হরমুজ প্রণালীতে উত্তেজনা বাড়লেই বিশ্ব জ্বালানি বাজারে পড়ে তার প্রভাব। আর সেই কারণেই বিকল্প পথ খুঁজতে শুরু করেছে ভারত। কেন্দ্রীয় সরকারের ভাবনায় এবার ওমান থেকে সরাসরি গভীর সমুদ্র গ্যাস পাইপলাইন। এই প্রকল্প সফল হলে রান্নার গ্যাস থেকে শিল্পক্ষেত্র— সর্বত্র জ্বালানি সরবরাহে বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
হরমুজ সঙ্কটেই সামনে এল নতুন পরিকল্পনা
পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত নতুন করে চিন্তায় ফেলেছে ভারতকে। কারণ দেশের বড় অংশের তেল ও গ্যাস আমদানি নির্ভর করে উপসাগরীয় অঞ্চলের উপর। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিপুল পরিমাণ এলএনজি ভারতে আসে। কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হলেই সেই সরবরাহে ধাক্কা লাগে। সেই কারণেই এবার বিকল্প করিডর তৈরির পরিকল্পনা শুরু হয়েছে।
ওমান থেকে গুজরাত, সমুদ্রের তলায় ২০০০ কিলোমিটারের পাইপলাইন
প্রস্তাবিত Middle East-India Deepwater Pipeline বা MEIDP প্রকল্পের আওতায় ওমান থেকে সরাসরি গুজরাত উপকূল পর্যন্ত পাইপলাইন বসানোর ভাবনা নেওয়া হয়েছে। এই পাইপলাইন প্রায় ২০০০ কিলোমিটার দীর্ঘ হতে পারে বলে জানা গিয়েছে।সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হল, পাইপলাইনটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩৪৫০ মিটার গভীরে বসানো হতে পারে। প্রযুক্তিগতভাবে এটি বিশ্বের অন্যতম গভীরতম ডুবো গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্পের মধ্যে পড়বে। সমুদ্রের গভীরে পাইপলাইন বসানোর জন্য আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য নেওয়া হবে বলেই ইঙ্গিত মিলেছে।
৪০ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প, কাজ শেষ হতে লাগতে পারে ৭ বছর
এই উচ্চাভিলাষী প্রকল্পের আনুমানিক খরচ ধরা হয়েছে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। অনুমোদন মিললে সম্পূর্ণ কাজ শেষ হতে পাঁচ থেকে সাত বছর সময় লাগতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।সরকারি সূত্রের দাবি, খুব শীঘ্রই গ্যাস অথরিটি অফ ইন্ডিয়া লিমিটেড GAIL, Engineers India Limited এবং Indian Oil Corporation-কে বিস্তারিত সমীক্ষা তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। বেসরকারি কনসোর্টিয়াম SAGE-এর প্রাথমিক রিপোর্টের ভিত্তিতেই এগোচ্ছে এই পরিকল্পনা।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এই পাইপলাইন?
বর্তমানে ভারত স্পট এলএনজি বাজারের উপর অনেকটাই নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেই তার সরাসরি প্রভাব পড়ে দেশের গ্যাস সরবরাহ ও মূল্যবৃদ্ধিতে। কিন্তু সরাসরি পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস এলে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল এবং কম খরচে জ্বালানি পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে।এই পাইপলাইন কার্যকর হলে ওমান, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, তুর্কমেনিস্তান এবং ইরানের বিশাল গ্যাস ভান্ডারের সঙ্গে ভারতের সরাসরি যোগাযোগ তৈরি হতে পারে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আরও মজবুত হবে।
বাড়ছে ভারতের গ্যাসের চাহিদা
ভারতে প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। বর্তমানে দৈনিক প্রায় ১৯০-১৯৫ mmscmd গ্যাসের প্রয়োজন হয়। ২০৩০ সালের মধ্যে সেই চাহিদা ৩০০ mmscmd-এর কাছাকাছি পৌঁছতে পারে বলে অনুমান।বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রান্নার গ্যাস, সিটি গ্যাস প্রকল্প, শিল্প এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ব্যবহার বাড়ার কারণেই ভবিষ্যতে এই চাহিদা আরও বৃদ্ধি পাবে। তাই এখন থেকেই বিকল্প ও স্থিতিশীল জ্বালানি রুট তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি।
পশ্চিম এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক সঙ্কট এবং হরমুজ প্রণালী ঘিরে অনিশ্চয়তার আবহে ভারত বড়সড় জ্বালানি প্রকল্পের পথে হাঁটছে। ওমান থেকে গুজরাত পর্যন্ত গভীর সমুদ্রের নীচ দিয়ে গ্যাস পাইপলাইন তৈরির পরিকল্পনা নিয়ে জোর চর্চা শুরু হয়েছে। প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে ভারতে গ্যাস সরবরাহ অনেকটাই স্থিতিশীল হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।











