মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনার ৩৪তম দিনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জাতির উদ্দেশে প্রায় ২০ মিনিটের ভাষণ দেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে জানানোর চেষ্টা করেন যে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ জয় করেছে এবং ইরান ধ্বংস হয়ে গেছে। তবে ভাষণে দেওয়া একাধিক দাবি বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয় বলে বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন। তারা অন্তত ১০টি প্রধান ভ্রান্ত দাবি চিহ্নিত করেছেন।
প্রথমত, ট্রাম্প দাবি করেন যে ইরানের নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী ধ্বংস হয়ে গেছে এবং তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎক্ষেপণ ক্ষমতা ব্যাপকভাবে কমে গেছে। তিনি আরও বলেন, অস্ত্র কারখানাগুলি ধ্বংস হয়েছে এবং এত স্বল্প সময়ে কোনো শত্রুর এত ক্ষতি আগে হয়নি। তবে তার বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরান ইসরায়েলের ওপর হামলা চালায়। একই সময়ে ইরানের নৌবাহিনী হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়, এবং ট্রাম্প স্বীকার করেন যে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি এই সংকট সমাধান করতে সক্ষম নয়।
দ্বিতীয়ত, ট্রাম্প বলেন যে ইরানে ক্ষমতার পরিবর্তন হয়েছে এবং নতুন নেতৃত্ব আগের তুলনায় কম কট্টর। তবে তথ্য অনুযায়ী, আয়াতুল্লাহ খামেনেইয়ের মৃত্যুর পর তার পুত্র মুজতবা খামেনেই দেশের নেতৃত্ব গ্রহণ করেছেন এবং তাকে আরও কট্টর বলে বর্ণনা করা হচ্ছে। ইরান জানিয়েছে যে কোনো সমঝোতা হবে না এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল পরাজয় স্বীকার না করা পর্যন্ত হামলা চলবে।
তৃতীয়ত, ট্রাম্প দাবি করেন যে ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়েছে। কিন্তু জুন ২০২৫-এ অপারেশন মিডনাইট হ্যামারের সময় একই দাবি করা হলেও, ইরানের কাছে এখনও সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ও পারমাণবিক স্থাপনা রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।
![]()
চতুর্থত, ট্রাম্প বলেন যে ইসরায়েল, সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও বাহরাইন ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। তবে বাস্তবে ইরান এই দেশগুলির ওপর হামলা চালাচ্ছে এবং হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় তাদের তেল ও গ্যাস রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
পঞ্চমত, ট্রাম্প দাবি করেন যে দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে ইরানকে পাষাণ যুগে পাঠানো হবে। কিন্তু এই ধরনের পদক্ষেপের জন্য ব্যাপক বোমাবর্ষণ বা পারমাণবিক হামলা প্রয়োজন, যা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে বাস্তবায়নযোগ্য নয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। স্থলবাহিনী পাঠানোও বিবেচনায় নেই।
ষষ্ঠত, ট্রাম্প বারবার বলেন যে ইরানের সঙ্গে আলোচনা চলছে এবং নতুন নেতৃত্ব যুক্তিসঙ্গত। তবে ইরান জানিয়েছে যে কোনো আলোচনা হবে না।
সপ্তমত, ট্রাম্প হুমকি দেন যে সমঝোতা না হলে ইরানের বিদ্যুৎ ও তেল স্থাপনাগুলিতে হামলা চালানো হবে। কিন্তু খার্গ দ্বীপের মতো প্রধান তেলক্ষেত্রে হামলা প্রায় অসম্ভব বলে উল্লেখ করা হয়েছে এবং এমন হামলা হলে বৈশ্বিক তেলবাজারে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
অষ্টমত, ট্রাম্প দাবি করেন যে যুক্তরাষ্ট্রে মুদ্রাস্ফীতি নেই এবং অর্থনীতি শক্তিশালী। তবে হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকা ও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে তেলের দাম বাড়ছে এবং বাজারে অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে।
নবমত, ট্রাম্প বলেন যে দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে যুদ্ধ শেষ হবে। কিন্তু ৩৪ দিন পরও কোনো চূড়ান্ত সমাধান হয়নি এবং এর আগেও তিনি এ ধরনের দাবি করেছেন যা বাস্তবায়িত হয়নি।
দশমত, ট্রাম্প ভাষণে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ক্ষতির উল্লেখ করেননি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনী ও যুদ্ধবিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং শেয়ারবাজারে পতন দেখা গেছে।
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল ও ইরানের অবস্থান আন্তর্জাতিকভাবে স্পষ্ট নয়। হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকা এবং ইরানের হামলা বৈশ্বিক তেলবাজার, বিনিয়োগ এবং শেয়ারবাজারে প্রভাব ফেলছে এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর চাপ তৈরি করছে।








