দিদা-ঠাকুমার হাতের আচার শুধু স্বাদের জন্য নয়! হজম থেকে রুচি—কী কী উপকার মেলে, জানুন বিশেষজ্ঞের মত

আচার শুধু মুখরোচক নয়, পরিমিত খেলে খাবারের রুচি বাড়াতে পারে। হজম, পুষ্টিগুণ ও প্রোবায়োটিক নিয়ে কী জানা দরকার, আর দিনে কতটা আচার খাওয়া উচিত—জানুন।

ডাল-ভাত হোক কিংবা পরোটা—পাতে এক চামচ আচার থাকলেই যেন খাবারের স্বাদ বদলে যায়। দিদা-ঠাকুমার হাতে তৈরি আমের আচার, লেবুর আচার কিংবা আমলকীর আচার শুধু রসনার তৃপ্তি নয়, বহু পরিবারের কাছে আবেগ ও ঐতিহ্যের অংশ। কিন্তু এই মুখরোচক খাবারের পুষ্টিগুণও যে একেবারে কম নয়, তা অনেকেরই জানা নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, আচার কী দিয়ে এবং কীভাবে তৈরি হচ্ছে, তার উপর এর পুষ্টিমূল্য অনেকটাই নির্ভর করে।

আচারের এত জনপ্রিয়তার কারণ কী?

আচার তৈরির ঐতিহ্য বহু পুরনো। ফ্রিজ বা আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা না থাকাকালীন ফল ও সবজি দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করার অন্যতম উপায় ছিল আচার তৈরি করা।লবণ, তেল, মশলা এবং সংরক্ষণ পদ্ধতির সাহায্যে আম, লেবু, আমলকী, গাজরসহ বিভিন্ন উপকরণ দীর্ঘদিন রাখা সম্ভব হত। সময়ের সঙ্গে এই সংরক্ষণ পদ্ধতিই পরিণত হয়েছে ভারতীয় খাদ্যসংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশে।

এক চামচ আচারে বাড়ে খাবারের রুচি

আচারের টক, নোনতা ও ঝাল স্বাদ জিভের স্বাদগ্রহণের অনুভূতিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে। ফলে সাধারণ ডাল-ভাত, পরোটা কিংবা অন্যান্য খাবারেও আলাদা স্বাদ যোগ হয়।বিশেষ করে যাঁদের খাবারে রুচি কম, তাঁদের কাছে অল্প পরিমাণ আচার খাবারকে আরও উপভোগ্য করে তুলতে পারে। তবে রুচি বাড়ানোর জন্য বেশি পরিমাণ আচার খাওয়ার প্রয়োজন নেই।

ফল-সবজির আচারে থাকতে পারে কিছু পুষ্টিগুণ

আম, আমলকী, লেবু, গাজর বা অন্যান্য ফল ও সবজি দিয়ে তৈরি আচারে ব্যবহৃত মূল উপকরণের কিছু পুষ্টি উপাদান থাকতে পারে। বিশেষ করে ভিটামিন ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের উৎস হিসেবে কিছু ফল-সবজি গুরুত্বপূর্ণ।তবে আচারে কতটা পুষ্টিগুণ বজায় থাকবে, তা নির্ভর করে উপকরণ, প্রস্তুতপ্রণালী ও সংরক্ষণের পদ্ধতির উপর। তাই আচারকে কখনও ফল বা সবজির বিকল্প হিসেবে দেখা উচিত নয়।

হজমে কি সত্যিই সাহায্য করে?

কিছু ধরনের ঐতিহ্যবাহী ফারমেন্টেড আচারে উপকারী ব্যাকটেরিয়া তৈরি হতে পারে। এই ধরনের আচারের ক্ষেত্রে ফারমেন্টেশন প্রক্রিয়া অন্ত্রের মাইক্রোবায়োমের জন্য কিছুটা উপকারী হতে পারে।তবে সব ধরনের আচারে প্রোবায়োটিক থাকে না। ভিনেগার, অতিরিক্ত তাপ বা অন্য সংরক্ষণ পদ্ধতিতে তৈরি আচারের ক্ষেত্রে জীবন্ত উপকারী ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি আলাদা হতে পারে। তাই ‘সব আচারই প্রোবায়োটিক’—এমন দাবি সঠিক নয়।

হলুদ, মেথি, রসুনেও রয়েছে গুণ

অনেক ঐতিহ্যবাহী আচারে হলুদ, মেথি, রসুন, হিং, সর্ষের তেলসহ নানা মশলা ব্যবহার করা হয়। এসব উপকরণে বিভিন্ন জৈব সক্রিয় উপাদান রয়েছে এবং সঠিক খাদ্যতালিকার অংশ হিসেবে এগুলি উপকারী হতে পারে।তবে আচারে এই উপকরণগুলির পরিমাণ সাধারণত খুব বেশি নয়। তাই শুধু আচার খেয়েই কোনও নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যসমস্যা দূর হবে—এমনটা মনে করা ঠিক নয়।

বেশি আচার খেলেই বিপদ?

এখানেই সবচেয়ে বেশি সতর্ক হওয়া দরকার। আচারে সাধারণত লবণের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হতে পারে। পাশাপাশি কিছু আচারে তেলও বেশি থাকে। অতিরিক্ত লবণ নিয়মিত খেলে খাদ্যতালিকায় সোডিয়ামের পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে।বিশেষ করে উচ্চ রক্তচাপ, কিডনির সমস্যা বা সোডিয়াম নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন রয়েছে এমন ব্যক্তিদের আচারের পরিমাণ নিয়ে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ মেনে চলা ভালো।

দিনে কতটা আচার খাওয়া ঠিক?

আচারকে খাবারের মূল অংশ না করে স্বাদ বাড়ানোর জন্য অল্প পরিমাণে খাওয়াই ভালো। সাধারণভাবে খাবারের সঙ্গে ১–২ চা চামচের মতো পরিমাণ যথেষ্ট হতে পারে। তবে ব্যক্তির স্বাস্থ্য, খাদ্যাভ্যাস এবং আচারের উপকরণের উপর উপযুক্ত পরিমাণ বদলাতে পারে।বাজারের আচার কেনার সময় লেবেলে সোডিয়াম, তেল ও সংরক্ষণকারী উপাদানের তথ্য দেখে নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।

আচার বাঙালির খাবারের পাতে বহুদিনের পরিচিত সঙ্গী। আম, লেবু, আমলকী বা বিভিন্ন সবজি দিয়ে তৈরি আচারের স্বাদ যেমন খাবারের রুচি বাড়ায়, তেমনই সঠিক উপকরণে তৈরি ও পরিমিত পরিমাণে খেলে কিছু পুষ্টিগুণও পাওয়া যেতে পারে। তবে অতিরিক্ত লবণ ও তেলের কারণে আচারের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি।

Leave a comment