East Bardhaman News: কাটোয়ার মাটিতে নারী শিক্ষার আলো জ্বালিয়েছিলেন এক সাহেব, ইতিহাসে আজও উজ্জ্বল উইলিয়াম কেরির অবদান

East Bardhaman News: Know how social reformer William Carey started women education in Katwa during the 19th century, building schools, awareness and charity healthcare that shaped local history.

আজকের দিনে নারী শিক্ষা স্বাভাবিক মনে হলেও, একসময় তা ছিল সমাজের চোখে ‘অপরাধ’। ঠিক সেই সময়েই কাটোয়া শহরে নারী শিক্ষার প্রদীপ জ্বালিয়েছিলেন এক বিদেশি সাহেব—জুনিয়র উইলিয়াম কেরি। ধর্মযাজক হিসেবে ভারতে এলেও, বাংলার সামাজিক বাস্তবতা তাঁকে সমাজসংস্কারকের পথে টেনে এনেছিল।

ধর্মযাজক থেকে সমাজসংস্কারক হয়ে ওঠার গল্প

শোনা যায়, ঊনিশ শতকে হুগলি জেলার শ্রীরামপুরে ব্যাপটিস্ট মিশনারির ধর্মযাজক হিসেবে ভারতে আসেন জুনিয়র উইলিয়াম কেরি। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে তিনি কাটোয়া শহরে এসে থিতু হন। অল্প সময়ের মধ্যেই পরাধীন দেশের কুসংস্কার, অশিক্ষা ও সামাজিক বৈষম্য তাঁকে নাড়া দেয়। তখনই তিনি সিদ্ধান্ত নেন—ধর্মপ্রচারের পাশাপাশি সমাজ সংস্কারই হবে তাঁর মূল লক্ষ্য।

কাটোয়ায় নারী শিক্ষার সূচনা

তৎকালীন রক্ষণশীল বাঙালি সমাজে মেয়েদের স্কুলে পাঠানো ছিল অকল্পনীয়। সেই সামাজিক বাধা উপেক্ষা করেই অখণ্ড বর্ধমান জেলার কাটোয়া শহরে মেয়েদের জন্য দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন উইলিয়াম কেরি। এই স্কুলগুলিতে মেয়েরা ইংরেজি শিক্ষার সুযোগ পেত, যা সেই সময় ছিল যুগান্তকারী উদ্যোগ। এই শিক্ষাই পরবর্তীকালে বহু মেয়ের জীবনের দিশা বদলে দেয়।

মেরি কিন্সির ভূমিকা ও নারী সচেতনতা

নারী সমাজের কুসংস্কার দূরীকরণে উইলিয়াম কেরির পাশে সমানভাবে দাঁড়িয়েছিলেন তাঁর স্ত্রী মেরি কিন্সি। তিনি পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে মেয়েদের ও অভিভাবকদের সচেতন করতেন, বোঝাতেন শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা। কেরি দম্পতির এই যৌথ প্রয়াসেই কাটোয়ায় নারী শিক্ষার ভিত আরও মজবুত হয়।

দাতব্য চিকিৎসালয় ও মানবিক উদ্যোগ

শুধু শিক্ষা নয়, স্বাস্থ্য পরিষেবাতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন কেরি দম্পতি। কাটোয়া শহরের কবিরাজপাড়া এলাকায় তাঁরা একটি নিখরচায় দাতব্য চিকিৎসালয় স্থাপন করেন। জলবাহিত রোগে আক্রান্ত বহু মানুষ সেখানে বিনামূল্যে চিকিৎসা ও ওষুধ পেতেন। যদিও আজ সেই চিকিৎসালয়ের অস্তিত্ব নেই, স্মৃতিতে আজও উজ্জ্বল তাঁদের মানবিক কাজ।

সাহেব বাগান ও ইতিহাসের স্মৃতিচিহ্ন

কাটোয়া পুরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ড এলাকায় উইলিয়াম কেরি ও তাঁর আত্মীয়স্বজনেরা বসবাস করতেন। সেই কারণেই এলাকাটি আজও পরিচিত ‘সাহেব বাগান’ নামে। ১৮৫৩ খ্রিস্টাব্দে তাঁর মৃত্যু হয় এবং সাহেব বাগান এলাকাতেই তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়। একই স্থানে রয়েছে তাঁর স্ত্রী মেরি কিন্সি ও তাঁদের পোষ্য হাতির সমাধিও—যা কাটোয়ার ইতিহাসে এক ব্যতিক্রমী অধ্যায়।

ঊনিশ শতকের রক্ষণশীল সমাজে দাঁড়িয়ে কাটোয়া শহরে নারী শিক্ষার পথ দেখিয়েছিলেন সমাজসংস্কারক জুনিয়র উইলিয়াম কেরি। স্কুল, সচেতনতা অভিযান ও দাতব্য চিকিৎসালয়ের মাধ্যমে তিনি শুধু শিক্ষা নয়, মানবিকতারও বীজ বপন করেছিলেন।

Leave a comment