রক্তে ক্রিয়েটিনিন বাড়লেই কি কিডনি নষ্ট? কোন খাবার কমাবেন, কী খাবেন জেনে নিন

রক্তে ক্রিয়েটিনিন বেশি মানেই কি কিডনি নষ্ট? জেনে নিন ক্রিয়েটিনিন বাড়ার সম্ভাব্য কারণ, কোন খাবারে নুন ও প্রোটিন কমাবেন এবং কেন কলা, আলু বা টম্যাটো সবার জন্য নিষিদ্ধ নয়।

রক্ত পরীক্ষার রিপোর্ট হাতে নিয়ে ‘ক্রিয়েটিনিন বেড়েছে’ শুনলেই অনেকের মনে আতঙ্ক তৈরি হয়। শুরু হয় আলু, টম্যাটো, কলা, দুধ বা নানা খাবার বন্ধ করার পালা। কিন্তু কিডনির সমস্যায় সবার জন্য একই ডায়েট প্রযোজ্য নয়। বরং প্রয়োজনের তুলনায় বেশি প্রোটিন, অতিরিক্ত নুন ও প্রসেসড খাবার কমানো গুরুত্বপূর্ণ; অন্যদিকে পটাশিয়াম বা ফসফরাস কমাতে হবে কি না, তা নির্ভর করে রক্তের রিপোর্ট ও কিডনির রোগের পর্যায়ের উপর।

ক্রিয়েটিনিন আসলে কী?

ক্রিয়েটিনিন হল শরীরে পেশির স্বাভাবিক বিপাকক্রিয়ায় তৈরি হওয়া একটি বর্জ্য পদার্থ, যা মূলত কিডনির মাধ্যমে শরীর থেকে বেরিয়ে যায়। কিডনি ঠিকমতো ছেঁকে বের করতে না পারলে রক্তে ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা বাড়তে পারে।তবে উচ্চ ক্রিয়েটিনিনের কারণ শুধু কিডনি রোগ নয়। ডিহাইড্রেশন, কিছু ওষুধ, পেশির পরিমাণসহ বিভিন্ন কারণেও পরীক্ষার ফল বদলাতে পারে। তাই একটি রিপোর্ট দেখেই কিডনি ‘নষ্ট’ বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।

কোন খাবার সবচেয়ে আগে কমাবেন?

অতিরিক্ত নুন ও নোনতা খাবার

কিডনি রোগে অতিরিক্ত সোডিয়াম রক্তচাপ ও শরীরে তরল জমার সমস্যা বাড়াতে পারে। তাই প্যাকেটজাত স্ন্যাকস, ইনস্ট্যান্ট নুডলস, চিপস, আচার, অতিরিক্ত নোনতা খাবার ও অনেক ধরনের প্রসেসড ফুড কমানো ভালো।কিডনি রোগীদের ক্ষেত্রে সাধারণভাবে সোডিয়াম ২,৩০০ মিলিগ্রাম/দিনের নিচে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়, যদিও ব্যক্তিভেদে চিকিৎসক আরও কমাতে বলতে পারেন।

প্রসেসড মাংস

সসেজ, সালামি, বেকন, লাঞ্চ মিটের মতো প্রক্রিয়াজাত মাংসে নুন ও ফসফরাস-যুক্ত উপাদান থাকতে পারে। কিডনি রোগ থাকলে এগুলি যতটা সম্ভব এড়ানো বা সীমিত করা উচিত। প্যাকেটজাত খাবারের লেবেলে “PHOS” লেখা উপাদান রয়েছে কি না, সেটিও দেখে নিতে পারেন।

অতিরিক্ত প্রোটিন নয়

প্রোটিন শরীরের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় বেশি প্রোটিন খেলে কিডনিকে বেশি বর্জ্য পদার্থ ফিল্টার করতে হয়। তাই কিডনি রোগ থাকলে অনেক ক্ষেত্রে পরিমিত প্রোটিন খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়—একেবারে প্রোটিন বন্ধ নয়।বিশেষ করে নিজের ইচ্ছায় অতিরিক্ত প্রোটিন পাউডার, জিমের সাপ্লিমেন্ট বা উচ্চ-প্রোটিন ডায়েট শুরু করবেন না।

রেড মিট কি পুরোপুরি বন্ধ?

রেড মিট বেশি পরিমাণে খাওয়া কমানো উপকারী হতে পারে, বিশেষত যদি চিকিৎসক প্রোটিন নিয়ন্ত্রণ করতে বলেন। তবে ‘ক্রিয়েটিনিন বেড়েছে মানেই রেড মিট একেবারে চিরতরে বন্ধ’—এমন সার্বজনীন নিয়ম নেই।আপনার কিডনির কার্যক্ষমতা ও অন্যান্য রক্ত পরীক্ষার ফল অনুযায়ী কতটা প্রোটিন প্রয়োজন, তা চিকিৎসক বা রেনাল ডায়েটিশিয়ান ঠিক করতে পারেন।

তাহলে কী কী খাবেন?

