজনশিল্পী পূর্ণেন্দু দের ভাবনায় এবারের থিম ‘জোট’।এই থিমের মূল বক্তব্য, একতার মধ্যেই শক্তি এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টার মধ্যেই রয়েছে সৃষ্টির সম্ভাবনা। আলাদা আলাদা উপাদান একত্রিত হয়ে যেমন একটি সম্পূর্ণ রূপ তৈরি করে, তেমনই বহু মানুষের মিলিত উদ্যোগে বড় কাজ সম্ভব হয়।শব্দের সমন্বয়ে ভাষার সৃষ্টি থেকে শুরু করে মানুষের সামাজিক জীবন—বিভিন্ন উদাহরণের মাধ্যমে ঐক্যের গুরুত্ব তুলে ধরার চেষ্টা করা হচ্ছে। সামাজিক সংহতি ও পারস্পরিক সহযোগিতার বার্তাই এই পুজোর প্রধান আকর্ষণ।
দমদম পার্ক সর্বজনীন: ৭৫ বছরে ‘পঞ্চালিকা’য় পুতুলনাচের জাদু
দমদম পার্ক সর্বজনীন দুর্গাপুজো এ বছর ৭৫ বছরে পদার্পণ করেছে। পুজোর প্ল্যাটিনাম জুবিলি উপলক্ষে তাদের বিশেষ ভাবনা ‘পঞ্চালিকা’। শিল্পী তাপস দত্তের পরিকল্পনা এবং প্রতিমাশিল্পী সনাতন দিন্দার কাজের মাধ্যমে বাংলার ঐতিহ্যবাহী পুতুলনাচের শিল্পকে তুলে ধরা হচ্ছে।একসময় গ্রামবাংলার বিনোদন ও লোকসংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল পুতুলনাচ। সময়ের সঙ্গে এই শিল্পের পরিচিতি কমেছে। নতুন প্রজন্মের কাছে সেই ঐতিহ্যকে আবার পরিচিত করে তুলতেই ‘পঞ্চালিকা’ থিম বেছে নেওয়া হয়েছে।লোকশিল্পের স্মৃতি, বাংলার সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার এবং শিল্পের অভিনব উপস্থাপনা—সব মিলিয়ে এই মণ্ডপ দর্শকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ হয়ে উঠতে পারে।
দমদম যুবক বৃন্দ: ‘কালান্তর’-এ অতীত থেকে আধুনিকতার যাত্রা
দমদম যুবক বৃন্দের এবারের থিম ‘কালান্তর’। সমাজের পরিবর্তন, যুগের বিবর্তন এবং মানুষের জীবনযাপনে সময়ের প্রভাবকে কেন্দ্র করে সাজানো হচ্ছে মণ্ডপ।সাবেকি ঐতিহ্য থেকে আধুনিকতার পথে সমাজ কীভাবে এগিয়েছে, সেই পরিবর্তনের ছবি শিল্পের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে। অতীত ও বর্তমানের মধ্যে যোগসূত্র তৈরি করাই এই থিমের মূল ভাবনা।সময়ের সঙ্গে মানুষের চিন্তাভাবনা, জীবনযাপন ও সামাজিক কাঠামো কীভাবে বদলেছে, তা দর্শকদের সামনে তুলে ধরার মধ্য দিয়ে এই পুজোও আলাদা মাত্রা পেতে চলেছে।
দুর্গাপুজো মানেই থিমের বৈচিত্র্য, শিল্পের অভিনবত্ব আর বাংলার সংস্কৃতিকে নতুন করে আবিষ্কার করার সুযোগ। ২০২৬ সালে দমদমের পাঁচটি দুর্গাপুজো তাদের ব্যতিক্রমী ভাবনার মাধ্যমে দর্শকদের নজর কাড়তে প্রস্তুত। দমদম পার্ক তরুণ সংঘের ‘বেনিয়া কথা’, দমদম পার্ক ভারতচক্রের ‘বঙ্গের রথকথা’, দমদম তরুণ দলের ‘জোট’, দমদম পার্ক সর্বজনীনের ‘পঞ্চালিকা’ এবং দমদম যুবক বৃন্দের ‘কালান্তর’—প্রতিটি থিমেই উঠে আসছে বাংলার ইতিহাস, লোকসংস্কৃতি, সামাজিক সংহতি ও সময়ের পরিবর্তনের গল্প।













