ভারত ও জাপান তাদের বিশেষ কৌশলগত ও বৈশ্বিক অংশীদারিত্বকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে প্রতিরক্ষা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সেমিকন্ডাক্টর, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি এবং উদীয়মান প্রযুক্তিসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ১৬তম ভারত-জাপান বার্ষিক শীর্ষ সম্মেলনে দুই দেশের মধ্যে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, যার লক্ষ্য দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নেওয়া এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে কৌশলগত সহযোগিতা জোরদার করা।
শীর্ষ সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে উভয় নেতা অভিন্ন স্বার্থ, অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। তারা নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা, মুক্ত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলকে আরও শক্তিশালী করার প্রতি নিজেদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
বৈঠকের অন্যতম প্রধান ঘোষণা ছিল আগামী ১০ বছরে ভারতে ১০ ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ। এই বিনিয়োগ উৎপাদন, অবকাঠামো, উন্নত প্রযুক্তি, ডিজিটাল উদ্ভাবন এবং শিল্পোন্নয়নের মতো খাতে ব্যবহার করা হবে। পাশাপাশি, আগামী বছরগুলিতে ভারতে কার্যরত জাপানি কোম্পানির সংখ্যা দ্বিগুণ করার লক্ষ্যও নির্ধারণ করেছে দুই দেশ।
প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সম্প্রসারণের ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। উভয় দেশ তাদের প্রথম যৌথ প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি উন্নয়ন কর্মসূচিতে সম্মত হয়েছে। এই উদ্যোগের আওতায় নৌবাহিনীর জন্য ইউনিকর্ন (UNICORN) নৌ রেডিও অ্যান্টেনা ব্যবস্থা যৌথভাবে উন্নয়ন করা হবে। এই যোগাযোগ ব্যবস্থা নৌযুদ্ধজাহাজের যোগাযোগ সক্ষমতা উন্নত করার পাশাপাশি ইলেকট্রনিক নজরদারি এবং শত্রুর শনাক্তকরণ থেকে সুরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রকল্প ভারত-জাপান প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে।
![]()
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল প্রযুক্তির ক্ষেত্রে উভয় দেশ বিস্তৃত সহযোগিতার ঘোষণা দিয়েছে। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে আইআইটি বোম্বে, ভারতজেন টেকনোলজি ফাউন্ডেশন এবং জাপানের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেটিক্স যৌথভাবে বৃহৎ ভাষা মডেল (LLM) উন্নয়নে কাজ করবে।
এছাড়া ভারতের এআই কোম্পানি সারভম AI এবং জাপানের Preferred Networks উন্নত এআই প্রযুক্তির গবেষণা ও উন্নয়নে সহযোগিতা করবে। এই অংশীদারিত্বের লক্ষ্য বৈশ্বিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতামূলক এআই সমাধান তৈরি এবং প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনকে এগিয়ে নেওয়া।
মানবসম্পদ উন্নয়নেও দুই দেশ অগ্রাধিকার দিয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে ৫০০ জন ভারতীয় এআই বিশেষজ্ঞকে জাপানে গবেষণা, প্রশিক্ষণ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ প্রদান করা হবে। এর মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে প্রযুক্তিগত দক্ষতার বিনিময় জোরদার হবে এবং ভবিষ্যতের ডিজিটাল অর্থনীতির জন্য দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা হবে।
ভারত ও জাপান স্বাস্থ্য খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণেরও সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দুই দেশ ওষুধশিল্প, চিকিৎসা সরঞ্জাম, জৈবপ্রযুক্তি এবং স্বাস্থ্য গবেষণায় যৌথ প্রকল্পে কাজ করবে। এই অংশীদারিত্বের লক্ষ্য ভারতের উৎপাদন সক্ষমতা এবং জাপানের উন্নত প্রযুক্তি ও মাননিয়ন্ত্রণকে একত্রিত করে বৈশ্বিক বাজারের জন্য সাশ্রয়ী ও আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা সমাধান তৈরি করা।
পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও টেকসই উন্নয়ন এগিয়ে নিতে ভারত-জাপান বায়োগ্যাস উদ্যোগ ঘোষণা করা হয়েছে। এই কর্মসূচির আওতায় ভারতে প্রায় ১,০০০টি বায়োগ্যাস ও জৈব সার উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। এই উদ্যোগের লক্ষ্য গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা, কৃষি বর্জ্যের উন্নত ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানি উৎপাদনকে উৎসাহিত করা।









