বাঙালির পাতে মাছ না থাকলে যেন খাওয়াই অসম্পূর্ণ! রুই, কাতলা, মৃগেল, তেলাপিয়া থেকে পাবদা—নিত্যদিনের খাবারে এই মাছগুলির উপস্থিতি খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু মাছ কাঁচা বা আধসিদ্ধ অবস্থায় খেলে পরজীবী সংক্রমণের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে মিষ্টি জলের মাছের সঙ্গে ফিশ টেপওয়ার্মের মতো পরজীবীর সংক্রমণের ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়। তাই মাছ কীভাবে রান্না করবেন এবং কীভাবে সংরক্ষণ করবেন, তা জানা জরুরি।
মাছেও থাকতে পারে ফিশ টেপওয়ার্ম
অনেকেই মনে করেন, পরজীবী কেবল শাকসবজি বা অপরিষ্কার খাবারেই থাকতে পারে। কিন্তু মিষ্টি জলের মাছের ক্ষেত্রেও পরজীবী সংক্রমণের সম্ভাবনা রয়েছে। ফিশ টেপওয়ার্ম বা ব্রড ফিশ টেপওয়ার্মের লার্ভা আক্রান্ত মাছের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে।এই পরজীবী শরীরে ঢুকলে মূলত ক্ষুদ্রান্ত্রে অবস্থান করতে পারে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সংক্রমণ ধরা পড়ে উপসর্গের ভিত্তিতে নয়, বরং পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে। তবে কিছু মানুষের পেটের অস্বস্তি, পেটব্যথা, ডায়রিয়া, দুর্বলতা বা ওজন কমার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণের ক্ষেত্রে ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতিও হতে পারে।
রুই-কাতলা, পাবদা-ট্যাংরাতেও কি ঝুঁকি?
মিষ্টি জলের মাছ কাঁচা বা পর্যাপ্ত তাপমাত্রায় রান্না না করে খাওয়াই পরজীবী সংক্রমণের ক্ষেত্রে বড় ঝুঁকি। তাই রুই, কাতলা, মৃগেল, তেলাপিয়া, পাবদা, ট্যাংরার মতো মাছ রান্নার সময় বিশেষভাবে সতর্ক থাকা উচিত।তবে এর অর্থ এই নয় যে এই মাছ খেলেই ফিতাকৃমির সংক্রমণ হবে। মূল বিষয় হল মাছটি সংক্রমিত কি না এবং সেটি যথেষ্ট তাপে রান্না করা হয়েছে কি না।
কাঁচা বা আধসিদ্ধ মাছেই বেশি বিপদ
ফিশ টেপওয়ার্মের ঝুঁকি কমানোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপায় হল মাছ ভালোভাবে রান্না করা। কাঁচা, আধসিদ্ধ বা কম তাপে রান্না করা মাছ খাওয়া এড়িয়ে চলাই নিরাপদ।শুধু নুন দিয়ে মাছ সংরক্ষণ, ধোঁয়ায় শুকানো বা আচার বানানোকে পরজীবী ধ্বংসের নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি হিসেবে ধরা উচিত নয়। মাছের ভিতরের অংশ পর্যন্ত পর্যাপ্ত তাপ পৌঁছনো জরুরি।
শুধু ফ্রিজে রাখলেই কি পরজীবী নষ্ট হবে?
মাছ ফ্রিজে রাখলে দীর্ঘদিন ভালো রাখা যায়, কিন্তু সাধারণ রেফ্রিজারেটরের তাপমাত্রা সব ধরনের পরজীবী ধ্বংস করার জন্য যথেষ্ট নাও হতে পারে। পরজীবী নিয়ন্ত্রণের জন্য নির্দিষ্ট সময় ধরে নির্দিষ্ট নিম্ন তাপমাত্রায় মাছ হিমায়িত করার নির্দেশিকা রয়েছে।FDA-এর নির্দেশিকা অনুযায়ী, নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে মাছ -২০°C (-৪°F) বা তার কম তাপমাত্রায় অন্তত ৭ দিন হিমায়িত রাখা যায়। আরও কম, অর্থাৎ -৩৫°C (-৩১°F) বা তার কম তাপমাত্রায় নির্দিষ্ট সময় ধরে মাছ হিমায়িত রাখার বিকল্প ব্যবস্থাও রয়েছে।তবে বাড়ির সাধারণ ফ্রিজার এই তাপমাত্রা ও স্থায়িত্ব নির্ভরযোগ্যভাবে বজায় রাখছে কি না, তা নিশ্চিত করা সবসময় সম্ভব নয়। তাই পরজীবী নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে ভালোভাবে রান্না করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা।
মাছ রান্নার সময় কী কী খেয়াল রাখবেন?
মাছ রান্নার সময় কয়েকটি বিষয় মেনে চললে ঝুঁকি কমানো যায়—
মাছ ভালোভাবে পরিষ্কার করে রান্না করুন।
মাছের মাঝের অংশ পর্যন্ত পর্যাপ্ত তাপ পৌঁছনো নিশ্চিত করুন।
কাঁচা বা আধসিদ্ধ মাছ খাবেন না।
কাঁচা মাছ কাটার ছুরি ও বোর্ড ভালোভাবে ধুয়ে নিন।
রান্না করা মাছের সঙ্গে কাঁচা মাছের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলুন।
ফ্রিজে রাখার আগে মাছ পরিষ্কার করে বায়ুরোধী প্যাকেটে রাখুন।
দীর্ঘদিন সংরক্ষণের প্রয়োজন হলে ডিপ-ফ্রিজের উপযুক্ত তাপমাত্রা সম্পর্কে নিশ্চিত হন।
মিষ্টি জলের কিছু মাছ কাঁচা বা আধসিদ্ধ অবস্থায় খেলে পরজীবী সংক্রমণের ঝুঁকি থাকতে পারে। ফিশ টেপওয়ার্ম মানুষের অন্ত্রে সংক্রমণ ঘটাতে পারে এবং কিছু ক্ষেত্রে পেটের সমস্যা ও ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতির সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। সঠিকভাবে রান্না করা এবং প্রয়োজনমতো ফ্রিজে সংরক্ষণ করা ঝুঁকি কমানোর গুরুত্বপূর্ণ উপায়।









