নিউইয়র্ক শহরের ম্যানহাটনে অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ ফেডারেল ভবনের বাইরে সোমবার সকালে নিরাপত্তা সংস্থাগুলি যুক্তরাষ্ট্রের এক সাবেক সেনাসদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে। অভিযোগ, তিনি প্রথমে ভবনের প্রবেশদ্বারের সামনে আতশবাজি ফোটান, এরপর দাহ্য পদার্থ ছিটিয়ে আগুন লাগান এবং একটি এয়ারসফট (পেলেট) বন্দুক দিয়ে ভবনের দিকে গুলি চালান। ঘটনায় তিনজন সামান্য আহত হন। নিরাপত্তা বাহিনী দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে ঘটনাস্থলেই অভিযুক্তকে আটক করে।
এফবিআই (FBI)-এর তথ্য অনুযায়ী, ঘটনাটি 26 ফেডারেল প্লাজা (26 Federal Plaza)-এর বাইরে ঘটেছে। এখানে এফবিআই, ইউএস ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (ICE) এবং ইউএস সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিসেস (USCIS)-এর কার্যালয় রয়েছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এটি যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতির বিরুদ্ধে বিক্ষোভের একটি প্রধান কেন্দ্র হিসেবেও পরিচিত।
তদন্তকারী সংস্থাগুলি অভিযুক্তের পরিচয় ৪৩ বছর বয়সী অ্যান্ড্রু আরাবাকা (Andrew Arrabaca) হিসেবে শনাক্ত করেছে। তিনি নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের পফকিপসি (Poughkeepsie)-এর বাসিন্দা। এফবিআই জানিয়েছে, ঘটনার সময় তিনি সরকার এবং ICE-এর বিরুদ্ধে একাধিক বক্তব্য দেন। ঘটনার পর ফেডারেল এজেন্ট ও নিরাপত্তাকর্মীরা দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে তাকে মাটিতে ফেলে গ্রেপ্তার করেন। তল্লাশিতে তার কাছ থেকে দুটি কুঠার, একটি মাচেটি, তিনটি ছুরি, আতশবাজির সামগ্রী এবং একটি এয়ারসফট বন্দুক উদ্ধার করা হয়েছে।
এফবিআই কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, অভিযুক্ত প্রথমে ভবনের বাইরে এসে আতশবাজি ফোটানো শুরু করেন। এরপর তিনি প্রবেশদ্বারের সিঁড়িতে দাহ্য পদার্থ ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেন। আগুন লাগার পর ঘটনাস্থলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। এ সময় তিনি এয়ারসফট বন্দুক দিয়ে ভবনের দিকে পাঁচ থেকে সাতটি পেলেট নিক্ষেপ করেন। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, এটি প্রাণঘাতী আগ্নেয়াস্ত্র ছিল না, তবে ঘটনাটি নিরাপত্তা সংস্থাগুলিকে তাৎক্ষণিকভাবে সতর্ক করে তোলে। পরে নিউইয়র্ক ফায়ার ডিপার্টমেন্টের দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে দ্রুত আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। সময়মতো আগুন নেভানো সম্ভব হওয়ায় বড় ধরনের ক্ষতি এড়ানো যায়।
এফবিআই জানিয়েছে, ঘটনায় মোট তিনজন সামান্য আহত হন। তাদের মধ্যে দুজন সরকারি কর্মচারী এবং একজন অভিবাসী ছিলেন, যিনি নিজের অভিবাসন-সংক্রান্ত শুনানির জন্য ভবনে এসেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি (DHS)-এর তথ্য অনুযায়ী, একজন পথচারী সামান্য আহত হন এবং অভিযুক্তকে আটককারী এক নিরাপত্তাকর্মীও সামান্য আঘাত পান। আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে এবং তাদের অবস্থা আশঙ্কামুক্ত বলে জানানো হয়েছে।
![]()
এফবিআই নিউইয়র্কের সহকারী পরিচালক জেমস বার্নেকল এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, অভিযুক্তের কাছে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ছিল এবং তিনি ঘটনার সময় সরকার ও ICE-এর বিরুদ্ধে একাধিক বক্তব্য দেন। তিনি জানান, নিরাপত্তা সংস্থাগুলি সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে। অভিযুক্তকে দ্রুত আটকানো না হলে ঘটনাটি আরও গুরুতর রূপ নিতে পারত। এফবিআই এখন তদন্ত করছে, হামলার পরিকল্পনা তিনি একাই করেছিলেন, নাকি এর সঙ্গে অন্য কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর যোগাযোগ ছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি (DHS) অভিযুক্তকে “অ্যান্টি-ICE দাঙ্গাকারী” হিসেবে উল্লেখ করেছে। বিভাগের মতে, প্রাথমিক তদন্তে মনে হচ্ছে তার উদ্দেশ্য ছিল ফেডারেল সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো। তবে ঘটনার পেছনে কেবল ব্যক্তিগত মতাদর্শ কাজ করেছে, নাকি কোনো সংগঠিত প্রচারণার সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে, তা এখনও তদন্তাধীন। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মামলার সব দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, অ্যান্ড্রু আরাবাকা ২০০১ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের নিয়মিত সেনাবাহিনী (US Army)-তে কর্মরত ছিলেন। এরপর ২০০৪ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত তিনি নিউইয়র্ক আর্মি ন্যাশনাল গার্ডের সদস্য ছিলেন। তার কোনো বিদেশি সামরিক মোতায়েনের রেকর্ড পাওয়া যায়নি। তিনি স্পেশালিস্ট (Specialist) পদমর্যাদায় সেনাবাহিনী ত্যাগ করেন। তদন্তকারী সংস্থাগুলি তার সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড এবং সম্ভাব্য উগ্র মতাদর্শের দিকও খতিয়ে দেখছে।
26 ফেডারেল প্লাজা নিউইয়র্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফেডারেল কমপ্লেক্স। এখানে এফবিআই, ICE, USCIS এবং অন্যান্য ফেডারেল সংস্থার কার্যালয় রয়েছে। প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক মানুষ অভিবাসন-সংক্রান্ত বিষয়, সরকারি প্রক্রিয়া এবং আইনি শুনানির জন্য এখানে আসেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এটি যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতির বিরুদ্ধে বিভিন্ন বিক্ষোভেরও কেন্দ্র ছিল। ফলে এই স্থানে সংঘটিত ঘটনাটিকে নিরাপত্তা সংস্থাগুলি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে।
নিউইয়র্ক শহরের মেয়র জোহরান মামদানি ঘটনাটিকে “অত্যন্ত উদ্বেগজনক” বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, শহর প্রশাসন প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, জননিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টি করে এমন কোনো ধরনের সহিংসতা সহ্য করা হবে না।
ঘটনার পর পুরো ফেডারেল কমপ্লেক্স এবং আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। এফবিআই, DHS এবং স্থানীয় পুলিশ যৌথভাবে ঘটনার তদন্ত করছে। কর্মকর্তারা অভিযুক্তের ডিজিটাল রেকর্ড, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার কর্মকাণ্ড এবং সম্ভাব্য যোগাযোগগুলিও খতিয়ে দেখছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সংবেদনশীল সরকারি কমপ্লেক্সে এ ধরনের ঘটনা নিরাপত্তা ব্যবস্থার ধারাবাহিক পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তার ইঙ্গিত দেয়। আপাতত কর্মকর্তারা নাগরিকদের গুজবে কান না দিয়ে শুধুমাত্র সরকারি তথ্যের ওপর নির্ভর করার আহ্বান জানিয়েছেন।








