একদিকে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বন্যা ও খরার মতো চরম পরিস্থিতি, অন্যদিকে প্রশান্ত মহাসাগরে শক্তি সঞ্চয় করছে এল নিনো। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা বা WMO জানিয়েছে, বর্তমান এল নিনো পরিস্থিতি আগামী মাসগুলিতে আরও তীব্র হতে পারে এবং এর প্রভাব ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বজায় থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। ভারতের মতো বর্ষানির্ভর কৃষিপ্রধান দেশের কাছে এই পূর্বাভাস যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এল নিনোর সঙ্গে অনেক সময় দুর্বল মৌসুমি বায়ু, কম বৃষ্টিপাত এবং বেশি তাপমাত্রার সম্পর্ক দেখা যায়।
এল নিনো কেন ভারতের জন্য চিন্তার?
ভারতের আবহাওয়ার ক্ষেত্রে এল নিনো শব্দটি শুনলেই প্রথমে বর্ষার কথাই মাথায় আসে। প্রশান্ত মহাসাগরের এই জলবায়ুগত পরিবর্তন ভারতের মৌসুমি বায়ুর গতিপ্রকৃতিকে প্রভাবিত করতে পারে।চলতি বছরের পরিসংখ্যানেও উদ্বেগের ছবি দেখা যাচ্ছে। আইএমডির তথ্য অনুযায়ী, অগাস্টে দেশে স্বাভাবিকের তুলনায় ১৬ শতাংশ কম বৃষ্টিপাত হয়েছে। একইসঙ্গে ১৯০১সালের পর থেকে চলতি বছরের অগাস্টকে দেশের উষ্ণতম অগাস্ট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সেপ্টেম্বরে বৃষ্টির ঘাটতির আশঙ্কা
বর্ষার শেষ পর্ব নিয়েও খুব একটা স্বস্তির পূর্বাভাস নেই। আইএমডি জানিয়েছে, সেপ্টেম্বর মাসে গোটা দেশে স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টি হতে পারে।পূর্বাভাস অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে বৃষ্টির পরিমাণ দীর্ঘমেয়াদি গড় বা LPA-র ৯১ শতাংশের নিচে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। সেপ্টেম্বরের স্বাভাবিক বৃষ্টির LPA প্রায় ১৬৭.৯ মিলিমিটার।ফলে বর্ষার শেষ পর্যায়েও বৃষ্টির ঘাটতি থাকলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জলসম্পদ ও কৃষিকাজের উপর তার প্রভাব পড়তে পারে।
শুধু বর্ষা নয়, শীতেও প্রভাব পড়তে পারে
এল নিনোর প্রভাব বর্ষা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে থেমে যাবে—এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়। শক্তিশালী এল নিনো শীতকালীন তাপমাত্রার গতিপ্রকৃতিকেও প্রভাবিত করতে পারেভারতে ইতিমধ্যেই শীতের স্থায়িত্ব কমে আসা এবং শীতকালে তুলনামূলক বেশি তাপমাত্রার প্রবণতা নিয়ে আলোচনা রয়েছে। ‘ক্লাইমেট ট্রেন্ডস’-এর গবেষণাতেও উত্তর ভারতের শীতের চরিত্রে পরিবর্তনের বিষয়টি উঠে এসেছে।
ফেব্রুয়ারি-মার্চেই বড় ঝুঁকি কৃষির
কৃষকদের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হতে পারে রবি মরশুম। বিশেষ করে গম চাষে ফেব্রুয়ারি ও মার্চ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময় গমের দানা তৈরি ও পরিণত হওয়ার প্রক্রিয়া চলে।তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি বেড়ে গেলে গমের উপর ‘টার্মিনাল হিট স্ট্রেস’ তৈরি হতে পারে। এর ফলে ফসলের ফলন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
কত দ্রুত বাড়ছে তাপমাত্রা?
‘ক্লাইমেট ট্রেন্ডস’-এর গবেষণায় উত্তর ভারতের তাপমাত্রা বৃদ্ধির একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা উঠে এসেছে।
ফেব্রুয়ারি: প্রতি দশকে প্রায় ০.৬৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি
মার্চ: প্রতি দশকে প্রায় ০.৫৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি
এপ্রিল: প্রতি দশকে প্রায় ০.৬৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি
অর্থাৎ শীত দ্রুত শেষ হয়ে গরমের আগমন এগিয়ে আসার প্রবণতা কৃষির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
গম উৎপাদনেও পড়ছে তাপমাত্রার প্রভাব
দেশের গুরুত্বপূর্ণ গম উৎপাদনকারী অঞ্চলগুলিতে তাপমাত্রার পরিবর্তনের প্রভাব ইতিমধ্যেই দেখা যাচ্ছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। গমের বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তাপমাত্রা বেড়ে গেলে উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।এল নিনোর কারণে যদি এই ধরনের উষ্ণ পরিস্থিতি আরও তীব্র হয়, তাহলে রবি মরশুমের কৃষিকাজে বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তেও বাড়তে পারে চরম আবহাওয়া
WMO-র সতর্কতা শুধু ভারতের জন্য নয়, বিশ্বজুড়েই গুরুত্বপূর্ণ। এল নিনো শক্তিশালী হলে বিভিন্ন অঞ্চলে আবহাওয়ার স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে।কোথাও দেখা দিতে পারে বৃষ্টির ঘাটতি ও খরা, আবার অন্য কোথাও অতিবৃষ্টি এবং বন্যার সম্ভাবনা বাড়তে পারে। একইসঙ্গে কিছু অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী অস্বাভাবিক তাপপ্রবাহের আশঙ্কাও তৈরি হতে পারে।WMO মহাসচিব সেলেস্তে সাউলোও সতর্ক করেছেন যে খরা ও বন্যার মতো চরম আবহাওয়ার কারণে ইতিমধ্যেই ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। এল নিনোর তীব্রতা বাড়লে সেই পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এল নিনো আসলে কী?
এল নিনো কোনও ঝড় নয়। এটি প্রশান্ত মহাসাগর ও বায়ুমণ্ডলের মধ্যে তৈরি হওয়া একটি বড় জলবায়ুগত পরিবর্তন। এটি ENSO বা El Niño-Southern Oscillation-এর একটি পর্যায়।মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেড়ে গেলে এল নিনো পরিস্থিতি তৈরি হয়। এর প্রভাব ওই অঞ্চলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা এবং আবহাওয়ার ধরনেও এর প্রভাব পড়তে পারে।এর বিপরীত পর্যায় হল লা নিনা, আর এই দুইয়ের মাঝামাঝি অবস্থাকে বলা হয় নিরপেক্ষ পর্যায়।
প্রশান্ত মহাসাগরে তৈরি হওয়া এল নিনো আগামী কয়েক মাসে বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার স্বাভাবিক ছন্দে বড়সড় পরিবর্তন আনতে পারে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার সতর্কতা অনুযায়ী, বর্তমান এল নিনো আরও শক্তিশালী হয়ে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রভাব ফেলতে পারে। ভারতের ক্ষেত্রে কম বৃষ্টি, বাড়তি তাপমাত্রা এবং চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি কৃষিক্ষেত্রের জন্য উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।