বেশি রাখুন তাজা ও কম-প্রসেসড খাবারতাজা ফল, সবজি, উপযুক্ত পরিমাণ শস্য এবং কম নুনে রান্না করা খাবার সাধারণভাবে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ। তবে কিডনি রোগের অগ্রসর পর্যায়ে পটাশিয়াম বা ফসফরাস নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন হলে কিছু ফল-সবজিও সীমিত করতে হতে পারে।

ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার

শাকসবজি, উপযুক্ত ফল ও অন্যান্য ফাইবারসমৃদ্ধ খাবার সামগ্রিকভাবে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ হতে পারে। তবে কিডনির রোগের পর্যায় অনুযায়ী কোন ফল বা সবজি কতটা খাবেন, তা আলাদা হতে পারে।

কলা, কমলালেবু, আলু, টম্যাটো কি একেবারেই নিষিদ্ধ?

সবার জন্য নয়। এই খাবারগুলিতে পটাশিয়াম তুলনামূলক বেশি থাকতে পারে। কিডনির কার্যক্ষমতা অনেকটা কমে গেলে বা রক্তে পটাশিয়াম বেশি থাকলে চিকিৎসক এগুলি সীমিত করতে বলতে পারেন। কিন্তু কিডনির সমস্যা আছে বলেই প্রত্যেককে কলা, কমলালেবু, আলু ও টম্যাটো সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে—এমন নিয়ম নেই।একই কারণে ব্রাউন রাইস বা দুধও সবার জন্য নিষিদ্ধ—এমন ধারণা ঠিক নয়। খাদ্যতালিকা রিপোর্ট-ভিত্তিক হওয়া উচিত।

জল কতটা খাবেন?

ডিহাইড্রেশন থাকলে ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা বাড়তে পারে। কিন্তু কিডনির গুরুতর সমস্যা, শরীরে জল জমা, হৃদ্‌যন্ত্রের সমস্যা বা ডায়ালিসিসের মতো পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত জল খাওয়াও ক্ষতিকর হতে পারে।তাই ‘ক্রিয়েটিনিন কমাতে দিনে অনেক লিটার জল’—এই নিয়ম নিজে থেকে মেনে চলবেন না। আপনার চিকিৎসক যে পরিমাণ তরল গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন, সেটিই অনুসরণ করুন।

ক্রিয়েটিনিন কমানোর কোনও নির্দিষ্ট খাবার আছে?

এমন কোনও একক খাবার নেই যা সরাসরি ক্রিয়েটিনিন ‘কমিয়ে’ কিডনির রোগ সারিয়ে দেয়। লক্ষ্য হওয়া উচিত কিডনির উপর অতিরিক্ত চাপ কমানো এবং যে কারণের জন্য ক্রিয়েটিনিন বেড়েছে, সেটির চিকিৎসা করা।সঠিক খাদ্যতালিকায় সাধারণত সোডিয়াম নিয়ন্ত্রণ, প্রয়োজন অনুযায়ী প্রোটিন নিয়ন্ত্রণ এবং রক্তের পটাশিয়াম ও ফসফরাসের মাত্রা অনুযায়ী খাবার বেছে নেওয়া হয়।

কখন দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?

ক্রিয়েটিনিন বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে যদি প্রস্রাবের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়, শরীর ফুলে যায়, শ্বাসকষ্ট হয়, বমি হয়, প্রস্রাবে রক্ত দেখা যায় বা অত্যন্ত দুর্বল লাগে, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।শুধু ক্রিয়েটিনিনের একটি সংখ্যা নয়—eGFR, প্রস্রাবের পরীক্ষা, রক্তচাপ এবং অন্যান্য রক্তের খনিজের মাত্রা মিলিয়েই কিডনির অবস্থা মূল্যায়ন করা হয়।

রক্তে ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা বেড়ে গেলে কিডনির কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ার ইঙ্গিত মিলতে পারে, কিন্তু শুধু ক্রিয়েটিনিন বেশি হলেই কিডনি নষ্ট হয়ে গিয়েছে—এমনটা বলা যায় না। ডিহাইড্রেশন, কিছু ওষুধ, পেশির পরিমাণ ও অন্যান্য শারীরিক কারণেও এই মাত্রা বাড়তে পারে। তাই রিপোর্ট দেখেই খাবার থেকে একের পর এক পুষ্টিকর খাবার বাদ দেওয়া ঠিক নয়। কিডনির অবস্থা, পটাশিয়াম-ফসফরাসের মাত্রা এবং eGFR দেখে খাদ্যতালিকা ঠিক করা প্রয়োজন।

Leave a comment